সংস্কৃতির পরিসর সংকুচিত হওয়ার শঙ্কা, শিল্পীদের উদ্বেগ

দেশের বিভিন্ন এলাকায় সংগীত ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে বাধা, আয়োজন বাতিলের চাপ এবং অনুষ্ঠানস্থলে হামলার ঘটনায় সংগীতাঙ্গনের শিল্পীদের মধ্যে উদ্বেগ বাড়ছে। শিল্পীদের ভাষ্য, সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে এ ধরনের হস্তক্ষেপ শুধু শিল্পীদের স্বাধীনভাবে কাজ করার সুযোগকে সীমিত করে না, বরং মানুষের মতপ্রকাশ, সৃজনশীলতা ও সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য নিয়েও বড় প্রশ্ন তৈরি করে।

সাম্প্রতিক কয়েকটি ঘটনায় বিষয়টি নতুন করে সামনে এসেছে। গত ১৯ আগস্ট কিশোরগঞ্জে একটি কনসার্ট বাতিলের নির্দেশ দেওয়া হয়। স্থানীয় ইমাম-ওলামা পরিষদ জেলা প্রশাসকের কাছে দেওয়া চিঠিতে অনুষ্ঠানটি আয়োজন করা হলে পরিস্থিতি জটিল হতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করে। এর পর একই রাতে ব্রাহ্মণবাড়িয়া পুলিশ লাইন্স প্রাঙ্গণে আয়োজিত একটি সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে হামলার ঘটনা ঘটে। সেখানে মাদ্রাসাছাত্রদের একটি দল অনুষ্ঠানস্থলে গিয়ে দর্শকদের বসার জন্য রাখা চেয়ার ভাঙচুর করে।

পরে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ লাঠিপেটা করলে অন্তত ৩০ জন আহত হন। আহতদের মধ্যে কয়েকজন পুলিশ সদস্যও ছিলেন। ঘটনার পর দায়িত্বে অবহেলার অভিযোগে তিন পুলিশ সদস্যকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়। এই সিদ্ধান্ত নিয়েও সংগীতাঙ্গনের কয়েকজন শিল্পী প্রশ্ন তুলেছেন। তাঁদের বক্তব্য, হামলা ও ভাঙচুরের পরিস্থিতিতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ভূমিকা কী হওয়া উচিত এবং দায়িত্ব পালনের পর তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হলে ভবিষ্যতে এমন পরিস্থিতিতে পুলিশের কার্যকারিতা কতটা বজায় থাকবে—এসব বিষয় স্পষ্ট হওয়া দরকার।

বাংলাদেশের জনপ্রিয় ব্যান্ড মাইলসের প্রতিষ্ঠাতা সদস্য এবং বাংলাদেশ মিউজিক্যাল ব্যান্ডস অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি হামিন আহমেদ মনে করেন, সাম্প্রতিক ঘটনাগুলোকে বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। তাঁর মতে, দেশের বিভিন্ন এলাকায় সংগীতচর্চা ও সাংস্কৃতিক আয়োজনের ক্ষেত্রে বাধা দেওয়ার প্রবণতা তৈরি হচ্ছে। বিষয়টি সরকারের গুরুত্বের সঙ্গে দেখা প্রয়োজন।

হামিন আহমেদের বক্তব্য অনুযায়ী, সংগীতকে কেবল বিনোদনের একটি মাধ্যম হিসেবে দেখলে এর সামাজিক ও অর্থনৈতিক গুরুত্বকে খাটো করা হয়। সংগীতের সঙ্গে শিল্পী, বাদ্যযন্ত্রী, শব্দপ্রযুক্তিবিদ, মঞ্চকর্মী, আয়োজকসহ অনেক মানুষের পেশা ও জীবিকা যুক্ত। ফলে কোনো অনুষ্ঠান হুমকি, চাপ, ভাঙচুর বা অন্য কোনো উপায়ে বন্ধ হয়ে গেলে তার প্রভাব শুধু একজন শিল্পীর ওপর পড়ে না; এর সঙ্গে যুক্ত পুরো একটি পেশাজীবী গোষ্ঠী ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।

তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশে দীর্ঘদিন ধরে ধর্মীয় মূল্যবোধ ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড পাশাপাশি চলেছে। তাই সাংস্কৃতিক আয়োজন নিয়ন্ত্রণে জোরজবরদস্তি বা উগ্রতার আশ্রয় নেওয়া দেশের দীর্ঘদিনের সামাজিক বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। এ ধরনের ঘটনার পেছনে কারা রয়েছে এবং কী কারণে এমন পরিস্থিতি তৈরি হচ্ছে, তা চিহ্নিত করে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।

শিরোনামহীন ব্যান্ডের সুরকার ও বেজবাদক জিয়াউর রহমান জিয়াও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ জানিয়েছেন। তাঁর মতে, সংস্কৃতিচর্চার পরিবেশ নিরাপদ না থাকলে সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব নিয়েও প্রশ্ন ওঠে। একই সঙ্গে দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিশ্চিত করার দায়িত্ব স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ওপরও রয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।

জিয়াউর রহমানের বক্তব্যে দেশের সংস্কৃতির বিস্তৃত পরিসরের কথাও উঠে এসেছে। তাঁর মতে, সংগীতের পাশাপাশি নৌকাবাইচসহ বিভিন্ন ঐতিহ্যবাহী আয়োজনও বাংলাদেশের সংস্কৃতির অংশ। এসব কর্মকাণ্ড মানুষের সামাজিক বন্ধন, ঐতিহ্য ও পরিচয়ের সঙ্গে যুক্ত। তাই সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য ও সৃজনশীল কর্মকাণ্ডে জোরপূর্বক বাধা দেওয়া কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য হওয়া উচিত নয়।

একই সঙ্গে তিনি ব্যক্তিস্বাধীনতা ও পারস্পরিক অধিকারের ভারসাম্যের ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন। তাঁর মতে, একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে নাগরিকের মতপ্রকাশ ও ব্যক্তিস্বাধীনতার অধিকার রয়েছে। তবে সেই অধিকার প্রয়োগের ক্ষেত্রে অন্য মানুষের অধিকারও বিবেচনায় রাখতে হবে। কোনো সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান নিয়ে কারও আপত্তি থাকলে সেটি আইন ও প্রশাসনিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে জানানো যেতে পারে। কিন্তু হামলা, ভাঙচুর বা ভয়ভীতি দেখিয়ে কোনো আয়োজন বন্ধ করে দেওয়া গ্রহণযোগ্য পদ্ধতি হতে পারে না।

গায়ক ও গিটারবাদক আহমেদ হাসান সানির উদ্বেগের জায়গাটি আরও বিস্তৃত। তিনি মনে করেন, সংস্কৃতির বিকাশ শুধু মঞ্চে গান বা অনুষ্ঠান আয়োজনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। শিশুদের সংগীতচর্চার সুযোগ, বিদ্যালয়ে পাঠাগার, বই পড়ার পরিবেশ এবং সাহিত্য ও সৃজনশীল কর্মকাণ্ডের চর্চাও একটি সহনশীল সমাজ গঠনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

সানি প্রশ্ন তুলেছেন, কেন সমাজে পাঠাগারের সংখ্যা ও পাঠাভ্যাস কমছে এবং কেন গল্পের বই পড়ার মতো অভ্যাস ধীরে ধীরে সংকুচিত হচ্ছে। তাঁর মতে, সংগীত, সাহিত্য ও অন্যান্য সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড মানুষের চিন্তার পরিসর বাড়াতে সাহায্য করে। ভিন্ন মতকে বোঝার সক্ষমতা তৈরি করে এবং সমাজে সহনশীলতার পরিবেশ গড়ে তুলতে ভূমিকা রাখে।

