বাংলা অভিনয়জগতের স্বর্ণযুগের যে কজন শিল্পী তাঁদের নিজস্ব অভিনয়শৈলী, প্রাণবন্ত উপস্থিতি ও অসামান্য প্রতিভা দিয়ে দর্শকের হৃদয়ে স্থায়ী আসন করে নিয়েছেন, মিতা চট্টোপাধ্যায় তাঁদেরই একজন। মঞ্চ, বেতার, চলচ্চিত্র ও টেলিভিশন—বিনোদনের প্রায় প্রতিটি মাধ্যমে দীর্ঘ সাত দশক ধরে তাঁর অনবদ্য পথচলা বাংলা অভিনয়ের ইতিহাসের এক উজ্জ্বল অধ্যায়।
দূরদর্শনের জনপ্রিয় ও দীর্ঘদিন প্রচারিত ধারাবাহিক ‘জন্মভূমি’-তে পিসিমার চরিত্রে তাঁর অসাধারণ অভিনয় তাঁকে নতুন প্রজন্মের দর্শকের কাছেও বিশেষভাবে পরিচিত করে তোলে। চরিত্রটির নিজস্ব বাচনভঙ্গি ও কণ্ঠস্বরকে বিশ্বাসযোগ্য করে তুলতে তিনি নিজের স্বাভাবিক কণ্ঠস্বর পর্যন্ত বদলে নিয়েছিলেন। তাঁর অভিনয়ে চরিত্রটি হয়ে উঠেছিল জীবন্ত, আপন ও স্মরণীয়।
১৯৩৬ সালের ৩০ আগস্ট কলকাতায় জন্মগ্রহণ করেন মিতা চট্টোপাধ্যায়। তাঁর ডাকনাম ছিল নমিতা। তাঁদের আদি পিতৃভূমি বাংলাদেশের কুষ্টিয়ায়। তাঁর পিতা ফণিভূষণ চট্টোপাধ্যায় ছিলেন কুষ্টিয়া আদালতের একজন আইনজীবী।
শৈশব থেকেই শিল্পের প্রতি তাঁর গভীর অনুরাগ। পিতার উৎসাহে স্কুলজীবনেই শুরু হয় নাচ, গান ও অভিনয়ের চর্চা। গানের শিক্ষক ছিলেন রাজেন বসু এবং নৃত্যের শিক্ষক মণি শঙ্কর। অল্প বয়সেই তিনি প্রবেশ করেন অভিনয়ের জগতে। মঞ্চ ও বেতার নাটকে অভিনয়ের মধ্য দিয়ে তাঁর শিল্পীজীবনের সূচনা। আকাশবাণী বিবিধ ভারতীতে প্রচারিত ‘ফিরে পাওয়া’ বেতার নাটকে তাঁর অভিনয় বিশেষ প্রশংসা অর্জন করে।
চলচ্চিত্রে শিশুশিল্পী হিসেবে তাঁর অভিষেক হয় ১৯৪৭ সালে হেমেন বসু পরিচালিত ‘ভুলি নাই’ ছবির মাধ্যমে। জীবনের প্রথম দিকে ‘নমিতা’ নামেই কয়েকটি ছবিতে অভিনয় করেছিলেন। কিন্তু একই সময়ে চিত্রজগতে একাধিক ‘নমিতা’ থাকায় স্বাতন্ত্র্য প্রতিষ্ঠার জন্য পরবর্তীতে তিনি হয়ে ওঠেন মিতা চট্টোপাধ্যায়।
১৯৫৫ সালে ‘চাটুয্যে বাঁড়ুজ্যে’ ছবিতে সবিতা চট্টোপাধ্যায়ের সঙ্গে যুগ্মভাবে নায়িকার ভূমিকায় অভিনয় করেন তিনি। ছবিতে তাঁর রোমান্টিক নায়ক ছিলেন জনপ্রিয় অভিনেতা ও কৌতুকশিল্পী ভানু বন্দ্যোপাধ্যায়। পরবর্তী সময়ে মূলত সহ-অভিনেত্রী ও নৃত্যশিল্পী হিসেবে বাংলা চলচ্চিত্রে নিজের শক্ত অবস্থান তৈরি করেন। উচ্চাঙ্গ সংগীতেও ছিল তাঁর যথেষ্ট দক্ষতা ও পরিচিতি।
