সংবিধান অবমাননা, বেআইনি অধ্যাদেশ জারি, মৌলিক অধিকার খর্ব, ক্ষমতার অপব্যবহার এবং বিচারিক কাজে হস্তক্ষেপসহ একাধিক গুরুতর ফৌজদারি অপরাধে অভিযুক্ত হয়েছেন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সাবেক প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস। বাংলাদেশের প্রচলিত আইন ও সংবিধানের প্রাসঙ্গিক বিধান বিশ্লেষণে দেখা যায়, তার বিরুদ্ধে আনীত এসব অভিযোগ আদালতে প্রমাণিত হলে সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড অথবা বিভিন্ন মেয়াদে দীর্ঘ কারাদণ্ড হতে পারে।
সংবিধান লঙ্ঘন ও রাষ্ট্রদ্রোহিতার অভিযোগ
গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী ১৮ মাসের শাসনামলে ড. ইউনূসের নেতৃত্বাধীন সরকারের বিরুদ্ধে সংবিধানের মূল কাঠামো লঙ্ঘনের বেশ কিছু অভিযোগ ওঠে। সংবিধানের ৭ক অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, অসাংবিধানিক পন্থায় সংবিধানের কোনো অংশ স্থগিত বা বাতিল করা কিংবা অসামঞ্জস্যপূর্ণ কোনো আদেশ জারি করা রাষ্ট্রদ্রোহিতার শামিল। দণ্ডবিধি অনুযায়ী রাষ্ট্রদ্রোহিতার সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড।
-
সংবিধান সংশোধন আদেশ জারি: জাতীয় সংসদ বহাল না থাকা অবস্থায় ‘জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়ন আদেশ, ২০২৫’ জারির মাধ্যমে সংবিধানে ব্যাপক পরিবর্তনের চেষ্টা চালানো হয়। সংবিধানের ১৪২ অনুচ্ছেদ উপেক্ষা করে এ ধরনের আদেশ জারি করাকে সংবিধান বিশেষজ্ঞদের একাংশ বেআইনি ও অসাংবিধানিক বলে অভিহিত করেছেন।
-
গণভোট অধ্যাদেশ: সংবিধানে গণভোটের স্পষ্ট বিধান না থাকা সত্ত্বেও অধ্যাদেশের মাধ্যমে গণভোটের আয়োজন করা সাংবিধানিক এখতিয়ারবহির্ভূত পদক্ষেপ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে।
-
আন্তর্জাতিক চুক্তি: সংবিধানের ১৪৫ক অনুচ্ছেদকে তোয়াক্কা না করে জাতীয় নিরাপত্তা ও প্রতিরক্ষা সম্পর্কিত বিভিন্ন চুক্তি গোপনে সম্পাদন করার অভিযোগ রয়েছে।
মৌলিক অধিকার হরণ ও স্বজনপ্রীতি
সংবিধানের ২৬ থেকে ৪৭ অনুচ্ছেদে বর্ণিত নাগরিকদের মৌলিক অধিকার সুরক্ষায় চরম ব্যর্থতার অভিযোগ উঠেছে তার সরকারের বিরুদ্ধে। বিনা বিচারে হাজার হাজার মানুষকে আটক, মব সহিংসতার মাধ্যমে জীবনের নিরাপত্তা বিনষ্ট করা, সংবাদপত্রের স্বাধীনতা হরণ (অনুচ্ছেদ ৩৯) এবং ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের ওপর নির্যাতন প্রতিরোধে ব্যর্থ হওয়ার বিষয়টি সংবিধান লঙ্ঘনের শামিল। এছাড়া, প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে নিরপেক্ষ ভূমিকা পালনের যে শপথ তিনি নিয়েছিলেন, স্বজনপ্রীতি ও পক্ষপাতমূলক আচরণের মাধ্যমে তা ভঙ্গ করা হয়েছে বলেও অভিযোগ উঠে এসেছে।
ক্ষমতার অপব্যবহার ও বিচার ব্যবস্থায় হস্তক্ষেপ
