স্মরণ — ভাষাবীর এম এ ওয়াদুদ

ভাষার জন্য লড়াই, গণতন্ত্রের জন্য সংগ্রাম এবং বাঙালির স্বাধিকার ও অর্থনৈতিক মুক্তির আন্দোলনে যাঁরা নিজেদের জীবন উৎসর্গ করেছিলেন—ভাষাবীর এম এ ওয়াদুদ তাঁদেরই একজন।

বাঙালির রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক ইতিহাসের এক উত্তাল সময়ে ছাত্রনেতা হিসেবে তাঁর পথচলা শুরু। পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর বৈষম্য, স্বৈরাচার ও নিপীড়নের বিরুদ্ধে তিনি ছিলেন সোচ্চার। ভাষা আন্দোলনসহ বাঙালির অধিকার প্রতিষ্ঠার প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ আন্দোলনে তাঁর সক্রিয় ভূমিকা তাঁকে ইতিহাসে স্বতন্ত্র মর্যাদা দিয়েছে।

এম এ ওয়াদুদ জন্মগ্রহণ করেন ১ আগস্ট ১৯২৫ সালে, চাঁদপুর জেলার রাঢ়িরচর গ্রামে।

ছাত্রজীবন থেকেই তিনি রাজনীতি ও সামাজিক আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত হন। ১৯৪৮ সালে গণতান্ত্রিক যুবলীগ ও পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগের প্রতিষ্ঠাকালীন কর্মকাণ্ডে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। পরবর্তীতে ১৯৫৬ সালে কেন্দ্রীয় কচিকাঁচার মেলা প্রতিষ্ঠার সঙ্গেও তিনি যুক্ত ছিলেন। শিশু-কিশোরদের সুস্থ সাংস্কৃতিক বিকাশের এই সংগঠনটি পরবর্তীকালে বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক অঙ্গনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

রাজনৈতিক ও সাংবাদিকতার ক্ষেত্রেও এম এ ওয়াদুদের অবদান ছিল উল্লেখযোগ্য। তিনি পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগ, সাপ্তাহিক ইত্তেফাক ও দৈনিক ইত্তেফাকের প্রতিষ্ঠাকালীন সদস্যদের অন্যতম ছিলেন। তৎকালীন জাতীয় রাজনীতির দুই বিশিষ্ট নেতা হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী ও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ঘনিষ্ঠ সহযোগী হিসেবেও তিনি দায়িত্ব পালন করেন।

ছাত্রনেতা হিসেবে তাঁর সাংগঠনিক দক্ষতা ও নেতৃত্বের স্বীকৃতি আসে অল্প বয়সেই। ১৯৫৩-৫৪ সালে তিনি প্রাদেশিক ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক ছিলেন। এছাড়াও দুবার নগর ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক এবং একবার প্রাদেশিক ছাত্রলীগের সহ-সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন। ছাত্রসমাজকে সংগঠিত করা এবং গণতান্ত্রিক আন্দোলনকে এগিয়ে নেওয়ার ক্ষেত্রে তাঁর ভূমিকা ছিল গুরুত্বপূর্ণ।

ভাষা আন্দোলনে অকুতোভয় সৈনিক

১৯৫২-এর ভাষা আন্দোলন ছিল বাঙালির আত্মপরিচয় ও অধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রামের এক ঐতিহাসিক মাইলফলক। সেই আন্দোলনে এম এ ওয়াদুদ সক্রিয়ভাবে নেতৃত্ব দেন। ভাষার অধিকার প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে ভূমিকার কারণে তাঁকে একাধিকবার কারাবরণ করতে হয়। কারাগার, মামলা কিংবা রাষ্ট্রীয় নিপীড়ন—কোনোটিই তাঁকে তাঁর রাজনৈতিক আদর্শ ও সংগ্রামের পথ থেকে বিচ্যুত করতে পারেনি।

১৯৫৪ সালে ৯২(ক) ধারা জারি করে যুক্তফ্রন্ট সরকারকে বরখাস্ত করার পর পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী ছাত্র আন্দোলন দমনের উদ্যোগ নেয়। সেই সময়ও আন্দোলনকে স্তব্ধ করার উদ্দেশ্যে এম এ ওয়াদুদকে পুনরায় গ্রেপ্তার করে কারাগারে পাঠানো হয়।

