খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: ১৭ই আগস্ট ২০২৬, ৯:৪০ পিএম
মাদারীপুরের শিবচর উপজেলায় আড়িয়াল খাঁ নদের তীব্র স্রোতে আবারও মারাত্মক ভাঙন শুরু হয়েছে। সোমবার সকাল থেকে উপজেলার বহেরাতলা-কলাতলা পয়েন্টে নদীভাঙন দেখা দেয়। নদের পানি হু-হু করে বাড়ার সাথে সাথে ভাঙনের ভয়াবহতাও তীব্র হতে থাকে। মুহূর্তের মধ্যেই বহেরাতলা-কলাতলা বেড়িবাঁধের একটি বড় অংশ নদের পেটে চলে যায়। একই সাথে বহেরাতলা বাজার থেকে কলাতলা যাওয়ার একমাত্র পাকা সড়কের কিছু অংশ নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। এতে পুরো এলাকায় দেখা দিয়েছে তীব্র আতঙ্ক ও অনিশ্চয়তা।
হঠাৎ শুরু হওয়া এই ভাঙনে বহেরাতলা ও কলাতলাসহ আশপাশের কয়েকটি গ্রামের কয়েক হাজার মানুষ চরম দুশ্চিন্তায় দিন কাটাচ্ছেন। ভাঙন পরিস্থিতি এভাবে চলতে থাকলে কলাতলা গ্রামের সাথে বহেরাতলা বাজারের সরাসরি যান চলাচল ও যোগাযোগ ব্যবস্থা পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যাবে।
স্থানীয় বাসিন্দারা জানিয়েছেন, প্রতিদিন বহু মানুষ জীবনের ঝুঁকি নিয়ে এ সড়ক দিয়ে যাতায়াত করেন। কলাতলা ও পার্শ্ববর্তী এলাকাগুলোর বাসিন্দাদের জন্য এটিই একমাত্র পথ। প্রতিদিনের নিত্যপ্রয়োজনীয় কেনাকাটা থেকে শুরু করে স্থানীয় স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থী, হাসপাতালে যাওয়ার জরুরি রোগী এবং ব্যবসায়ীদের একমাত্র ভরসা এই রাস্তাটি। সড়কটি ভেঙে যাওয়ায় ইতিমধ্যেই সাধারণ মানুষের যাতায়াতে চরম ভোগান্তি তৈরি হয়েছে। সবচেয়ে বড় দুশ্চিন্তার বিষয় হলো, নদের তীর থেকে মাত্র কয়েক মিটার দূরত্বে রয়েছে বহেরাতলা দক্ষিণ ইউনিয়নের ৩ নম্বর ওয়ার্ডের স্থায়ী ভোটকেন্দ্র। ভাঙনের গতি অব্যাহত থাকলে যে কোনো মুহূর্তে এ স্থাপনাটিও নদীতে তলিয়ে যেতে পারে।
এলাকাবাসীর সাথে কথা বলে জানা যায়, গত প্রায় ১০ বছর ধরে তারা এই আড়িয়াল খাঁ নদের ভাঙনে নিঃস্ব হচ্ছেন। নদীভাঙন ঠেকাতে পানিসম্পদ মন্ত্রণালয় ও পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) সুরক্ষামূলক উদ্যোগে বেড়িবাঁধ নির্মাণ করা হয়েছিল। বাঁধ তৈরির পর স্থানীয়রা ভেবেছিলেন দীর্ঘদিনের এই দুর্যোগ থেকে অবশেষে তারা রক্ষা পেলেন। কিছুদিন শান্তিতে কাটলেও এবার বর্ষায় নদের পানি বাড়ার সাথে সাথে আবারও সেই পুরানো আতঙ্ক ফিরে এসেছে।
এবারের এই আকস্মিক ও ধ্বংসাত্মক ভাঙনের পেছনে ড্রেজার ব্যবসায়ীদের লোভকে দায়ী করছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। তাদের অভিযোগ, রাতের আঁধারে আড়িয়াল খাঁ নদ থেকে অবৈধ ড্রেজার বসিয়ে অবাধে বালু উত্তোলন করা হচ্ছে। একই সাথে নদী খননে সঠিক পরিকল্পনা না থাকায় পানির স্বাভাবিক প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে এবং পাড়ে প্রচণ্ড ঘূর্ণিস্রোতের সৃষ্টি হচ্ছে। বহেরাতলা এলাকার প্রবীণ বাসিন্দা নওয়াব মাদবর আক্ষেপ করে বলেন, “দীর্ঘ এক দশক ধরে আমরা নদের কাছে সব হারাচ্ছি। বেড়িবাঁধ হওয়ার পর মনে হয়েছিল একটু স্বস্তি পেলাম। কিন্তু কিছু অসাধু মানুষের রাতে ড্রেজার দিয়ে বালু কাটার লোভ আজ আমাদের আবার নিঃস্ব করার পথে। সময়মতো ভাঙন না থামালে মানুষের বাড়িঘরও আর থাকবে না।”
পরিস্থিতির ভয়াবহতা বিবেচনা করে এলাকাবাসী অবিলম্বে অবৈধ বালু উত্তোলন বন্ধ করা, আড়িয়াল খাঁ নদের তীরে জিও ব্যাগ ফেলে সাময়িক প্রতিরোধ গড়ে তোলা এবং ক্ষতিগ্রস্ত বেড়িবাঁধ ও ভাঙা সড়কটি দ্রুত সংস্কারের জোর দাবি জানিয়েছেন।
যোগাযোগ করা হলে শিবচর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) এইচ এম ইবনে মিজান জানান, বহেরাতলা-কলাতলা পয়েন্টে আড়িয়াল খাঁ নদের ভাঙনের বিষয়টি প্রশাসন গুরুত্বের সাথে তদারকি করছে। পানি উন্নয়ন বোর্ডকে তাৎক্ষণিকভাবে বিষয়টি জানানো হয়েছে। আগামী এক-দুই দিনের মধ্যেই ভাঙন প্রতিরোধে টেকসই ব্যবস্থা গ্রহণ এবং বেড়িবাঁধ রক্ষায় প্রয়োজনীয় কাজ শুরু করবে পাউবো। এছাড়া নদে অবৈধ ড্রেজার পরিচালনা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করতে কঠোর প্রশাসনিক অভিযান চালানো হবে।
মন্তব্য