শিল্পকারখানায় তীব্র গ্যাস-সংকটের কারণে চিনি ও ভোজ্যতেলের মতো নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের উৎপাদন ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এর জেরে দেশের পাইকারি ও খুচরা বাজারে খাদ্যপণ্যের সরবরাহে তীব্র টান ধরেছে। বিশেষ করে বাজারে চিনির সরবরাহ স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় প্রায় ৭০ শতাংশ পর্যন্ত কমে গেছে। সরবরাহ ঘাটতির সুযোগে পাইকারি ও খুচরা উভয় পর্যায়েই বাড়ছে চিনির দাম। একই সাথে বাজারে প্যাকেটজাত আটার দামেও ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা দেখা দিয়েছে।
বাংলাদেশ চিনি ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি মো. আবুল হাসেম জানান, গ্যাসের তীব্র সংকটের কারণে রিফাইনারিগুলোর উৎপাদন সক্ষমতা সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে এসেছে। ফলে মিলগুলো থেকে চাহিদামতো সরবরাহ পাওয়া যাচ্ছে না। অনেক কারখানার বাইরে দিনভর ট্রাক দাঁড়িয়ে থাকলেও ২৫ শতাংশের বেশি সরবরাহ মিলছে না, আবার কোনো কোনো মিলের সরবরাহ পুরোপুরি বন্ধ রয়েছে। উৎপাদন স্বাভাবিক না থাকায় পাইকারি বাজারে চিনির দাম কেজিতে ১ থেকে ২ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে। অপরদিকে মৌলভীবাজার ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি মো. আবুল হাশেম জানান, কারখানায় নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস না পাওয়ায় মিল থেকে চিনি ও তেল খালাস পেতে দীর্ঘ সময় বিলম্ব হচ্ছে।
পাইকারি বাজারের এই অস্থিরতার প্রভাব সরাসরি পড়েছে খুচরা পর্যায়ে। রাজধানীর মোহাম্মদপুর কৃষি মার্কেটের বিক্রেতারা জানান, গত এক সপ্তাহের ব্যবধানে ৫০ কেজির প্রতি বস্তা চিনিতে দাম বেড়েছে প্রায় ৫০০ টাকা। ঢাকার বাজারে বর্তমানে প্রতি কেজি খোলা চিনি ১১৫ টাকায় বিক্রি হচ্ছে, যা কয়েক দিন আগেও ১০৫ টাকা ছিল; অর্থাৎ কেজিতে দাম বেড়েছে ১০ টাকা। চিনির পাশাপাশি বেড়েছে আটার দামও। ২ কেজির আটার প্যাকেট এখন বাজারে ১১৫ থেকে ১২০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে, যা আগে ১০০ থেকে ১০৫ টাকার মধ্যে পাওয়া যেত।
একই চিত্র দেখা গেছে দেশের অন্যতম বৃহৎ পাইকারি বাজার চট্টগ্রামের খাতুনগঞ্জেও। গত সপ্তাহে খাতুনগঞ্জে প্রতি মণ খোলা চিনি ৩,৬০০ টাকায় বিক্রি হলেও বর্তমানে তা বেড়ে ৩,৭০০ থেকে ৩,৭৫০ টাকায় ঠেকেছে। খাতুনগঞ্জের পাইকারি ব্যবসায়ী মীর মোহাম্মদ সাজ্জাদ উল্লাহ জানান, কারখানা থেকে সরবরাহ কমে যাওয়ায় মণপ্রতি দাম ১০০ থেকে ১৫০ টাকা বেড়েছে। ফলে চট্টগ্রামের খুচরা বাজারগুলোতেও প্রতি কেজি খোলা চিনিতে ৫ থেকে ৭ টাকা পর্যন্ত বেড়ে ১১০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
অন্যান্য নিত্যপণ্যের মধ্যে ভোজ্যতেলের বাজারে সয়াবিনের সরবরাহ কিছুটা কমলেও আন্তর্জাতিক বাজার ও স্থানীয় সরবরাহের অজুহাতে পাম তেলের দাম মণে ৩০ থেকে ৫০ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে। তবে বাজারে পর্যাপ্ত মজুত থাকায় ভোজ্যতেল ও ময়দার দাম চট্টগ্রামে এখনও কিছুটা স্থিতিশীল রয়েছে।
বাংলাদেশে মূলত বিদেশ থেকে আমদানি করা অপরিশোধিত চিনি রিফাইনারিতে প্রক্রিয়াজাত করে বাজারজাত করা হয়। এই প্রক্রিয়াজাতকরণে প্রচুর পরিমাণ গ্যাসের প্রয়োজন হয়। একসময় দেশে ছয়টি শিল্প গ্রুপ চিনি শোধনের সাথে যুক্ত থাকলেও বর্তমানে মাত্র তিনটি গ্রুপ—মেঘনা গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজ (এমজিআই), সিটি গ্রুপ ও আবদুল মোনেম সুগার রিফাইনারি বাজার পরিচালনা করছে। ফলে এই তিনটির যেকোনো একটিতে উৎপাদন ব্যাহত হলে পুরো সরবরাহব্যবস্থা ভেঙে পড়ে। সংশ্লিষ্টদের মতে, গ্যাস-সংকট দ্রুত সমাধান না হলে নিত্যপণ্যের বাজারে এই চাপ আরও দীর্ঘায়িত হতে পারে।



