আধিপত্যের দ্বন্দ্বে সোনারগাঁয়ে বিএনপির দুই পক্ষের সংঘর্ষ

নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁয়ে আধিপত্য বিস্তার ও দীর্ঘদিনের বিরোধকে কেন্দ্র করে বিএনপির দুই নেতার অনুসারীদের মধ্যে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। বুধবার (১৯ আগস্ট) দুপুরে উপজেলার আষাড়িয়ারচর এলাকায় সংঘটিত এ ঘটনায় উভয় পক্ষের অন্তত ১০ জন নেতাকর্মী আহত হয়েছেন। সংঘর্ষের সময় একটি দলীয় কার্যালয়ে ভাঙচুরের ঘটনাও ঘটেছে। আহতদের মধ্যে একজনের অবস্থা গুরুতর হওয়ায় তাকে উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে।

স্থানীয় বিএনপির রাজনীতিতে এ ঘটনা নতুন করে উত্তেজনা তৈরি করেছে। সংঘর্ষে জড়ানো দুই নেতা সম্পর্কে আপন ভাই। তারা দুজনই সোনারগাঁ থানা বিএনপির পদধারী নেতা হওয়ায় ব্যক্তিগত বিরোধের প্রভাব দলীয় কর্মকাণ্ডেও পড়ছে বলে স্থানীয়দের ভাষ্য।

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, সোনারগাঁ থানা বিএনপির যুগ্ম সম্পাদক আব্দুর রউফ এবং একই কমিটির স্বেচ্ছাসেবকবিষয়ক সম্পাদক আব্দুল জলিলের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে আধিপত্য বিস্তার ও নেতৃত্বের প্রভাব নিয়ে বিরোধ চলে আসছে। বিভিন্ন সময় এই বিরোধকে কেন্দ্র করে দুই পক্ষের মধ্যে উত্তেজনা তৈরি হয়েছে। বুধবারের সংঘর্ষও সেই পুরোনো দ্বন্দ্বের ধারাবাহিকতা বলে স্থানীয়রা জানিয়েছেন।

সংঘর্ষে আব্দুর রউফের পক্ষের আবুবক্কর সিদ্দিক, মফিজুল ইসলাম, ইয়ানবী, বাবুল হোসেন ও রফিকুল ইসলাম আহত হন। অপরদিকে আব্দুল জলিলের পক্ষের সবুর খান, আব্দুল লতিফসহ আরও কয়েকজন আহত হয়েছেন। উভয় পক্ষের আহতের সংখ্যা অন্তত ১০ জন বলে জানা গেছে। সংঘর্ষের সময় ধাওয়া-পাল্টাধাওয়া ও মারধরের পাশাপাশি দলীয় কার্যালয়ে ভাঙচুরের ঘটনাও ঘটে।

স্থানীয় বাসিন্দাদের দাবি, দুই ভাইয়ের বিরোধ দীর্ঘদিনের। অতীতেও এই বিরোধকে কেন্দ্র করে আষাড়িয়ারচর এলাকায় উত্তেজনাকর পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল। এমনকি স্থানীয় কয়েকটি বাড়িতে অগ্নিসংযোগের ঘটনাও ঘটেছিল বলে তারা জানান। এসব ঘটনায় থানায় মামলা হয়েছিল বলেও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে। ফলে বুধবারের সংঘর্ষকে বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা হিসেবে দেখছেন না এলাকাবাসী।

আব্দুর রউফ অভিযোগ করেন, অতীতেও প্রতিপক্ষের লোকজন তার অনুসারীদের বাড়িঘরে আগুন দিয়েছে এবং তাকে হত্যার চেষ্টা করেছে। তার দাবি, প্রায় দুই মাস পর তিনি দলীয় কার্যালয়ে অবস্থান করছিলেন। এ সময় প্রতিপক্ষের লোকজন অতর্কিতে সেখানে হামলা চালিয়ে তাকে ও তার অনুসারীদের মারধর করে। হামলার কারণ হিসেবে তিনি দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক ও ব্যক্তিগত বিরোধের কথা উল্লেখ করেন।

তবে এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন আব্দুল জলিল। তার পাল্টা দাবি, পূর্বশত্রুতার জেরে তার এক অনুসারীকে একা পেয়ে প্রতিপক্ষের লোকজন হামলা করে। পরে তাকে দলীয় কার্যালয়ের ভেতরে অবরুদ্ধ করে মারধর করা হয়। তার চিৎকার শুনে আশপাশের লোকজন এগিয়ে এসে তাকে উদ্ধার করেন বলে তিনি দাবি করেন।

ঘটনার বিষয়ে সোনারগাঁ উপজেলা বিএনপির সিনিয়র সহসভাপতি কাজী নজরুল ইসলাম টিটু বলেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও গণমাধ্যমকর্মীদের কাছ থেকে তিনি সংঘর্ষের বিষয়টি জানতে পেরেছেন। তার ভাষ্য, দুই ভাইয়ের মধ্যে এর আগেও একাধিকবার সংঘর্ষ হয়েছে। এ ধরনের ঘটনা দলের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করার পাশাপাশি স্থানীয় মানুষের মধ্যেও আতঙ্ক তৈরি করছে।

তিনি আরও বলেন, কোনো তৃতীয় পক্ষ বিএনপির সুনাম ক্ষুণ্ন করার উদ্দেশ্যে এমন পরিস্থিতি তৈরি করছে কি না, সেটিও খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। বিষয়টি দলীয় ঊর্ধ্বতন নেতাদের সঙ্গে আলোচনা করে সাংগঠনিকভাবে ব্যবস্থা নেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হবে। জনমনে আতঙ্ক সৃষ্টি ও দলীয় শৃঙ্খলা ভঙ্গের অভিযোগ প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হতে পারে বলেও তিনি জানান।

এদিকে সংঘর্ষের খবর পাওয়ার পরপরই ঘটনাস্থলে পুলিশ পাঠানো হয় বলে জানিয়েছেন সোনারগাঁ থানার তদন্ত কর্মকর্তা আনোয়ার হোসেন। তিনি জানান, আহতদের চিকিৎসার ব্যবস্থা করা হয়েছে। তবে সংঘর্ষের ঘটনায় প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত কোনো পক্ষ থানায় লিখিত অভিযোগ দেয়নি।

পুলিশ জানিয়েছে, ঘটনার প্রকৃত কারণ ও সংঘর্ষে কারা কীভাবে জড়িত ছিল, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। লিখিত অভিযোগ পাওয়া গেলে তদন্তের ভিত্তিতে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

দুই পক্ষের পাল্টাপাল্টি অভিযোগের কারণে সংঘর্ষের প্রকৃত সূত্রপাত নিয়ে এখনও স্পষ্টতা পাওয়া যায়নি। তবে স্থানীয় রাজনীতিতে দীর্ঘদিনের ব্যক্তিগত বিরোধ যদি দলীয় সংঘাতে রূপ নেয়, তা ভবিষ্যতে আরও বড় ধরনের অপ্রীতিকর পরিস্থিতি তৈরি করতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন স্থানীয়রা। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পাশাপাশি স্থানীয় রাজনৈতিক নেতৃত্বের কার্যকর উদ্যোগের প্রয়োজন রয়েছে।

Tags :

Shakib

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

সর্বশেষ খবর