দায়িত্ব গ্রহণের পর ড. ইউনূসের বিরুদ্ধে থাকা শ্রম আইন লঙ্ঘন, দুর্নীতি ও আয়কর সংক্রান্ত মামলাগুলো দ্রুত খালাস বা বাতিল হয়ে যায়। আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, পদের প্রভাব খাটিয়ে বিচারিক প্রক্রিয়া প্রভাবিত করা দণ্ডবিধির ২২৮ ধারা ও আদালত অবমাননা আইনের চরম লঙ্ঘন।
এ ছাড়া, দায়িত্ব পালনকালে নিজের প্রতিষ্ঠিত বা স্বার্থসংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোকে সরকারি অনুমোদন ও করছাড় দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। দুর্নীতি প্রতিরোধ আইন, ১৯৪৭-এর ৫(২) ধারা এবং দণ্ডবিধির ১৬৬, ১৬৭ ও ১৬৮ ধারা অনুযায়ী যা দণ্ডনীয় অপরাধ। এসব ধারায় অপরাধ প্রমাণিত হলে সর্বোচ্চ ১৪ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ডের বিধান রয়েছে।
নিচে ড. ইউনূসের সরকারের সময়ে তাঁর স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানকে দেওয়া বিশেষ সুবিধা ও অনুমোদনের তালিকা দেওয়া হলো:
ড. ইউনূস ও তাঁর স্বার্থসংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানসমূহকে প্রদত্ত সুবিধা ও অনুমোদন
| ক্র. নং | প্রতিষ্ঠানের নাম | অনুমোদিত সুবিধাদি / লাইসেন্স | অনুমোদন প্রদানকারী কর্তৃপক্ষ / প্রক্রিয়া |
| ১ | গ্রামীণ ইউনিভার্সিটি | বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে অনুমোদন | শিক্ষা মন্ত্রণালয় / চ্যান্সেলর দপ্তর |
| ২ | গ্রামীণ অ্যামপ্লয়মেন্ট সার্ভিসেস (GESL) | জনশক্তি রপ্তানির লাইসেন্স (RL-2806) | বিএমইটি (BMET) |
| ৩ | গ্রামীণ অ্যামপ্লয়মেন্ট সার্ভিসেস (GESL) | সাধারণ সদস্যপদ প্রদান | বায়রা (BAIRA) |
| ৪ | সমাধান সার্ভিসেস লিমিটেড (গ্রামীণ টেলিকম) | পেমেন্ট সার্ভিস প্রভাইডার (PSP) লাইসেন্স | বাংলাদেশ ব্যাংক |
| ৫ | সমাধান সার্ভিসেস লিমিটেড | অনাপত্তি সনদ (NOC) ইস্যু | বাংলাদেশ ব্যাংক |
| ৬ | গ্রামীণ ব্যাংক | সরকারি মালিকানা ২৫% থেকে কমিয়ে ১০% করা | অধ্যাদেশ জারি |
| ৭ | গ্রামীণ ব্যাংক | বিশেষ কর মওকুফ সুবিধা | জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (NBR) |
| ৮ | ড. ইউনূস (ব্যক্তিগত) | ব্যক্তিগত ও প্রাতিষ্ঠানিক আয়কর মওকুফ | অন্তর্বর্তীকালীন সরকার / NBR |
| ৯ | ড. ইউনূস ও অন্যান্য | শ্রম আইনের সাজা ও মামলা থেকে খালাস | বিচারিক আদালত |
| ১০ | ড. ইউনূস ও অন্যান্য | অর্থপাচার ও দুর্নীতি দমন কমিশনের মামলা বাতিল | বিচারিক আদালত |
অবহেলজনিত মৃত্যুর অভিযোগ
শাসনামলে স্বাস্থ্য খাতের অব্যবস্থাপনা এবং শিশুদের টিকাদান কর্মসূচি বন্ধ থাকার কারণে হামে মৃত্যুর ঘটনা ঘটে। দণ্ডবিধির ৩০৪ক ধারা অনুযায়ী এটি বেপরোয়া ও অবহেলাজনিত হত্যাকাণ্ডের শামিল।
সার্বিক দিক বিবেচনায়, দেশের আইন ও সংবিধানের ধারাবাহিকতা অক্ষুণ্ণ রাখতে এসব অভিযোগের বিষয়ে নিরপেক্ষ তদন্ত কমিটির মাধ্যমে সত্যতা যাচাই করার জোর দাবি উঠেছে।



