ব্রাজিলিয়ান ফুটবলে মাঠের লড়াইয়ের পাশাপাশি দুই তারকার ব্যক্তিত্বের সংঘাত আবারও প্রকাশ্যে চলে এসেছে। রোববার সাও জানুয়ারিও স্টেডিয়ামে ম্যাচ শুরুর আগে সৌজন্যমূলক করমর্দনের জন্য হাত বাড়িয়েছিলেন সান্তোসের তারকা নেইমার। কিন্তু ভাস্কো দা গামার মিডফিল্ডার থিয়াগো মেন্দেস সেই হাত ধরে করমর্দন না করে সোজা উপেক্ষা করে হেঁটে চলে যান। মুহূর্তের মধ্যে ক্যামেরায় ধরা পড়া এই করমর্দন প্রত্যাখ্যানের দৃশ্যটি ছড়িয়ে পড়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে, যা পুনরায় উসকে দিয়েছে দুজনের বছরের পর বছর ধরে জমে থাকা পুরোনো শত্রুতা।
সাও জানুয়ারিওতে ম্যাচের বাঁশি বাজার আগে থেকেই ছিল গ্যালারি ও মাঠের পরিবেশ বেশ থমথমে। প্রথাগত শুভেচ্ছা বিনিময়ের সময় মেন্দেসের এমন আচরণে তৈরি হয় এক অস্বস্তিকর আবহাওয়া। পরবর্তীতে ঘটনাটির প্রতিক্রিয়া জানাতে গিয়ে নেইমারের অফিশিয়াল সোশ্যাল মিডিয়া পেজ থেকে একটি দুঃখপ্রকাশের ইমোজি পোস্ট করা হয়। পরিস্থিতি আরও ঘোলাটে করে তোলে স্বাগতিক ভাস্কো দা গামার সমর্থকরা। গ্যালারিতে তারা নেইমারের রোদনরত ফেস-মাস্ক বিতরণ করতে শুরু করলে উত্তেজনার পারদ হু হু করে বাড়তে থাকে।
ঘটনার পরপরই নীরব থাকেননি নেইমারের ঘনিষ্ঠ মহল। তার শৈশবের বন্ধু জোতা আমানসিও ভাস্কো মিডফিল্ডারকে কটাক্ষ করে পোস্ট দেন। আমানসিও কিংবদন্তি রোনালদিনহোর একটি বিখ্যাত স্মৃতিচারণমূলক বাক্য শেয়ার করেন, যেখানে জ্লাতান ইব্রাহিমোভিচ ও রোনালদিনহোর মধ্যকার একটি অতীত প্রসঙ্গের উল্লেখ ছিল। সেখানে রোনালদিনহো বলেছিলেন, সত্যিকারের সুপারস্টার বা বিশ্বমানের খেলোয়াড়রা সাধারণত সহজ ও বিনয়ী হন, আর গড়পড়তা মানের খেলোয়াড়দের মধ্যে প্রায়ই অহেতুক অহংকারী মনোভাব ফুটে ওঠে।
নেইমার ও মেন্দেসের এই সুদীর্ঘ অম্লমধুর লড়াইয়ের শুরু কিন্তু সম্প্রতি নয়; এর গোড়াপত্তন হয়েছিল ২০২০ সালে ফরাসি লিগ ওয়ানে। তখন নেইমার ছিলেন প্যারিস সেইন্ট-জার্মেইর (পিএসজি) সেরা অস্ত্র, আর মেন্দেস খেলতেন অলিম্পিক লিওঁর হয়ে। সেই সময় লিগের এক রোমাঞ্চকর ম্যাচে নেইমারকে মারাত্মক এক ফাউল করে বসেছিলেন মেন্দেস, যার ফলে নেইমারের গোড়ালি মারাত্মকভাবে মচকে যায় এবং তিনি দীর্ঘদিনের জন্য মাঠের বাইরে ছিটকে পড়েন। সেই ফাউলের অপরাধে মেন্দেসকে সরাসরি লাল কার্ড দেখে মাঠ ছাড়তে হয়েছিল। ম্যাচ শেষে মেন্দেস প্রকাশ্যে ক্ষমা চাইলেও তাদের দ্বৈরথের যে বিষবৃক্ষ রোপণ হয়েছিল, তা আর দূর হয়নি।
চলতি বছরের শুরুতে দুই তারকা ব্রাজিলিয়ান ফুটবলে নতুন করে ফিরে আসার পর থেকেই পুরোনো সেই দ্বন্দ্ব নতুন রূপে সামনে আসতে শুরু করে। সম্প্রতি মুখোমুখি হওয়া এক ম্যাচে প্রথমার্ধেই চরম বাদানুবাদে জড়িয়ে পড়েন দুজন। মেন্দেসের একটি কড়া ফাউলে রেগে আগুন হয়ে যান নেইমার। এরপর একপর্যায়ে মেন্দেস নেইমারের মুখে হাত দিয়ে ধাক্কা দিলে নেইমার মাটিতে লুটিয়ে পড়েন, যার জেরে রেফারি দুজনকেই হলুদ কার্ড সতর্কবার্তা দেন। শুধু মাঠেই নয়, প্রথমার্ধের খেলা শেষে টানেল দিয়ে ড্রেসিংরুমে যাওয়ার পথেও দুজনের মধ্যে তীব্র ঝগড়া ও তর্কাতর্কি চলতে থাকে।
উত্তপ্ত সেই ম্যাচের পর স্পোর্টটিভিকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে মেন্দেসের মানসিকতা নিয়ে ক্ষোভ উগরে দিয়েছিলেন নেইমার। তিনি সরাসরি মন্তব্য করেছিলেন, “সে সবসময় ইচ্ছা করে ঝামেলা পাকাতে চায়, প্রতিবারই নিজেকে একজন খুব কঠিন আর শক্ত লোক হিসেবে জাহির করার চেষ্টা করে। ব্যাপারটা ওর ক্ষেত্রে সবসময় এমনই হয়ে এসেছে। আমি সবিনয়েই বলছি, সে একদম একটি চরম বেয়াদব লোক।”
সব মিলিয়ে, রোববারের মাঠে সেই একটি করমর্দন এড়িয়ে যাওয়ার ঘটনা স্পষ্ট বুঝিয়ে দিল যে— ইউরোপের লিগ ওয়ান থেকে শুরু হওয়া নেইমার-মেন্দেসের এই শীতল যুদ্ধ স্বদেশের মাটিতে ফিরলেও বিন্দুমাত্র স্তিমিত হয়নি, বরং দিন দিন আরও তীব্র হচ্ছে।
মন্তব্য