বাংলা সাংবাদিকতা ও কথাসাহিত্যের এক উজ্জ্বল নাম রাহাত খান।

স্মরণ —

সাংবাদিক ও কথাসাহিত্যিক

রাহাত খান

সাংবাদিক হিসেবে তিনি ছিলেন অনুসন্ধিৎসু, নির্ভীক ও সমাজসচেতন; আর কথাসাহিত্যিক হিসেবে তাঁর লেখায় উঠে এসেছে নাগরিক জীবনের টানাপোড়েন, মানুষের মনস্তত্ত্ব, সম্পর্কের জটিলতা এবং সমকালীন সমাজবাস্তবতার নানা অনুষঙ্গ। দীর্ঘ কর্মজীবনে সাংবাদিকতা ও সাহিত্য—দুই ক্ষেত্রেই তিনি রেখে গেছেন স্বতন্ত্র ও স্মরণীয় অবদান।

রাহাত খান জন্মগ্রহণ করেন ১৯ ডিসেম্বর ১৯৪০ সালে, কিশোরগঞ্জের তাড়াইল উপজেলার পূর্ব জাওয়ার গ্রামের এক সম্ভ্রান্ত খান পরিবারে। শৈশব-কৈশোর থেকেই সাহিত্য ও জ্ঞানচর্চার প্রতি তাঁর গভীর অনুরাগ গড়ে ওঠে।

তিনি আনন্দমোহন কলেজে অর্থনীতি ও দর্শন বিষয়ে পড়াশোনা করেন এবং পরবর্তীতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ১৯৬১ সালে বাংলায় স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন। শিক্ষা জীবন শেষে শিক্ষকতা দিয়ে কর্মজীবনের সূচনা। ময়মনসিংহের নাসিরাবাদ কলেজ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় কলেজ, চট্টগ্রাম সরকারি কলেজসহ বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে তিনি অধ্যাপনা করেন।

তবে তাঁর কর্মজীবনের সবচেয়ে দীর্ঘ ও গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় সাংবাদিকতা। ষাটের দশক থেকেই তিনি দেশের অন্যতম প্রভাবশালী সংবাদপত্র দৈনিক ইত্তেফাক-এর সঙ্গে যুক্ত হন। দীর্ঘদিনের সাংবাদিকতায় তিনি সংবাদকর্মী, সম্পাদকীয় লেখক ও কলামিস্ট হিসেবে নিজের মেধা, মনন ও লেখনীশক্তির স্বাক্ষর রাখেন। তাঁর সাংবাদিকতার মূল শক্তি ছিল সমাজ ও রাষ্ট্রকে গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করা এবং মানুষের কথা বলার দায়বদ্ধতা।

সাহিত্যাঙ্গনেও রাহাত খান ছিলেন বহুমাত্রিক প্রতিভার অধিকারী। ছোটগল্প ও উপন্যাস—উভয় ক্ষেত্রেই তিনি গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখেন। তাঁর গল্প-উপন্যাসে মধ্যবিত্ত মানুষের জীবন, নাগরিক অস্তিত্বের সংকট, পারিবারিক সম্পর্ক, প্রেম-ভালোবাসা, সামাজিক বৈপরীত্য ও মানুষের অন্তর্লোক বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে। তাঁর স্বতন্ত্র গদ্যভঙ্গি তাঁকে বাংলা কথাসাহিত্যে একটি আলাদা অবস্থান এনে দেয়।

তাঁর উল্লেখযোগ্য গ্রন্থের মধ্যে রয়েছে—
‘অমল ধবল চাকরি’, ‘ছায়া দম্পতি’, ‘এক প্রিয়দর্শিনী’, ‘মন্ত্রীসভার পতন’, ‘দুই নারী’, ‘হে শূন্যতা’, ‘কোলাহল’ প্রভৃতি।

সাহিত্য ও সাংবাদিকতার পাশাপাশি সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলেও রাহাত খানের পারিবারিক পরিসর ছিল শিল্প-সাহিত্যসমৃদ্ধ। তাঁর সহধর্মিণী শিল্পী ও সংস্কৃতিকর্মী অপর্ণা খান কাব্যচর্চার পাশাপাশি বিভিন্ন সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। তিনি ‘উৎস সাংস্কৃতিক পরিষদ’ ও ‘উৎস নাট্যদল’-এর সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন। বাংলাদেশ রবীন্দ্রসঙ্গীত শিল্পী সংস্থা, পঞ্চকবির গানের সংগঠন ‘গীতশতদল’ ও ‘সরগম সাংস্কৃতিক সংগঠন’-এর সঙ্গেও তাঁর সম্পৃক্ততা ছিল। বেতার ও টেলিভিশনের নিয়মিত শিল্পী হিসেবে তিনি পরিচিতি লাভ করেন এবং ‘গানের খেয়া’র পরিচালক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন।

সৃজনশীল সাংবাদিকতা ও সাহিত্যচর্চায় অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ রাহাত খান ১৯৭৩ সালে বাংলা একাডেমি পুরস্কার এবং ১৯৯৬ সালে একুশে পদক লাভ করেন। এছাড়াও তিনি জীবদ্দশায় বিভিন্ন সম্মাননা ও পুরস্কারে ভূষিত হন।

একজন সাংবাদিকের কলমে তিনি সময়কে ধারণ করেছেন, আর একজন কথাসাহিত্যিকের সৃষ্টিশীলতায় ধারণ করেছেন মানুষের জীবন ও মনোজগতকে। তাঁর লেখায় যে সময়, সমাজ ও মানুষ ধরা পড়েছে—তা বাংলা সাহিত্য ও সাংবাদিকতার ইতিহাসে তাঁর অবদানকে দীর্ঘদিন স্মরণীয় করে রাখবে।

২৮ আগস্ট ২০২০ সালে, বার্ধক্যজনিত ও শারীরিক নানা জটিলতায় রাজধানীর নিউ ইস্কাটনের নিজ বাসভবনে ৮০ বছর বয়সে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন রাহাত খান।

আজ তাঁর প্রয়াণের ষষ্ঠ বার্ষিকীতে শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করছি বাংলা সাংবাদিকতা ও কথাসাহিত্যের এই কৃতী মানুষটিকে।

মানুষ চলে যায়, সময় পেরিয়ে যায়—কিন্তু তাঁর সৃষ্টিশীলতার আলো থেকে যায়।
রাহাত খানও তাঁর লেখা ও কর্মের মধ্য দিয়ে আমাদের সাহিত্য-সাংবাদিকতার ইতিহাসে বেঁচে থাকবেন।

শ্রদ্ধাঞ্জলি।

Tags :

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সর্বশেষ খবর

খবরওয়ালা একটি বিশ্বস্ত অনলাইন নিউজ পোর্টাল, যেখানে বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও আপডেট প্রকাশ করা হয়। রাজনীতি, জাতীয় ও স্থানীয় সংবাদ, শিক্ষা, খেলাধুলা, ব্যবসা, বিনোদন ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনের গুরুত্বপূর্ণ খবর নিয়ে পাঠকদের জন্য রয়েছে নির্ভরযোগ্য ও সময়োপযোগী সংবাদ পরিবেশন।

© ২০২৬ খবরওয়ালা। সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।