এরও আগে, ১৯৪৯ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারীদের ন্যায্য দাবির আন্দোলনে নেতৃত্ব দেওয়ার কারণে তৎকালীন শাসকদের রোষানলে পড়েন তিনি। দীর্ঘদিন তাঁকে আত্মগোপনে থাকতে হয়।

একই বছর ছাত্র আন্দোলনে নেতৃত্ব দেওয়ার অভিযোগে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানসহ এম এ ওয়াদুদ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বহিষ্কৃত হন। এ ঘটনা তাঁর সংগ্রামী জীবনের একটি উল্লেখযোগ্য অধ্যায়।

সামরিক স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধেও আপসহীন

স্বাধীনতার পরও এম এ ওয়াদুদের রাজনৈতিক আদর্শ ও আপসহীনতা অটুট ছিল। ১৯৭৮ সালে সামরিক সরকারের সঙ্গে হাত মিলিয়ে মন্ত্রিত্ব গ্রহণের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করায় তাঁকে বিভিন্ন মেয়াদে তিনবার কারাবরণ করতে হয়। সামরিক শাসনের সময়ে তাঁর বিরুদ্ধে বারবার মামলা দায়ের করে তাঁকে হয়রানি করা হয়।

ক্ষমতা, পদ কিংবা ব্যক্তিগত সুবিধার বিনিময়ে আদর্শের সঙ্গে আপস না করাই ছিল তাঁর রাজনৈতিক জীবনের অন্যতম বৈশিষ্ট্য।

১৯৪৭ সালের দেশভাগের পর থেকে জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত এম এ ওয়াদুদ বাঙালির ভাষা, গণতন্ত্র, স্বাধিকার, সাম্য ও অর্থনৈতিক মুক্তির আন্দোলনের সঙ্গে নিবিড়ভাবে যুক্ত ছিলেন। তাঁর জীবন ছিল অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ এবং মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার এক নিরবচ্ছিন্ন সংগ্রামের প্রতিচ্ছবি।

রাজনীতির পাশাপাশি শিশু-কিশোরদের সাংস্কৃতিক বিকাশেও তাঁর অবদান স্মরণীয়। বাংলাদেশের প্রাচীনতম ও ঐতিহ্যবাহী শিশুকিশোর সংগঠন ‘কচিকাঁচার মেলা’র অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে তাঁর নাম ইতিহাসে অম্লান হয়ে আছে।

ব্যক্তিজীবনে এম এ ওয়াদুদের সন্তানদের মধ্যে রয়েছেন সাবেক শিক্ষামন্ত্রী ডা. দীপু মনি এবং ডায়াবেটিক ফুড সার্জন ডা. জাওয়াদুর রহিম ওয়াদুদ টিপু।

জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত সংগ্রাম, আদর্শ ও মানুষের প্রতি দায়বদ্ধতাকে ধারণ করা এই নির্ভীক মানুষটি ২৮ আগস্ট ১৯৮৩ সালে মৃত্যুবরণ করেন।

আজ তাঁর প্রয়াণদিবসে গভীর শ্রদ্ধায় স্মরণ করি ভাষাবীর, ছাত্রনেতা, সংগঠক ও আপসহীন গণতান্ত্রিক সংগ্রামী এম এ ওয়াদুদকে।

যাঁরা ইতিহাসের কঠিন সময়ে মানুষের অধিকারের পক্ষে দাঁড়ান, তাঁদের জীবন কখনো বিস্মৃত হয় না।
ভাষার অধিকার ও বাঙালির মুক্তির সংগ্রামে এম এ ওয়াদুদের অবদান তাই ইতিহাসের পাতায় চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে।

শ্রদ্ধাঞ্জলি।

Tags :

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সর্বশেষ খবর

খবরওয়ালা একটি বিশ্বস্ত অনলাইন নিউজ পোর্টাল, যেখানে বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও আপডেট প্রকাশ করা হয়। রাজনীতি, জাতীয় ও স্থানীয় সংবাদ, শিক্ষা, খেলাধুলা, ব্যবসা, বিনোদন ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনের গুরুত্বপূর্ণ খবর নিয়ে পাঠকদের জন্য রয়েছে নির্ভরযোগ্য ও সময়োপযোগী সংবাদ পরিবেশন।

© ২০২৬ খবরওয়ালা। সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।