খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: ১৬ই আগস্ট ২০২৬, ১১:৫০ এএম
দেশজুড়ে জ্বালানি ও বিদ্যুৎ-সংকট ভয়াবহ রূপ নেওয়ায় চরম ক্ষতির মুখে পড়েছে উৎপাদনমুখী শিল্প খাত। নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য, ওষুধ, ইস্পাত, সিরামিক ও টেক্সটাইলসহ বিভিন্ন খাতের ছোট-বড় শতাধিক কারখানা তাদের উৎপাদন সম্পূর্ণ বন্ধ রাখতে বাধ্য হয়েছে। এ ছাড়া আরও দেড় শতাধিক কারখানায় উৎপাদন নেমে এসেছে অর্ধেকেরও নিচে। ফলে দেশের সার্বিক পণ্যের বাজার ও রপ্তানি খাত এক অভূতপূর্ব সংকটের মুখোমুখি দাঁড়িয়েছে।
শিল্পমালিকদের সূত্রে জানা গেছে, গত এক মাস ধরে দেশজুড়ে তীব্র গ্যাসের চাপ কম থাকলেও সাম্প্রতিক সময়ে তা মারাত্মক আকার ধারণ করে। সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত অঞ্চলের মধ্যে রয়েছে নারায়ণগঞ্জ, নরসিংদী, সাভার, গাজীপুর, চট্টগ্রাম, হবিগঞ্জ, ময়মনসিংহ ও খুলনা। গ্যাসের চাপ পর্যাপ্ত না থাকায় কারখানার বয়লারগুলো অচল হয়ে পড়ে এবং বিদ্যুতের অতিরিক্ত লোডশেডিংয়ের কারণে বিকল্প জেনারেটর চালানোও অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছে।
উৎপাদন স্থবিরতার সবচেয়ে বড় ধাক্কা এসেছে নিত্যপণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ খাত থেকে। নারায়ণগঞ্জ ও চট্টগ্রামের চিনিকল, ময়দা ও তেল রিফাইনারির মতো প্রায় অর্ধেক কারখানা সাময়িকভাবে বন্ধ। মেঘনা গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজের (এমজিআই) মালিকানাধীন ৫৭টি কারখানার মধ্যে ৪০টি কারখানাই উৎপাদনে যেতে পারছে না। টি কে গ্রুপের ঢাকার আশপাশের গ্যাসনির্ভর কারখানাগুলো বন্ধের পাশাপাশি এসিআই লিমিটেডের কারখানাগুলোতে উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ৩০ থেকে ৫০ শতাংশ পর্যন্ত কমে গেছে।
কারখানায় পণ্য উৎপাদন ব্যাহত হওয়ায় পাইকারি বাজারেও এর প্রভাব পড়তে শুরু করেছে। নারায়ণগঞ্জের পাইকারি বাজার নিতাইগঞ্জে সরবরাহের অভাবে চিনির ট্রাক পৌঁছায়নি, ফলে দাম বেড়েছে কেজিতে অন্তত ৭ টাকা। সিটি গ্রুপ ও মেঘনা গ্রুপের এডিবল অয়েল ও আটা-ময়দার উৎপাদন সংকুচিত হওয়ায় সাময়িক সরবরাহ সচল রাখতে কোম্পানিগুলো তাদের গুদামে রক্ষিত মজুত পণ্য “রেশনিং” পদ্ধতিতে বাজারে সরবরাহ করছে।
