রংপুর নগরীর মাছুয়াপাড়ায় একই পরিবারের চারজনকে হত্যার ঘটনায় সন্দেহভাজন হিসেবে দুই যুবককে আটক করেছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। আটক দুজনের নাম সিদ্ধার্থ ও মুগ্ধ বলে জানা গেছে। তারা দুজনই ওই এলাকার বাসিন্দা। রোববার ২৩ আগস্ট ভোর পর্যন্ত তাদের আটকের তথ্য পাওয়া যায়। তবে হত্যাকাণ্ডে তাদের সংশ্লিষ্টতার বিষয়টি এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত করেনি পুলিশ।
নিহত চারজন হলেন রংপুর জিলা স্কুলের সাবেক শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী, তার স্ত্রী প্রীতিলতা চক্রবর্তী, মেয়ে আগামী চক্রবর্তী পার্থী এবং ছেলে আয়ুশ চক্রবর্তী প্রিয়ম। গণপতির বয়স ছিল ৬৫ বছর, প্রীতিলতার ৫০, আগামী চক্রবর্তীর ২৪ এবং প্রিয়মের বয়স ১২ বছর।
শনিবার ২২ আগস্ট রাতে নগরীর মাছুয়াপাড়ায় নিজ বাড়ি থেকে তাদের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। স্থানীয়দের কাছ থেকে খবর পেয়ে কোতোয়ালি থানা পুলিশ বাড়িটিতে গিয়ে চারজনের মরদেহ দেখতে পায়। বাড়ির ভেতর থেকে পচা দুর্গন্ধ বের হওয়ায় বিষয়টি প্রথমে স্থানীয়দের নজরে আসে।
দোতলা বাড়িটির বিভিন্ন স্থানে মরদেহগুলো পড়ে ছিল। ছাদ থেকে গণপতি চক্রবর্তীর মরদেহ উদ্ধার করা হয়। সিঁড়িতে পাওয়া যায় তার স্ত্রী প্রীতিলতা ও মেয়ে আগামী চক্রবর্তীর মরদেহ। আর ছেলে প্রিয়মের মরদেহ ছিল শোবার ঘরের খাটের নিচে। পরে ময়নাতদন্তের জন্য রোববার ভোর ৪টার দিকে মরদেহগুলো রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে পাঠানো হয়।
পুলিশের প্রাথমিক ধারণা, হত্যাকাণ্ডটি ঘটেছে ঘটনার দুই থেকে তিন দিন আগে। বাড়িতে বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন অবস্থায় পাওয়া যায়। একই সঙ্গে টাকা-পয়সা ও স্বর্ণালংকার রাখার স্থানসহ বিভিন্ন আসবাবপত্র ও জিনিসপত্র তছনছ করা ছিল। এসব আলামতের ভিত্তিতে শুরুতে ডাকাতির উদ্দেশ্যে হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হওয়ার বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখা হচ্ছে। তবে হত্যার প্রকৃত উদ্দেশ্য এখনো নিশ্চিত নয়।
চারজনের মৃত্যুর খবর পাওয়ার পরপরই আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর একাধিক দল এলাকায় অভিযান শুরু করে। এরই মধ্যে সিদ্ধার্থ ও মুগ্ধকে সন্দেহভাজন হিসেবে আটক করা হয় বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি। আটকদের একজন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তৎপরতা টের পেয়ে পালিয়ে পাশের রেশম উন্নয়ন বোর্ডের তুতবাগানে আশ্রয় নেন বলে জানা গেছে। পরে তুতবাগানের পাশের দখীগঞ্জ শ্মশান এলাকা থেকে তাকে আটক করা হয়।
তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, হত্যাকাণ্ডের পর ওই ভবনে বসে আটক যুবকদের ইয়াবা সেবনের আলামত পাওয়া গেছে। স্থানীয় কয়েকজন যুবকের একটি দল এ ঘটনার সঙ্গে জড়িত থাকতে পারে এবং ডাকাতির উদ্দেশ্যেই তারা বাড়িতে প্রবেশ করেছিল—এমন তথ্যও তদন্তে সামনে এসেছে। তবে এসব তথ্য এখনো তদন্তাধীন এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর আনুষ্ঠানিক বক্তব্যে হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে আটকদের সম্পৃক্ততা নিশ্চিত করা হয়নি।
ঘটনাস্থল থেকে বিভিন্ন আলামত সংগ্রহ করেছে সিআইডির ক্রাইম সিন ইউনিট। পাশাপাশি রংপুর মহানগর পুলিশ, গোয়েন্দা বিভাগ, র্যাবসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বিভিন্ন সংস্থা তদন্তে যুক্ত হয়েছে। হত্যাকাণ্ডের ধরন, বাড়িতে প্রবেশের পথ, মূল্যবান সামগ্রী খোয়া গেছে কি না এবং নিহতদের সঙ্গে সন্দেহভাজনদের কোনো পূর্বপরিচয় ছিল কি না—এসব বিষয়ও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
রংপুর মহানগর পুলিশের মুখপাত্র ও উপকমিশনার (ডিবি) সনাতন চক্রবর্তী জানিয়েছেন, হত্যাকাণ্ডের তদন্তে একাধিক আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থা কাজ করছে। কেউ আটক হয়ে থাকলেও তা অন্য কোনো সংস্থার অভিযানের মাধ্যমে হতে পারে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
তিনি আরও জানান, প্রাথমিকভাবে চারজনকে শ্বাসরোধ করে হত্যা করা হয়ে থাকতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তবে হত্যার উদ্দেশ্য এখনো স্পষ্ট নয়। বাড়িঘরের অবস্থা দেখে টাকা-পয়সা ও মূল্যবান জিনিসপত্র লুটের সম্ভাবনাও তদন্তে গুরুত্ব পাচ্ছে। দ্রুত সময়ের মধ্যে ঘটনায় জড়িতদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তারের আশা করছে পুলিশ।
নিহত গণপতি চক্রবর্তী গত বছরের ডিসেম্বরে শিক্ষকতা থেকে অবসর নেন। অবসরের পর তিনি নিজ বাড়িতে হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসার চেম্বার পরিচালনা করতেন। তার মেয়ে আগামী চক্রবর্তী কারমাইকেল কলেজের ইংরেজি বিভাগ থেকে মাস্টার্স পরীক্ষা দিয়েছিলেন। ছোট ছেলে আয়ুশ চক্রবর্তী প্রিয়ম ছিল রংপুর জিলা স্কুলের পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থী।
একই পরিবারের চার সদস্যের মরদেহ উদ্ধারের ঘটনায় মাছুয়াপাড়া এলাকায় শোক ও আতঙ্কের পরিবেশ তৈরি হয়েছে। কী কারণে পরিবারের চার সদস্যকে একসঙ্গে হত্যা করা হলো, ঘটনার পেছনে কেবল লুটপাটই ছিল কি না এবং আটক দুই যুবকের সঙ্গে হত্যাকাণ্ডের প্রকৃত সম্পর্ক কী—এসব প্রশ্নের উত্তর এখন তদন্তের ওপর নির্ভর করছে। ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন, ঘটনাস্থল থেকে সংগ্রহ করা আলামত এবং জিজ্ঞাসাবাদ থেকে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে হত্যাকাণ্ডের রহস্য আরও স্পষ্ট হতে পারে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।


