খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: ১৭ই আগস্ট ২০২৬, ১১:৪৯ পিএম
বগুড়া-রংপুর মহাসড়ক ঘেঁষে সড়ক ও জনপথ (সওজ) বিভাগের মূল্যবান সরকারি জমি দখল করে বিএনপির দলীয় কার্যালয় গড়ে তোলার নতুন অভিযোগ উঠেছে। মহানগরীর ব্যস্ততম তিনমাথা রেলগেটের পাশে যুব উন্নয়ন অধিদপ্তর সংলগ্ন সওজের জায়গা দখল করে রাতারাতি একটি টিনশেড ঘর তোলা হয়েছে। শুধু তাই নয়, কার্যালয়টির সামনে ঝুলিয়ে দেওয়া হয়েছে ‘মহানগর ১৫ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপি’র বিশাল সাইনবোর্ড।
সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে, বগুড়া-রংপুর মহাসড়ক সংলগ্ন সওজের প্রায় ৫ শতাংশ জায়গা জুড়ে কায়দা করে একটি সবুজ রঙের টিনশেড হাফওয়াল ঘর তৈরি করা হয়েছে। সড়ক ঘেঁষে তোলা এই স্থাপনাটির সামনের সাইনবোর্ডটি নজর কাড়ছে পথচারীদের।
স্থানীয় সূত্র ও অনুসন্ধানে উঠে এসেছে এই বিতর্কিত জায়গার দীর্ঘ ইতিহাস। জায়গাটি বগুড়া সিটি করপোরেশনের অন্তর্ভুক্ত হওয়ার আগে সদর উপজেলার ফাঁপোর ইউনিয়ন বিএনপির নিয়ন্ত্রণে ছিল। তারা প্রথম ২০০৩ সালে সরকারি এই জায়গায় টিনশেড ঘর তুলে দলীয় কার্যালয় বানিয়েছিল। সেই সময় বিষয়টি নিয়ে বিতর্ক সৃষ্টি হলে ২০০৫ সালে বিএনপির তৎকালীন শীর্ষ নেতৃত্বের নির্দেশে অফিসটি ভেঙে ফেলে জায়গাটি ছেড়ে দেওয়া হয়। এরপর আওয়ামী লীগ সরকারের টানা দেড় দশকে স্থানীয় বিএনপি নেতাকর্মীরা কয়েকবার ঘর তোলার চেষ্টা করলেও সওজের উচ্ছেদ অভিযানে তা টিকতে পারেনি। বিশেষ করে ২০২২ সালে সেখানে ঘর তোলা হলে সওজ তা গুঁড়িয়ে দিয়ে সড়ক সম্প্রসারণের কাজ সম্পন্ন করে।
এভাবে অন্তত ছয়বার কার্যালয়টি ভাঙা ও গুঁড়িয়ে দেওয়ার ঘটনা ঘটে। তবে দেশের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের সুযোগ নিয়ে ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর ফাঁপোর ইউনিয়ন বিএনপি আবার জায়গাটি দখলে নেয় এবং নতুন করে অবকাঠামো নির্মাণ করে। পরবর্তীতে প্রশাসনিক পুনর্বিন্যাসে এলাকাটি নবগঠিত সিটি করপোরেশনের আওতায় এলে সেটিকে ১৫ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির কার্যালয় ঘোষণা দিয়ে নতুন সাইনবোর্ড টানানো হয়।
আইন ও নিয়মের তোয়াক্কা না করে সরকারি জায়গায় পার্টি অফিস করা নিয়ে বিএনপি নেতাদের কথাতেও উঠে এসেছে অসঙ্গতি। ফাঁপোর ইউনিয়ন বিএনপির সাধারণ সম্পাদক কামাল হোসেন জানান, জায়গাটি সওজের পরিত্যক্ত জমি। ২০০৫ সালে নির্দেশ পেয়ে তারা সরে গেলেও পটপরিবর্তনের পর সেখানে আবার কার্যালয় গড়ে তোলেন। তবে এলাকাটি সিটির অধীনে আসায় এখন তা ১৫ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপি ব্যবহার করছে।
অন্যদিকে, ১৫ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির সভাপতি আব্দুল মান্নান সওজের জায়গায় কার্যালয় তোলার বিষয়টি স্বীকার করে নিয়ে বলেন, জায়গাটি সরকারি তা আমরা অস্বীকার করছি না। এর আগেও ছয়বার এখানে অফিস করা হয়েছিল এবং প্রতিবারই তা ভেঙে দেওয়া হয়। আমাদের কার্যালয়ের কারণে যদি জনগণের সমস্যা হয় বা বাধা সৃষ্টি হয়, তবে আমরা তা সরিয়ে নেব। একই সুর দেখা গেছে ওয়ার্ড সাধারণ সম্পাদক এমদাদুল হক মিলনের কণ্ঠেও; তিনিও কার্যালয়টি দ্রুত স্থানান্তরের আশ্বাস দিয়েছেন।
বিষয়টি দৃষ্টিগোচর করা হলে বগুড়া মহানগর বিএনপির সাধারণ সম্পাদক মনিরুজ্জামান মনি জানান, সরকারি জমিতে দখলদারিত্ব চালিয়ে কোনো দলীয় সাইনবোর্ড ঝুলানোর কোনো সুযোগ নেই। সরকারি জায়গা দখল না করার বিষয়ে দলীয় প্রধানের কঠোর নির্দেশনা আছে। বিষয়টি খতিয়ে দেখে সংশ্লিষ্টদের সেখান থেকে অফিস সরিয়ে নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হচ্ছে।
একই কথা ব্যক্ত করেছেন জেলা বিএনপির সহসভাপতি ও মহানগর সভাপতি হামিদুল হক চৌধুরী হিরু। তিনি বলেন, সরকারি জায়গায় দলীয় কার্যালয় করার বিষয়টি আমার জানা ছিল না। দ্রুত খোঁজ নিয়ে জায়গাটি দখলমুক্ত করতে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেওয়া হচ্ছে।
সরকারি জায়গা বেআইনিভাবে দখলের বিষয়ে বগুড়া সড়ক ও জনপথ বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী রাশেদুল হক জানান, সওজের মালিকানাধীন জায়গায় যেকোনো ধরনের অবৈধ স্থাপনা নির্মাণ বা দখল সম্পূর্ণ বেআইনি। ইতোমধ্যে বিষয়টি তদারকি করতে লোক পাঠানো হচ্ছে। সরেজমিন তদন্ত শেষে খুব দ্রুত উচ্ছেদ অভিযান চালিয়ে সড়ক ও জনপথের সম্পত্তি পুনরুদ্ধার করা হবে।
মন্তব্য