ব্রাহ্মণবাড়িয়ার পুলিশ লাইন্সে গান বাজানো নিয়ে তুলকালাম, পুলিশের লাঠিচার্জে আহত ২০ মাদরাসাছাত্র

ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা পুলিশ লাইন্সে আয়োজিত একটি সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে উচ্চশব্দে গান বাজানোকে কেন্দ্র করে পুলিশ ও স্থানীয় মাদরাসা শিক্ষার্থীদের মধ্যে মারাত্মক হট্টগোল ও অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটেছে। গভীর রাতে মাইকের উচ্চশব্দ কমানোর অনুরোধ জানানোকে কেন্দ্র করে দুই পক্ষের মধ্যে বাকবিতণ্ডা শুরু হয়, যা একপর্যায়ে সহিংস রূপ নেয়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পুলিশ নির্বিচারে লাঠিচার্জ শুরু করলে অন্তত ২০ জন মাদরাসাছাত্র আহত হন। আকস্মিক এই উত্তেজনাকর পরিস্থিতির কারণে জেলা পুলিশের আয়োজিত বর্ণাঢ্য সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানটি শেষ পর্যন্ত পুরোপুরি পণ্ড হয়ে যায়। মঙ্গলবার (১৮ আগস্ট) রাত সাড়ে ১১টার দিকে শহরের পশ্চিম মেড্ডা এলাকায় অবস্থিত জেলা পুলিশ লাইন্স প্রাঙ্গণে ঘটনাটি ঘটে। সংঘাতের পর আহত শিক্ষার্থীদের দ্রুত উদ্ধার করে ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা সদর হাসপাতালে পাঠানো হয় এবং সেখানে তাদের প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়া হয়েছে।

ঘটনার বিবরণে জানা যায়, চট্টগ্রাম রেঞ্জের উপ-মহাপরিদর্শক (ডিআইজি) আব্দুল কুদ্দুছ চৌধুরীর ব্রাহ্মণবাড়িয়া আগমন ও উপস্থিতি উপলক্ষে মঙ্গলবার সন্ধ্যায় পুলিশ লাইন্স মাঠে এই সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছিল। অনুষ্ঠানের প্রাথমিক পর্বে প্রধান অতিথি ডিআইজি উপস্থিত থেকে সার্বিক আয়োজন উপভোগ করেন এবং স্থান ত্যাগ করেন। তবে তিনি চলে যাওয়ার পরও মঞ্চে গভীর রাত পর্যন্ত উঁচুমাত্রায় গানবাজনা ও মাইক বাজানো হচ্ছিল। পুলিশ লাইন্সের একদম সীমানা সংলগ্ন এলাকাতেই অবস্থিত জামিয়া দারুল আরকাম আল-ইসলামিয়া মাদরাসা। পরদিন বুধবার সকালে মাদরাসার গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা নির্ধারিত থাকায় গভীর রাতের সাউন্ড বক্স ও বাদ্যযন্ত্রের বিকট শব্দে পরীক্ষার্থীদের মনোযোগ বিঘ্নিত হচ্ছিল এবং সাধারণ শিক্ষার্থীদের ঘুম ব্যাহত হচ্ছিল।

মাদরাসার শিক্ষার্থীদের বক্তব্য অনুযায়ী, এমন পরিস্থিতিতে অতিষ্ঠ হয়ে প্রথমে কয়েকজন ছাত্র সুশীলভাবে পুলিশ লাইন্সে গিয়ে দায়িত্বরতদের গানের শব্দ কিছুটা কমিয়ে বাজানোর অনুরোধ জানান। সে সময় সাময়িকভাবে সাউন্ড কমানো হলেও অল্প কিছুক্ষণ পর আবার একই গতিতে গানবাজনা শুরু হয়। এর প্রতিবাদে এবং পুনরায় অনুরোধ জানাতে দ্বিতীয় দফায় শতাধিক শিক্ষার্থী একত্রিত হয়ে পুলিশ লাইন্সের প্রধান ফটক পেরিয়ে ভেতরে প্রবেশ করেন। সেখানে উপস্থিত পুলিশ সদস্যদের সঙ্গে শিক্ষার্থীদের প্রচণ্ড কথা কাটাকাটি ও তর্কবিতর্ক শুরু হয়। বাকবিতণ্ডার একপর্যায়ে পুলিশ সদস্যরা চড়াও হন এবং শিক্ষার্থীদের ওপর আচমকা লাঠিচার্জ শুরু করেন। লাঠিপেটায় একে একে অন্তত ২০ জন শিক্ষার্থী মারাত্মকভাবে আহত হন।

ঘটনাটি নিমেষেই ছড়িয়ে পড়লে স্থানীয় ধর্মপ্রাণ মানুষ ও বিভিন্ন ধর্মীয় শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের মাঝে চরম ক্ষোভ ও অসন্তোষ ছড়িয়ে পড়ে। সার্বিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটার আশঙ্কায় পরিস্থিতি সামাল দিতে তাৎক্ষণিক উদ্যোগ নেয় জেলা পুলিশ প্রশাসন। গভীর রাতেই জামিয়া দারুল আরকাম আল-ইসলামিয়া মাদরাসার প্রতিষ্ঠাতা ও হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের মহাসচিব আল্লামা সাজিদুর রহমানের সঙ্গে এক জরুরি বৈঠকে বসেন ব্রাহ্মণবাড়িয়ার পুলিশ সুপার শাহ মো. আব্দুর রউফ। রুদ্ধদ্বার এই মধ্যস্থতা বৈঠকে জেলা পরিষদের প্রশাসক সিরাজুল ইসলামসহ এলাকার শীর্ষস্থানীয় ব্যক্তিবর্গ উপস্থিত ছিলেন।

বৈঠকে মাদরাসা কর্তৃপক্ষ ও ওলামায়ে কেরামের পক্ষ থেকে স্পষ্ট কয়েকটি শর্ত পেশ করা হয়। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিল— ঘনবসতিপূর্ণ ও সংবেদনশীল আবাসিক এলাকা সংলগ্ন পুলিশ লাইন্সে ভবিষ্যতে কখনো এই ধরনের উচ্চশব্দযুক্ত গানবাজনার আয়োজন না করা, আহত শিক্ষার্থীদের যাবতীয় চিকিৎসার ব্যয়ভার ও সুচিকিৎসা নিশ্চিত করা এবং বিনা উসকানিতে হামলাকারী দায়ী পুলিশ সদস্যদের চিহ্নিত করে তদন্ত সাপেক্ষে তাদের বিরুদ্ধে কঠোর প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া। তারা স্পষ্ট জানান, এই দাবিগুলো অবিলম্বে বাস্তবায়ন করা না হলে সাধারণ শিক্ষার্থীদের সঙ্গে নিয়ে পরবর্তীতে কঠোর আন্দোলন গড়ে তোলা হবে। বৈঠক শেষে পুলিশ সুপার পুরো ঘটনায় দুঃখ প্রকাশ করেন এবং মাদরাসা কর্তৃপক্ষের উত্থাপিত দাবিসমূহ মেনে নেওয়ার পাশাপাশি একটি নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে দোষীদের উপযুক্ত শাস্তির আশ্বাস দেন।

Tags :

Shakib

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

সর্বশেষ খবর