বাংলাদেশের জনপ্রিয় রকশিল্পী মাহফুজ আনাম জেমস ও তাঁর ব্যান্ড ‘নগরবাউল’-এর বিরুদ্ধে ইতালির রোমে ৩৫ হাজার ইউরো প্রতারণার অভিযোগ করা হয়েছে। রোমের একটি কনসার্ট আয়োজনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট আবুল মোয়াজ স্থানীয় পুলিশের কাছে এ অভিযোগ দায়ের করেন। অভিযোগের সঙ্গে তিনি ১৭ পৃষ্ঠার একটি বিস্তারিত নথিও জমা দিয়েছেন বলে জানা গেছে।
শুক্রবার, ২১ আগস্ট ২০২৬, স্থানীয় সময় সকাল ১১টা ২০ মিনিটে রোমের ‘লেজিওনে কারাবিনিয়েরি লাজিও’ পুলিশ স্টেশনে অভিযোগটি করা হয়। অভিযোগকারী জানিয়েছেন, রোম ও ভেনিসে দুটি সংগীতানুষ্ঠানের আয়োজনের জন্য জেমস ও তাঁর দলের কাছে মোট ৩৫ হাজার ইউরো দেওয়া হয়েছিল। বাংলাদেশি মুদ্রায় যার পরিমাণ প্রায় ৪৬ লাখ টাকা।
অভিযোগের মূল বক্তব্য হলো, নির্ধারিত দুই অনুষ্ঠানের মধ্যে জেমস শুধু রোমের কনসার্টে অংশ নেন। ভেনিসের অনুষ্ঠানটি তাঁর দলের মাধ্যমে সম্পন্ন হয়নি বলে অভিযোগকারীর দাবি। তাঁর অভিযোগ, একই শিল্পী বা দলকে কেন্দ্র করে ভেনিসের অনুষ্ঠান অন্য একটি প্রতিষ্ঠানের অধীনে আয়োজন করা হয়েছে। এ কারণেই তিনি আর্থিক প্রতারণার অভিযোগ তুলে পুলিশের দ্বারস্থ হয়েছেন।
তবে বিষয়টি নিয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ আইনি দিক রয়েছে। পুলিশের কাছে অভিযোগ দায়ের হওয়া মানেই আদালতে মামলা প্রমাণিত হওয়া বা অভিযোগ সত্য হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হওয়া নয়। এটি বর্তমানে একটি ফৌজদারি অভিযোগের পর্যায়ে রয়েছে। ইতালীয় কর্তৃপক্ষ অভিযোগে উল্লিখিত নথি, অর্থ লেনদেন, অনুষ্ঠান আয়োজনের চুক্তি এবং সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর বক্তব্য যাচাই করে পরবর্তী পদক্ষেপ নিতে পারে।
এখন পর্যন্ত জেমস বা ‘নগরবাউল’-এর পক্ষ থেকে এই অভিযোগের বিষয়ে বিস্তারিত বক্তব্য পাওয়া যায়নি। দলের ব্যবস্থাপনার সঙ্গে যুক্ত রুবাইয়াৎ ঠাকুরের বক্তব্যও পুলিশের কাছে জমা দেওয়া অভিযোগপত্রে উল্লেখ নেই। ফলে অভিযোগের বিপরীতে জেমসের দল কী ব্যাখ্যা দেয়, সেটি পরবর্তী সময়ে বিষয়টির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক হয়ে উঠতে পারে।
এর আগে জেমস ও তাঁর দলের ইতালি সফরকে ঘিরে আরেকটি বিতর্ক সামনে আসে। রোমের একটি হোটেল কর্তৃপক্ষ তাঁদের জন্য বরাদ্দ করা চারটি অ্যাপার্টমেন্টের পরিচ্ছন্নতা ও ব্যবহারের অবস্থা নিয়ে অভিযোগ করে। গত ১৯ আগস্ট আয়োজক আবুল মোয়াজকে পাঠানো এক ই-মেইলে হোটেল কর্তৃপক্ষ দাবি করে, কক্ষগুলো অত্যন্ত খারাপ অবস্থায় পাওয়া গেছে। বিশেষ করে ৫৪৯ নম্বর অ্যাপার্টমেন্টটির অবস্থা সবচেয়ে বেশি নাজুক ছিল বলে হোটেল কর্তৃপক্ষ উল্লেখ করে।