শিল্পীদের উদ্বেগের আরেকটি দিক হলো, সাংস্কৃতিক পরিসর সংকুচিত হলে এর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব শুধু অনুষ্ঠান আয়োজনের ওপর পড়ে না। নতুন প্রজন্মের শিল্পীদের বিকাশের সুযোগ কমে যেতে পারে। তরুণদের সৃজনশীল চর্চার জায়গা সংকুচিত হতে পারে। একই সঙ্গে ভিন্ন মত ও ভিন্ন রুচির মানুষের মধ্যে পারস্পরিক যোগাযোগের সুযোগও কমে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে।

এর আগে ২২ আগস্ট স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ বলেছিলেন, ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় বহু বছর ধরে সংগীত বা চলচ্চিত্র প্রদর্শনের ক্ষেত্রে কার্যত নিষেধাজ্ঞার মতো পরিস্থিতি রয়েছে। তাঁর এই বক্তব্যও সাংস্কৃতিক অঙ্গনে আলোচনার জন্ম দেয় এবং দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা স্থানীয় সাংস্কৃতিক পরিবেশ নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন সামনে আনে।

সাম্প্রতিক ঘটনাগুলোর পর শিল্পীদের আলোচনায় মূলত দুটি বিষয় গুরুত্ব পাচ্ছে—সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের স্বাধীনতা এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় রাষ্ট্রের দায়িত্ব। শিল্পীদের মতে, কোনো অনুষ্ঠান নিয়ে আপত্তি থাকলে তা নির্দিষ্ট আইন ও প্রশাসনিক কাঠামোর মধ্যেই নিষ্পত্তি করা উচিত। ব্যক্তিগত বা গোষ্ঠীগত চাপের মাধ্যমে অনুষ্ঠান বন্ধ করা হলে সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের স্বাভাবিক পরিবেশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

সংগীতশিল্পীদের বক্তব্যে আরও একটি বিষয় স্পষ্ট—সংস্কৃতি শুধু বিনোদনের ক্ষেত্র নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে মানুষের সৃজনশীলতা, পেশা, মতপ্রকাশ, সামাজিক যোগাযোগ এবং ঐতিহ্য। একটি সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান নিরাপদে আয়োজন করতে না পারা তাই কেবল একটি অনুষ্ঠানের সমস্যা হিসেবে দেখলে পুরো পরিস্থিতির গুরুত্ব বোঝা কঠিন।

শিল্পীদের মতে, সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড নিরাপদ রাখতে প্রশাসনের নিরপেক্ষ ভূমিকা, আইনশৃঙ্খলার কার্যকর প্রয়োগ এবং আয়োজনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে কোনো আয়োজন নিয়ে আপত্তি দেখা দিলে তা আলোচনার মাধ্যমে ও প্রচলিত আইনি প্রক্রিয়ায় সমাধানের সুযোগ রাখতে হবে। হামলা বা ভাঙচুরের মাধ্যমে সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড নিয়ন্ত্রণের প্রবণতা বন্ধ করা না গেলে ভবিষ্যতে এর প্রভাব দেশের সামগ্রিক সাংস্কৃতিক পরিবেশে পড়তে পারে।

Tags :

সামিউর রহমান রাতুল | উপ-সম্পাদক | খবরওয়ালা বাংলা

https://bn.khaborwala.com/

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সর্বশেষ খবর

খবরওয়ালা একটি বিশ্বস্ত অনলাইন নিউজ পোর্টাল, যেখানে বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও আপডেট প্রকাশ করা হয়। রাজনীতি, জাতীয় ও স্থানীয় সংবাদ, শিক্ষা, খেলাধুলা, ব্যবসা, বিনোদন ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনের গুরুত্বপূর্ণ খবর নিয়ে পাঠকদের জন্য রয়েছে নির্ভরযোগ্য ও সময়োপযোগী সংবাদ পরিবেশন।

© ২০২৬ খবরওয়ালা। সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।