“বেঁচে থাকলে আজ তিনি পা রাখতেন ৭১-এ—
কিন্তু জাতির স্বাধীনতার জন্য মাত্র ১৫ বছর বয়সেই তিনি হয়ে গেছেন চিরকালের তরুণ।”
উত্তরের ছোট্ট জনপদ নওগাঁ শহরের উকিলপাড়ার যে বাড়িতে তাঁর শৈশব-কৈশোর কেটেছে, আজও সেই মাটিতে মিশে আছে এক কিশোর বীরের অমর স্মৃতি। তাঁর ডাকনাম ছিল মামুন।
১৯৫৬ সালের ১ জুলাই নওগাঁর নিয়ামতপুর উপজেলার রামকুড়া গ্রামের এক সমৃদ্ধ ও সুশিক্ষিত পরিবারে তাঁর জন্ম। পিতা নজরুল ইসলাম ছিলেন পেশায় চিকিৎসক। শৈশব থেকেই মেধাবী ও দুরন্ত প্রাণের অধিকারী মামুন প্রাথমিক শিক্ষা গ্রহণ করেন নওগাঁ পিটিআই স্কুলে। পরে পড়াশোনা করেন ঐতিহ্যবাহী সরকারি কেডি উচ্চ বিদ্যালয়ে। ১৯৭১ সালে তিনি ছিলেন রাজশাহী ক্যাডেট কলেজের নবম শ্রেণির ছাত্র। ইংরেজি ভাষায় তাঁর ছিল অসাধারণ দক্ষতা।
কিন্তু ইতিহাসের সেই অগ্নিঝরা বছর তাঁর কৈশোরকে আর স্বাভাবিক থাকতে দেয়নি।
মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলো—আর দেশের টানে মাত্র ১৪/১৫ বছরের কিশোর মামুনও হাতে তুলে নিলেন অস্ত্র।
বড় ভাই মুজাহিদকে সঙ্গে নিয়ে তিনি নওগাঁর তৎকালীন ইস্ট পাকিস্তান রেজিমেন্ট (ইপিআর) ক্যাম্পে প্রাথমিক প্রতিরোধ ও যুদ্ধের প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন। পরে জুন মাসের মাঝামাঝি সময়ে ভারতের আসামের হাফলং প্রশিক্ষণকেন্দ্রে মুজিব বাহিনীতে যোগ দেন। সেখানে সামরিক প্রশিক্ষণ শেষে জুলাইয়ের শেষ দিকে দেশে ফিরে আসেন তিনি।
দেশে ফিরে ১০-১১ জনের একটি মুক্তিযোদ্ধা দল গঠিত হয়। মান্দা উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়ন ও গ্রামে তাঁরা মুক্তিযুদ্ধের প্রস্তুতি ও প্রশিক্ষণ কার্যক্রম পরিচালনা করেন। সেই দলে কিশোর মামুন ছিলেন উপনেতা। বয়সে ছোট হলেও সাহস, দায়িত্ববোধ ও নেতৃত্বের গুণে তিনি হয়ে উঠেছিলেন সহযোদ্ধাদের আস্থার প্রতীক।
১৯৭১ সালের আগস্ট।
স্বাধীনতার স্বপ্ন তখন রক্তে লেখা হচ্ছে বাংলার পথে-প্রান্তরে।
নওগাঁর মান্দা উপজেলার কালিকাপুর এলাকায় শান্তি কমিটির সদস্যদের বিরুদ্ধে পরিচালিত একটি দুঃসাহসিক অভিযানে অংশ নেন মামুন। ২৬ আগস্ট কালিকাপুরে গ্রেনেড হামলার অভিযানে গিয়ে দুর্ভাগ্যক্রমে তিনি শত্রুপক্ষের হাতে ধরা পড়েন।
এরপর শুরু হয় নির্মম নির্যাতন।
পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী ও তাদের দোসররা এই কিশোর মুক্তিযোদ্ধার ওপর চালায় অকথ্য ও অমানুষিক শারীরিক নির্যাতন। কিন্তু স্বাধীনতার স্বপ্নে উজ্জীবিত সেই কিশোর বীরের আত্মাকে তারা পরাজিত করতে পারেনি। তাঁর শরীর ক্ষত-বিক্ষত হয়েছে, জীবন নিভে গেছে—কিন্তু তাঁর দেশপ্রেম, সাহস ও আত্মত্যাগ হয়ে উঠেছে চিরঅম্লান।
২৭ আগস্ট ১৯৭১।
মাত্র ১৫ বছর বয়সে শহীদ হন আব্দুল্লাহ আল মামুন—একাত্তরের সেই কিশোর বীর, যিনি নিজের জীবনের চেয়ে বাংলাদেশের স্বাধীনতাকে বড় করে দেখেছিলেন।
তাঁর আত্মত্যাগকে স্মরণীয় করে রাখতে ১৯৭৩ সালে নওগাঁর মান্দায় প্রতিষ্ঠিত হয় গোটগাড়ী শহীদ মামুন হাই স্কুল ও কলেজ। যে স্থানে তিনি শত্রুদের হাতে ধরা পড়েছিলেন, তাঁর স্মৃতিকে অমর করে সেই স্থানটির নাম দেওয়া হয়েছে ‘মামুন বাজার’।
নওগাঁ পৌর এলাকার ‘তাজ সিনেমার মোড়’ থেকে বিজিবি ক্যাম্প পর্যন্ত সড়কের নামকরণ করা হয়েছে ‘শহীদ মামুন সড়ক’ এবং পৌর বাজারের নাম ‘শহীদ মামুন মার্কেট’।
নামগুলো শুধু নাম নয়—
এগুলো আমাদের স্বাধীনতার ইতিহাসের স্মারক।
এগুলো মনে করিয়ে দেয়, বাংলাদেশের মানচিত্র শুধু রাজনৈতিক সিদ্ধান্তে আঁকা হয়নি; এই মানচিত্রের প্রতিটি ইঞ্চিতে মিশে আছে অগণিত মানুষের রক্ত, অশ্রু ও আত্মত্যাগ।
আব্দুল্লাহ আল মামুনের বয়স ছিল মাত্র পনেরো।
জীবন তাঁকে তখনও অনেক কিছু দেওয়ার কথা ছিল—
আরও পড়াশোনা, স্বপ্ন, ভালোবাসা, পরিবার, বন্ধুত্ব, একটি সুন্দর ভবিষ্যৎ।
কিন্তু তিনি বেছে নিয়েছিলেন স্বাধীন বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ।
আজ ২৭ আগস্ট তাঁর শাহাদাতের দিনে গভীর শ্রদ্ধায় স্মরণ করি সেই অকুতোভয় কিশোরকে।
বেঁচে থাকলে আজ তিনি পা রাখতেন ৭১-এ। অথচ স্বাধীনতার জন্য জীবন উৎসর্গ করে তিনি নিজেই হয়ে আছেন আমাদের চিরতরুণ প্রেরণা।
একাত্তরের কিশোর শহীদ আব্দুল্লাহ আল মামুন—
তোমার বয়স থেমে আছে পনেরোতে,
কিন্তু তোমার বীরত্বের বয়স কোনোদিন শেষ হবে না।
তোমার রক্তে অর্জিত স্বাধীন বাংলাদেশ
তোমাকে কোনোদিন ভুলবে না।
বিনম্র শ্রদ্ধাঞ্জলি।
জয় বাংলা।