একই তীব্র ভোগান্তিতে পড়েছে জরুরি ওষুধ ও ইস্পাত খাত। আরএকে সিরামিকসের কারখানা শতভাগ গ্যাসনির্ভর হওয়ায় তাদের উৎপাদন পুরোপুরি স্থবির। অন্যদিকে, বিএসআরএম এবং স্কয়ার ফার্মাসিউটিক্যালসের মতো প্রতিষ্ঠানগুলো অতিরিক্ত খরচ সামলে ডিজেল দিয়ে জেনারেটর চালিয়ে কোনোরকমে উৎপাদন চালু রেখেছে। নরসিংদীর স্থানীয় টেক্সটাইল খাতের ৯০ শতাংশ কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে এবং খুলনার হিমায়িত চিংড়ি প্রক্রিয়াজাতকরণ হিমাগারগুলোতে ডিজেল খরচের কারণে ব্যয় কয়েক গুণ বেড়েছে।
বাংলাদেশ তেল, গ্যাস, খনিজ সম্পদ করপোরেশনের (পেট্রোবাংলা) হিসেব অনুযায়ী, দেশে দৈনিক গ্যাসের চাহিদা ৩৮০ কোটি ঘনফুট। কিন্তু সম্প্রতি কারিগরি ত্রুটি ও সরবরাহ ঘাটতিতে মোট সরবরাহ কমে মাত্র ১৭৩ কোটি ঘনফুটে নেমেছিল। পরবর্তীতে সামিট ও এক্সিলারেট এনার্জির টার্মিনালগুলো থেকে এলএনজি সরবরাহ কিছুটা চালু হলে মোট সরবরাহ ২৪৪ কোটি ঘনফুটে উন্নীত হয়। তা সত্ত্বেও বর্তমানে দিনে অন্তত ২৬ কোটি ঘনফুট গ্যাসের ঘাটতি রয়ে গেছে, যা শিল্পের স্বাভাবিক গতি ফেরাতে বড় বাধা।
শিল্প খাতের চলমান সংকট এবং কারখানাগুলোর বর্তমান অবস্থার বিস্তারিত বিবরণ নিচে সারণির মাধ্যমে উপস্থাপন করা হলো:
| বিভাগ/খাত | সংশ্লিষ্ট এলাকা/প্রতিষ্ঠান | সংকটের ধরণ ও বর্তমান পরিস্থিতি |
| নিত্যপণ্য (এমজিআই) | ঢাকা ও চট্টগ্রাম অঞ্চল | ৫৭টি কারখানার মধ্যে ৪০টির উৎপাদন পুরোপুরি বন্ধ। |
| নিত্যপণ্য (টি কে গ্রুপ) | ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ ও উত্তরাঞ্চল | ঢাকার পাশের কারখানা বন্ধ, উত্তরাঞ্চলে দিনে ৮-১০ বার লোডশেডিং। |
| নিত্যপণ্য ও ওষুধ (এসিআই) | রূপগঞ্জ, বন্দর, গাজীপুর | উৎপাদন ৩০ থেকে ৫০ শতাংশ পর্যন্ত কমে গেছে। |
| ভোজ্যতেল (সিটি গ্রুপ) | রূপসী, রূপগঞ্জ | উৎপাদন ৮০% হ্রাস; বিকল্প হিসেবে প্ল্যান্ট রেশনিং করে চালানো হচ্ছে। |
| সিরামিক (আরএকে) | গাজীপুর/সংশ্লিষ্ট এলাকা | গ্যাস সরবরাহ শূন্যে নামায় কারখানা সম্পূর্ণ বন্ধ। |
| ইস্পাত (বিএসআরএম) | চট্টগ্রাম | ডিজেল ব্যবহার করে অর্ধেকের কম সক্ষমতায় কাজ চালানো হচ্ছে। |
| ওষুধ (স্কয়ার ফার্মা) | পাবনা ও কালিয়াকৈর | বন্ধ এড়াতে অতিরিক্ত ব্যয়ে ডিজেল দিয়ে প্ল্যান্ট চালু রাখা হয়েছে। |
| টেক্সটাইল ও ডাইং | নরসিংদী জেলা | ৯০% কারখানা বন্ধ; গড় উৎপাদন নেমেছে ১০ শতাংশে। |
| মৎস্য ও হিমাগার | খুলনা অঞ্চল | বিদ্যুতের অভাবে উচ্চ মূল্যে ডিজেল কিনে জেনারেটর চালানো হচ্ছে। |
| রপ্তানি প্রক্রিয়া (ইপিজেড) | চট্টগ্রাম ইপিজেড | বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য ১৭-১৮ মিলিয়ন ঘনফুটের বদলে পাচ্ছে অর্ধেক গ্যাস। |
মন্তব্য