হোটেলের পক্ষ থেকে বলা হয়, কক্ষটি পরিষ্কার করতে স্বাভাবিক সময় ও ব্যবস্থার তুলনায় অতিরিক্ত পরিশ্রম করতে হয়েছে। এ কারণে তাদের নিয়ম অনুযায়ী ২০০ ইউরো জরিমানাও ধার্য করা হয়। পাশাপাশি অতিথিরা রিসেপশনে যোগাযোগ না করে এবং আনুষ্ঠানিকভাবে চেক-আউটের প্রক্রিয়া সম্পন্ন না করেই হোটেল ছেড়ে গেছেন—এমন অভিযোগও করা হয়।
তবে জেমসের ব্যবস্থাপনা পক্ষ হোটেলের অভিযোগের কিছু অংশ অস্বীকার করেছে। রুবাইয়াৎ ঠাকুর জানিয়েছেন, দলের সদস্যরা চারটি পৃথক কক্ষে অবস্থান করছিলেন। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, জেমস ছিলেন ৩৪৫ নম্বর কক্ষে এবং তিনি নিজে ছিলেন ২৪৬ নম্বর কক্ষে। ৫৪৯ নম্বর কক্ষে একজন সংগীতশিল্পী ছিলেন এবং সেখানে সামান্য অপরিচ্ছন্নতার বিষয়টি নিয়ে অভিযোগ উঠেছে বলে তিনি দাবি করেন।
চেক-আউট না করে হোটেল ছাড়ার অভিযোগও তিনি প্রত্যাখ্যান করেছেন। তাঁর বক্তব্য, ইতালিতে পাসপোর্ট জমা থাকার কারণে নিয়ম ভেঙে হোটেল ছেড়ে যাওয়া বাস্তবে সম্ভব নয়। দলের সদস্যরা স্বাভাবিক নিয়মেই চাবি দিয়ে হোটেল ত্যাগ করেছেন বলেও তিনি দাবি করেন।
একই সফরকে ঘিরে পরপর দুটি অভিযোগ সামনে আসায় বিষয়টি এখন বাড়তি গুরুত্ব পেয়েছে। তবে হোটেল-সংক্রান্ত বিরোধ এবং ৩৫ হাজার ইউরোর আর্থিক প্রতারণার অভিযোগ—দুটি বিষয়কে একই আইনি ঘটনা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। হোটেলের অভিযোগটি মূলত আবাসন ও ক্ষয়ক্ষতি-সংক্রান্ত, আর পুলিশের কাছে করা নতুন অভিযোগটি অর্থ লেনদেন ও কনসার্ট আয়োজনের চুক্তি নিয়ে।
এ মুহূর্তে ৩৫ হাজার ইউরোর অর্থ প্রদান, রোম ও ভেনিসের অনুষ্ঠান আয়োজনের চুক্তি, জেমসের দলের সঙ্গে আয়োজকের সমঝোতার শর্ত এবং ভেনিসের অনুষ্ঠান অন্য প্রতিষ্ঠানের অধীনে হওয়ার বিষয়গুলোই তদন্তে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ের পর ইতালীয় পুলিশ প্রয়োজন মনে করলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানগুলোর বক্তব্য নিতে পারে।
ফলে অভিযোগ দায়েরের খবরকে সরাসরি জেমসের বিরুদ্ধে প্রতারণা প্রমাণিত হওয়ার ঘটনা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। তদন্ত শেষে ইতালীয় কর্তৃপক্ষ কী সিদ্ধান্ত নেয় এবং জেমস ও তাঁর দলের পক্ষ থেকে কী ব্যাখ্যা দেওয়া হয়, তার ওপরই পরবর্তী পরিস্থিতি অনেকাংশে নির্ভর করবে।


