ইউরোপের উন্নত জীবন এবং মোটা অঙ্কের উপার্জনের স্বপ্নে বিভোর তরুণদের নিশানা বানিয়ে লিবিয়ায় এক নির্মম নির্যাতন ও মাফিয়া ফাঁদ গড়ে তুলেছে পাচারকারী চক্র। ইতালি পাঠানোর মিথ্যা আশ্বাস দিয়ে বাংলাদেশিদের সেখানে জিম্মি করা হচ্ছে। লিবীয় সশস্ত্র সন্ত্রাসীদের সঙ্গে যোগসাজশ করে একদল অসাধু বাংলাদেশি এই ভয়ংকর সিন্ডিকেট পরিচালনা করছে। আটকে রাখা ভুক্তভোগীদের ওপর অমানুষিক নির্যাতন চালিয়ে বাংলাদেশে থাকা তাঁদের পরিবারের কাছ থেকে কোটি কোটি টাকার মুক্তিপণ আদায় করাই এই চক্রের মূল লক্ষ্য।
ভীতিপ্রদ এই ব্যবস্থার হাত থেকে কোনোক্রমে বেঁচে ফিরে আসা বরিশালের বাবুগঞ্জ উপজেলার তিলের চর গ্রামের বাসিন্দা আমিনুল ইসলাম শোনালেন তাঁর রোমহর্ষক অভিজ্ঞতার কথা। তিনি জানান, ভালো চাকরির আশায় গত বছর সৌদি আরব ও মিসর পথ ধরে লিবিয়া গিয়ে দুই মাস বন্দিশালায় চরম নির্যাতন সহ্য করেছেন। পরবর্তীতে মুক্তিপণ দিয়ে দেশে ফিরতে সক্ষম হলেও শারীরিক ও মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছেন তিনি।
আমিনুলের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, পিরোজপুরের নাজিরপুরের বাসিন্দা বাবু চৌধুরী, তাঁর মামা দ্বীন ইসলাম এবং বাগেরহাটের চিতলমারীর খাইরুল মোল্লা মিলে লিবিয়ায় এই মাফিয়া সাম্রাজ্য গড়ে তুলেছে। ১২ লাখ টাকার চুক্তিতে ইতালি যাওয়ার উদ্দেশ্যে আমিনুল প্রথমে নগদ ৮ লাখ ২৫ হাজার টাকা এবং সঙ্গে দুই হাজার মূল্যের ডলার নিয়ে যাত্রা করেন। এই চক্রের শক্তিশালী একটি নেটওয়ার্ক হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে সক্রিয় রয়েছে। সেখানে বিশেষ ‘কোড নাম’ ব্যবহার করে যাত্রীকে কোনো বাধা ছাড়াই বিমানে তুলে দেওয়ার বন্দোবস্ত করা হয়।
ট্যুরিস্ট ভিসায় জেদ্দা ও মিসর হয়ে লিবিয়ার বেনগাজি বিমানবন্দরে নামার পরপরই শুরু হয় মূল তাণ্ডব। বিমানবন্দরে নেমেই কাড়িয়া নেওয়া হয় পাসপোর্ট, তারপর পেছনের গোপন পথ দিয়ে প্রাইভেটকারে করে জিম্মি করা হয় ‘গেম হাউস’ নামের নির্জন নির্যাতনকেন্দ্রে। সেই বন্দিশালায় আগে থেকেই প্রায় ২৫০ থেকে ৩০০ জন বাংলাদেশি জিম্মি ছিলেন। সেখানে পিটিয়ে ও অমানবিক নির্যাতন করে সেই ভিডিও দেশে পরিবারের কাছে পাঠিয়ে ২০ লাখ টাকা দাবি করা হয়। বাধ্য হয়ে ভিটামাটি বিক্রি ও ঋণ করে ১০ লাখ টাকা পাঠায় আমিনুলের পরিবার। এমনকি দেশে থাকা তাঁর সাড়ে তিন লাখ টাকার মোটরসাইকেলটিও চক্রের দেশীয় স্বজনেরা এসে ছিনিয়ে নেয়।
বেনগাজী ও ত্রিপোলির মধ্যবর্তী সাহারা মরুভূমির গোপন আস্তানায় জিম্মিদের খাবার না দিয়ে ফেলে রাখা হয়। মুক্তিপণ দিতে না পারলে বা দেরি হলে সরাসরি গুলি করে বালুর নিচে পুঁতে ফেলার নির্মম ঘটনা অহরহ ঘটছে। আবার যারা কোনোমতে টাকা দেয়, তাদেরও রেহাই নেই—ঝুঁকিপূর্ণ আবহাওয়ার মধ্যে ছোট বোটে তুলে ভূমধ্যসাগরে ভাসিয়ে দেওয়া হয়, যেখানে ঢেউয়ের তোড়ে ট্রলার ডুবে অনেকেরই মর্মান্তিক সলিল সমাধি ঘটে।
বর্তমানে লিবিয়ার বিভিন্ন গোপন আস্তানায় শত শত বাংলাদেশি তরুণ চরম বন্দিদশার মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন। দেশে ফিরে আমিনুল অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে আইনি মামলা দায়ের করেছেন। পুলিশ ইতিমধ্যেই মানবপাচার চক্রের অন্যতম সদস্য দ্বীন ইসলামের ভাই মঞ্জুর ইসলামকে গ্রেপ্তার করেছে। তবে মামলা দায়েরের পর থেকে আসামিদের হুমকি-ধমকিতে চরম নিরাপত্তাহীনতা ও আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছেন ভুক্তভোগী ওই তরুণ ও তাঁর পরিবার।


