জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের ৫০তম মৃত্যুবার্ষিকী আজ। ১৩৮৩ বঙ্গাব্দের ১২ ভাদর ঢাকায় শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন বাংলা সাহিত্যের এই অসামান্য প্রতিভা। তাঁর মৃত্যুর পাঁচ দশক পেরিয়ে গেলেও অন্যায়, শোষণ, বঞ্চনা ও বৈষম্যের বিরুদ্ধে তাঁর উচ্চারণ এখনো বাঙালির সাহিত্য, সংস্কৃতি ও সামাজিক চেতনায় শক্তিশালীভাবে উপস্থিত।
১৯৭৬ সালে ঢাকার তৎকালীন পিজি হাসপাতালে, বর্তমানে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে পরিচিত প্রতিষ্ঠানে, কবির জীবনাবসান ঘটে। মৃত্যুর পর তাঁকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় মসজিদের পাশে সমাহিত করা হয়। প্রতি বছর তাঁর মৃত্যুবার্ষিকীতে সেখানে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ শ্রদ্ধা জানাতে সমবেত হন।
১৮৯৯ সালের ২৪ মে, ১১ জ্যৈষ্ঠ ১৩০৬ বঙ্গাব্দে পশ্চিমবঙ্গের বর্ধমান জেলার চুরুলিয়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন নজরুল। শৈশব থেকেই তাঁকে দারিদ্র্য ও নানা প্রতিকূলতার সঙ্গে লড়াই করতে হয়েছে। জীবনের কঠিন বাস্তবতা তাঁর সৃষ্টিশীলতাকে থামিয়ে দিতে পারেনি। বরং সেই অভিজ্ঞতাই পরবর্তী সময়ে তাঁর সাহিত্য ও সংগীতে নিপীড়িত মানুষের অধিকার, স্বাধীনতা ও মর্যাদার প্রশ্নকে আরও শক্তিশালী করে তোলে।
কাজী নজরুল ইসলামের সৃষ্টিশীল জীবনকাল ছিল তুলনামূলকভাবে সংক্ষিপ্ত—প্রায় ২৩ বছর। এই অল্প সময়েই তিনি বাংলা কবিতা, গান, গল্প, উপন্যাস, নাটক, প্রবন্ধসহ সাহিত্যের নানা শাখায় গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখেন। তাঁর রচনায় যেমন বিদ্রোহ ও মানবমুক্তির আকাঙ্ক্ষা রয়েছে, তেমনি রয়েছে প্রেম, সাম্য, ধর্মীয় সম্প্রীতি ও মানবতার বার্তা। হামদ, নাত, গজল ও শ্যামাসংগীত রচনার মধ্য দিয়ে তিনি বাংলা সংগীতের পরিসরকেও সমৃদ্ধ করেন।
নজরুলের সাহিত্যিক পরিচয়ের সবচেয়ে শক্তিশালী দিকগুলোর একটি তাঁর বিদ্রোহী চেতনা। অন্যায় ও নিপীড়নের বিরুদ্ধে তাঁর অবস্থান তাঁকে বাংলা সাহিত্যে স্বতন্ত্র মর্যাদা দিয়েছে। তাঁর সৃষ্টিতে মানুষের মুক্তি এবং সামাজিক বৈষম্যের অবসানের আকাঙ্ক্ষা বারবার উঠে এসেছে। সাহিত্যচর্চার পাশাপাশি তিনি ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধেও সক্রিয় ছিলেন এবং এ কারণে কারাবরণসহ নানা নিপীড়নের মুখোমুখি হন।
বাংলাদেশের সঙ্গে নজরুলের সম্পর্কও বিশেষ ঐতিহাসিক গুরুত্ব বহন করে। বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর ১৯৭২ সালের ২৪ মে ভারত সরকারের অনুমতি নিয়ে কবিকে সপরিবারে বাংলাদেশে আনা হয়। তাঁকে জাতীয় কবির মর্যাদা দেওয়া হয় এবং ঢাকার ধানমন্ডিতে রাষ্ট্রীয়ভাবে তাঁর বসবাসের ব্যবস্থা করা হয়।
১৯৭৪ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় তাঁকে সম্মানসূচক ডক্টর অব লিটারেচার বা ডি-লিট উপাধিতে ভূষিত করে। ১৯৭৬ সালে বাংলাদেশ সরকার তাঁকে বাংলাদেশের নাগরিকত্ব প্রদান করে। একই বছরের ২১ ফেব্রুয়ারি তিনি একুশে পদকে ভূষিত হন। অসুস্থতার কারণে জীবনের শেষ কয়েক দশকে তাঁর স্বাভাবিক সৃষ্টিশীল কর্মকাণ্ড থেমে গেলেও তাঁর আগের রচনাগুলো ক্রমেই বাংলা সংস্কৃতির স্থায়ী সম্পদে পরিণত হয়েছে।
নজরুলের গান ও কবিতা আজও বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলে নিয়মিত চর্চিত হয়। তাঁর সৃষ্টির মধ্য দিয়ে বাঙালি একই সঙ্গে বিদ্রোহ, সাম্য, প্রেম, মানবতা ও অসাম্প্রদায়িকতার বার্তা খুঁজে পায়। ফলে তাঁর মৃত্যুবার্ষিকী শুধু একজন কবির প্রয়াণস্মরণ নয়; এটি বাংলা সাহিত্য ও সংস্কৃতিতে তাঁর দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব স্মরণ করারও একটি গুরুত্বপূর্ণ উপলক্ষ।
মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এবারও বিভিন্ন কর্মসূচি গ্রহণ করেছে। ১২ ভাদর সকালে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, শিক্ষার্থী, কর্মকর্তা ও কর্মচারীরা অপরাজেয় বাংলার পাদদেশ থেকে শোভাযাত্রা করে কবির সমাধিতে যাবেন। সেখানে পুষ্পস্তবক অর্পণ ও ফাতেহা পাঠের পর সমাধি প্রাঙ্গণে আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হবে।
পাঁচ দশক আগে নজরুলের শারীরিক জীবন থেমে গেলেও তাঁর সাহিত্যিক ও সাংস্কৃতিক উপস্থিতি থামেনি। বাংলা ভাষায় তাঁর কবিতা ও গান এখনো নতুন প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দিচ্ছে স্বাধীনতা, সাম্য ও মানবতার কথা। সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে তাঁর রচনার পাঠ বদলালেও মানুষের অধিকার ও মর্যাদার প্রশ্নে তাঁর বক্তব্যের প্রাসঙ্গিকতা আজও অটুট।