বাংলা চলচ্চিত্রের স্বর্ণযুগে তিনি অভিনয় করেছেন অসংখ্য স্মরণীয় ছবিতে। তাঁর উল্লেখযোগ্য চলচ্চিত্রের মধ্যে রয়েছে—*‘পার্সোনাল অ্যাসিস্ট্যান্ট’, ‘চিত্রাঙ্গদা’, ‘রামপ্রসাদ’, ‘রাঙামাটি’, ‘সমাপিকা’, ‘অভিজ্ঞান’, ‘অদৃশ্য মানুষ’, ‘কুয়াশা’, ‘ইন্দ্রনাথ’, ‘সেতু’, ‘শ্বশুরবাড়ি’, ‘একটুকরো আগুন’, ‘শীলা’, ‘দুই বাড়ি’, ‘হানাবাড়ি’, ‘ছায়াসূর্য’, ‘প্রণয় পাশা’, ‘ব্যবধান’, ‘নবরূপা’, ‘অপরাজিতা’*সহ আরও বহু চলচ্চিত্র।
বাংলা চলচ্চিত্রের কিংবদন্তি নায়ক উত্তমকুমারের সঙ্গেও অভিনয় করেছেন ‘নবজন্ম’ ও ‘অন্নপূর্ণার মন্দির’-এ। ভানু বন্দ্যোপাধ্যায়ের পাশাপাশি কালী বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গেও তাঁর জুটি দর্শকের কাছে ছিল পরিচিত ও প্রিয়।
ষাট ও সত্তরের দশকে বাণিজ্যিক নাটকের নিয়মিত শিল্পী হিসেবে মঞ্চেও তাঁর ছিল উজ্জ্বল উপস্থিতি। সময় বদলেছে, মাধ্যম বদলেছে, দর্শকের রুচি বদলেছে—কিন্তু শিল্পের প্রতি তাঁর ভালোবাসা বদলায়নি। তাই মঞ্চ থেকে বেতার, চলচ্চিত্র থেকে টেলিভিশন—প্রতিটি যুগের সঙ্গে নিজেকে অসাধারণ দক্ষতায় মানিয়ে নিয়েছেন তিনি।
দীর্ঘ সাত দশকেরও বেশি সময়ের শিল্পীজীবনে মিতা চট্টোপাধ্যায় প্রমাণ করেছেন—সত্যিকারের শিল্পীর বয়স বাড়ে, কিন্তু শিল্পীসত্তার দীপ্তি কখনো ম্লান হয় না।
আজ তিনি জীবনের একানব্বইতম বছরে পা রাখলেন। বয়সের ভার তাঁকে থামাতে পারেনি; বরং তাঁর হাসিমাখা মুখ, প্রাণবন্ত অভিনয় ও শিল্পের প্রতি নিরন্তর ভালোবাসা আজও দর্শককে মুগ্ধ করে।
কাঁটাতারের এপার বাংলাদেশ থেকে ওপারের এই প্রিয় শিল্পীর জন্য রইল অফুরান ভালোবাসা, শ্রদ্ধা ও আন্তরিক শুভকামনা।
শুভ জন্মদিন, মিতা চট্টোপাধ্যায়।
আপনার শিল্পীজীবনের আলো আরও বহুদিন জ্বলুক।
জীবনের প্রতিটি দিন ভরে উঠুক সুস্থতা, আনন্দ ও প্রিয়জনের ভালোবাসায়।
শুভ জন্মদিন।
শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা।



