রোহিঙ্গা সংকট দশম বছরে বাংলাদেশ, কমছে আন্তর্জাতিক সহায়তা

বাংলাদেশে রোহিঙ্গাদের বড় আকারের আশ্রয় নেওয়ার নয় বছর পূর্ণ হয়েছে। দীর্ঘ এই সময়ে সংকটটি দশম বছরে প্রবেশ করলেও তাদের নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসনে দৃশ্যমান অগ্রগতি হয়নি। এর মধ্যে আন্তর্জাতিক সহায়তাও কমে যাওয়ায় কক্সবাজারের শরণার্থীশিবিরগুলোতে রোহিঙ্গাদের দৈনন্দিন জীবন ক্রমেই কঠিন হয়ে উঠছে।

২০১৭ সালের ২৫ আগস্ট মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে সহিংসতার পর বিপুলসংখ্যক রোহিঙ্গা সীমান্ত পেরিয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়। বিভিন্ন পর্যায়ে আসা রোহিঙ্গাদের মিলিয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া মানুষের সংখ্যা প্রায় ১০ লাখে পৌঁছায়। এরপর থেকে তারা কক্সবাজারের বিভিন্ন শরণার্থীশিবিরে বসবাস করছে। দীর্ঘদিন ধরে তাদের খাদ্য, চিকিৎসা, শিক্ষা, নিরাপত্তা ও অন্যান্য মৌলিক প্রয়োজন মেটাতে আন্তর্জাতিক সহায়তার ওপর বড় ধরনের নির্ভরতা রয়েছে।

বাংলাদেশের পররাষ্ট্রসচিব আসাদ আলম সিয়াম বার্তা সংস্থা এএনআইকে বলেছেন, রোহিঙ্গাদের নিজ দেশে ফিরিয়ে নিতে আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক বিভিন্ন ফোরামে বাংলাদেশের কূটনৈতিক তৎপরতা অব্যাহত রয়েছে। তবে প্রত্যাবাসনের জন্য মিয়ানমারে এমন পরিবেশ তৈরি করা প্রয়োজন, যেখানে রোহিঙ্গারা নিরাপদে এবং সম্মানের সঙ্গে ফিরে যেতে পারবেন।

পররাষ্ট্রসচিবের বক্তব্যে আরেকটি বড় উদ্বেগের বিষয় উঠে এসেছে—অর্থের সংকট। তিনি বলেন, রোহিঙ্গাদের জন্য আন্তর্জাতিক অর্থায়ন কমে যাচ্ছে। পরিস্থিতি সামাল দিতে বাংলাদেশ দ্বিপক্ষীয় ও আন্তর্জাতিক অংশীদারদের সঙ্গে যোগাযোগ করে সহায়তা বাড়ানোর চেষ্টা করছে।

কক্সবাজারের রোহিঙ্গা শিবিরে ১৯৯০-এর দশক থেকেই কাজ করছে কানাডাভিত্তিক দাতব্য সংস্থা হিউম্যান কনসার্ন ইন্টারন্যাশনাল। সংস্থাটির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মাহমুদা খান বলেন, বিশ্বজুড়ে একাধিক যুদ্ধ, সংঘাত ও মানবিক সংকট চলায় রোহিঙ্গা সংকট আন্তর্জাতিক মনোযোগের কেন্দ্র থেকে অনেকটাই সরে গেছে।

তার মতে, অতীতে বিভিন্ন দেশ ও দাতার কাছ থেকে যে পরিমাণ সহায়তা পাওয়া যেত, এখন তা আর পাওয়া যাচ্ছে না। অর্থের ঘাটতির সরাসরি প্রভাব পড়ছে শরণার্থীশিবিরের জীবনযাত্রায়। খাদ্য, চিকিৎসা ও শিক্ষার মতো মৌলিক সেবাগুলো সচল রাখা কঠিন হয়ে পড়ছে। রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে সচেতনতা ধরে রাখা তাই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করেন তিনি। মানুষের মনোযোগ কমলে সহায়তার পরিমাণও আরও কমে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

শিবিরে বসবাসরত রোহিঙ্গারাও সংকটের বাস্তব চিত্র তুলে ধরছেন। ২০১৭ সালে কুতুপালং শিবিরে আসা ৩০ বছর বয়সী হোসাইন জোহর বলেন, অনেক পরিবারের জন্য বর্তমানে পাওয়া রেশন পর্যাপ্ত নয়। তার দাবি, খাদ্য সহায়তা বাড়ানোর পাশাপাশি শরণার্থীদের শিক্ষা ও চিকিৎসাসেবার পরিধিও বাড়ানো প্রয়োজন।

রোহিঙ্গা সংকটের দীর্ঘস্থায়িত্ব নিয়ে বিশেষজ্ঞদের উদ্বেগও বাড়ছে। তাদের মতে, বিপুলসংখ্যক মানুষের খাদ্য, শিক্ষা ও চিকিৎসার মতো মৌলিক প্রয়োজন নিয়মিতভাবে পূরণ করা না গেলে শিবিরগুলোতে মানবিক পরিস্থিতির আরও অবনতি ঘটতে পারে। দীর্ঘমেয়াদি অনিশ্চয়তা শিশু ও তরুণদের শিক্ষা এবং ভবিষ্যৎ জীবন নিয়েও বড় প্রশ্ন তৈরি করছে।

এই সংকটের প্রভাব শুধু শরণার্থীশিবিরের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। দীর্ঘদিন ধরে বিপুলসংখ্যক মানুষকে আশ্রয় দেওয়ার কারণে কক্সবাজারের স্থানীয় জনগোষ্ঠী ও পরিবেশের ওপরও চাপ তৈরি হয়েছে। একই সঙ্গে প্রত্যাবাসনের বাস্তব অগ্রগতি না হলে বাংলাদেশের ওপর মানবিক ও অর্থনৈতিক চাপ আরও দীর্ঘায়িত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

নয় বছর পরও তাই রোহিঙ্গা সংকটের সমাধানের মূল চাবিকাঠি হয়ে আছে নিরাপদ প্রত্যাবাসন। আর সেই প্রত্যাবাসন কার্যকর না হওয়া পর্যন্ত শরণার্থীদের ন্যূনতম জীবনমান নিশ্চিত করতে আন্তর্জাতিক সহায়তা অব্যাহত রাখা জরুরি। অর্থায়ন কমে গেলে সংকটের মানবিক দিকটি আরও কঠিন হয়ে উঠতে পারে—এমন আশঙ্কাই এখন সংশ্লিষ্টদের।

Tags :

ratul Khaborwala

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সর্বশেষ খবর

খবরওয়ালা একটি বিশ্বস্ত অনলাইন নিউজ পোর্টাল, যেখানে বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও আপডেট প্রকাশ করা হয়। রাজনীতি, জাতীয় ও স্থানীয় সংবাদ, শিক্ষা, খেলাধুলা, ব্যবসা, বিনোদন ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনের গুরুত্বপূর্ণ খবর নিয়ে পাঠকদের জন্য রয়েছে নির্ভরযোগ্য ও সময়োপযোগী সংবাদ পরিবেশন।

© ২০২৬ খবরওয়ালা। সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।