রংপুর নগরীর মাছুয়াপাড়ায় অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তীসহ পরিবারের চার সদস্যকে বর্বরোচিতভাবে হত্যার ঘটনায় পুলিশের দেওয়া বক্তব্য ও প্রাথমিক ময়নাতদন্ত প্রতিবেদনের তথ্য-উপাত্তে কিছু অসঙ্গতি দেখা দিয়েছে। সোমবার নিহতদের ময়নাতদন্ত শেষে বিস্তারিত তথ্য সাংবাদিকদের সামনে তুলে ধরেন রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ময়নাতদন্তকারী চিকিৎসক ডা. বাবলু কিশোর বিশ্বাস।
ঘটনার তদন্ত ও ময়নাতদন্তের প্রাথমিক তথ্যের ভিত্তিতে তিনি জানান, হত্যাকাণ্ডের শিকার চারজনকেই মূলত শ্বাসরোধ করে হত্যা করা হয়েছে। তবে পূর্বে পুলিশের পক্ষ থেকে দাবি করা চোয়াল ভেঙে ফেলার মতো কোনো আলামত তারা চিকিৎসাগত পরীক্ষায় পাননি। পাশাপাশি লাশের চেহারা এসিড দিয়ে ঝলসে দেওয়া হয়েছে বলে যে আলোচনা ছড়িয়েছিল, ময়নাতদন্তে সেটিরও কোনো সত্যতা পাওয়া যায়নি। দীর্ঘ সময় ধরে বদ্ধ অবস্থায় লাশগুলো পড়ে থাকার কারণে প্রাকৃতিকভাবে পচন ধরে চেহারা বিকৃত ও ঝলসে যাওয়ার মতো দেখিয়েছিল বলে ডা. বাবলু ব্যাখ্যা করেন। তিনি আরও জানান, অধিকতর নিশ্চিত হতে এবং মৃত্যুর প্রকৃত কারণ বিশদভাবে অনুধাবনের জন্য শরীর থেকে বিভিন্ন বিষাক্ত উপাদানের নমুনা সংগ্রহ করা হয়েছে, যা সিআইডি ল্যাবে রাসায়নিক পরীক্ষার জন্য পাঠানো হচ্ছে।
এই বক্তব্যের ঠিক আগের দিন রোববার এক সংবাদ সম্মেলনে রংপুর মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনার মোহাম্মদ আব্দুল মাবুদ ভিন্ন চিত্র তুলে ধরেছিলেন। পুলিশের পক্ষ থেকে জানানো হয়, গণপতি চক্রবর্তীর মেয়ে আগামী চক্রবর্তীর মুখ ও গলায় রশি পেঁচিয়ে এত তীব্রভাবে টান দেওয়া হয়েছিল যে তার চোখের মণি বাইরে বেরিয়ে আসে এবং দাঁতের চোয়াল ভেঙে যায়। চিকিৎসকের সাম্প্রতিক তথ্যের পর পুলিশের ওই প্রাথমিক বর্ণনার সাথে চিকিৎসা বিজ্ঞানের তথ্যের অমিল নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
হত্যাকাণ্ডের শিকার পরিবারটি নগরীর মাছুয়াপাড়ায় নিজেদের দোতলা বাড়িতে বসবাস করত। শনিবার স্বজন ও প্রতিবেশীরা তাদের কোনো সাড়াশব্দ না পেয়ে পুলিশকে খবর দেন। সেদিন রাত সাড়ে ১০টার দিকে পুলিশ গিয়ে তালাবন্ধ বাড়ির বিভিন্ন অংশ থেকে ক্ষতবিক্ষত চারজনের লাশ উদ্ধার করে। বাড়ির চিলেকোঠায় পাওয়া যায় ৬৫ বছর বয়সী অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তীর দেহ, সিঁড়িতে পড়ে ছিল তাঁর স্ত্রী প্রীতিলতা চক্রবর্তীর (৫২) মরদেহ, দোতলার শোবার ঘর থেকে উদ্ধার করা হয় রংপুর জিলা স্কুলের পঞ্চম শ্রেণিতে পড়ুয়া ১২ বছর বয়সী ছেলে প্রিয়ম চক্রবর্তীর লাশ এবং সিঁড়ির কাছেই পড়ে ছিল ২৫ বছরের মেয়ে আগামী চক্রবর্তীর নিথর দেহ।
স্থানীয়দের মাদকসেবনে বাধা দেওয়া ও প্রতিবাদের জের ধরেই এই নির্মম হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়েছে বলে প্রাথমিকভাবে জানা গেছে। ঘটনাটি রংপুরসহ পুরো দেশে ব্যাপক চাঞ্চল্য ও ক্ষোভের সৃষ্টি করেছে।
ঘটনায় সম্পৃক্ততার অভিযোগে পুলিশ ইতিমধ্যেই মাছুয়াপাড়া এলাকার দুই যুবককে গ্রেপ্তার করেছে। গ্রেপ্তারকৃতদের মধ্যে কানুদাসের ছেলে ২৩ বছর বয়সী মুগ্ধ দাস স্থানীয় সিটি বাজারে মাছের দোকানের কর্মচারী হিসেবে কাজ করতেন। তাঁর অপর সহযোগী ও মামাতো ভাই ১৯ বছর বয়সী সিদ্ধার্থ দাস জুয়েলারি দোকানে স্বর্ণের কারিগর ছিলেন। তাদের জিজ্ঞাসাবাদ অব্যাহত রয়েছে এবং ময়নাতদন্তের চূড়ান্ত রাসায়নিক রিপোর্ট হাতে এলে মৃত্যুর সঠিক সময় ও প্রক্রিয়া সম্পর্কে আরও সুস্পষ্ট ধারণা পাওয়া যাবে বলে আশা করা হচ্ছে।


