বন্দরনগরী চট্টগ্রামে ডেঙ্গু পরিস্থিতির অবনতি ঘটতে শুরু করেছে। বছরের এই সময়ে সংক্রমণের যে ঊর্ধ্বমুখী ধারা দেখা যাচ্ছে, তা স্বাস্থ্য বিভাগের কর্মকর্তা ও সাধারণ মানুষের চিন্তা বাড়িয়ে দিয়েছে। মাত্র সেপ্টেম্বর মাসের প্রথম ছয় দিনেই চট্টগ্রামে নতুন করে আক্রান্তের সংখ্যা তিন শতাধিক ছাড়িয়ে গেছে। আক্রান্তের এই হঠাৎ বৃদ্ধিতে নগরের হাসপাতালগুলোতে বাড়ছে ডেঙ্গু রোগীর ভিড়।
চট্টগ্রাম সিভিল সার্জন কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, সদ্য বিদায়ী আগস্ট মাসে পুরো চট্টগ্রাম জেলা ও মহানগর মিলিয়ে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়েছিলেন ১,২০২ জন, যার মধ্যে মৃত্যু হয় দুজনের। তবে সেপ্টেম্বর শুরু হতেই সংক্রমণের গতি আরও তীব্র হয়ে উঠেছে। মাসের প্রথম পাঁচ দিনের পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করলেই তা স্পষ্ট দেখা যায়, যেখানে আক্রান্তের সংখ্যা এসে দাঁড়িয়েছে ৩৬৭ জনে এবং এরই মধ্যে প্রাণ হারিয়েছেন একজন। আক্রান্তের এই উল্লম্ফন সেপ্টেম্বরজুড়ে বড় ধরনের ডেঙ্গু সংকটের ইঙ্গিত দিচ্ছে।
তবে স্বাস্থ্য বিভাগের এই দাপ্তরিক হিসাবের বাইরেও ডেঙ্গুর প্রকৃত চিত্র আরও ভয়াবহ হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। অনেক রোগীই বিভিন্ন বেসরকারি হাসপাতাল, ক্লিনিক কিংবা ব্যক্তিগত চেম্বারে চিকিৎসা নিচ্ছেন, যার অনেক তথ্যই সিভিল সার্জন কার্যালয়ের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত থাকে না। বেসরকারি তথ্যের ভিত্তিতে ধারণা করা হচ্ছে, প্রকৃত আক্রান্তের সংখ্যা সরকারি হিসাবের চেয়ে অনেকটাই বেশি।
বিদ্যমান পরিস্থিতিতে জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলছেন, ডেঙ্গুর সম্ভাব্য ভয়াবহ রূপ ঠেকাতে এখন থেকেই কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন। বিশেষ করে এডিস মশার প্রজননস্থল ধ্বংস করা, ডেঙ্গুর জন্য ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা বা হটস্পট চিহ্নিত করা, চিকিৎসা কেন্দ্রগুলোতে পর্যাপ্ত শয্যা ও ওষুধের প্রস্তুতি রাখা এবং মশা তাড়াতে জনসচেতনতা বাড়ানোর উদ্যোগ নিতে হবে। সময়মতো এই কার্যক্রমগুলো জোরদার করা না গেলে সেপ্টেম্বর মাসের শেষভাগে এবং আগামী অক্টোবর মাসে চট্টগ্রামের স্বাস্থ্য ব্যবস্থা বড় ধরনের সংকটের মুখোমুখি হতে পারে।
চট্টগ্রামের সিভিল সার্জন ডা. মোহাম্মদ সাজেদুর রহমান জানান, বছরের এই নির্দিষ্ট সময়ে ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা বৃদ্ধি পাওয়াটাই স্বাভাবিক একটি প্রবণতা, যা অক্টোবরের মাঝামাঝি সময় পর্যন্ত অব্যাহত থাকার সম্ভাবনা রয়েছে। পরিস্থিতি মোকাবিলায় স্বাস্থ্য বিভাগ সচেষ্ট রয়েছে জানিয়ে তিনি উল্লেখ করেন, স্থানীয় পর্যায়ে জনসচেতনতা তৈরির পাশাপাশি ডেঙ্গু পরীক্ষা-নিরীক্ষার উপকরণ ও কিটের পর্যাপ্ত সরবরাহ বৃদ্ধি নিশ্চিত করা হয়েছে।
আক্রান্ত রোগীদের শারীরিক জটিলতা ও ঝুঁকি সম্পর্কে সতর্ক করে সিভিল সার্জন আরও বলেন, ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হওয়ার প্রাথমিক দিনগুলোতে রোগীর শরীরে তীব্র জ্বর থাকে। মূল সংকট দেখা দেয় আক্রান্ত হওয়ার চতুর্থ থেকে সপ্তম দিনের মধ্যে। এই সংকটকালীন সময়ে শরীরে আর জ্বর থাকে না, যার ফলে রোগী বা স্বজনরা ধারণা করে নেন যে তিনি সুস্থ হয়ে উঠছেন। এই ভুল ধারণার কারণে চিকিৎসায় অবহেলা দেখা দেয়, যা পরে প্রাণঘাতী রূপ নেয়। তাই লক্ষণ দেখা দেওয়ার প্রথম দিন থেকেই বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ওষুধ সেবন এবং সর্বোচ্চ সতর্কতা মেনে চলা অপরিহার্য।



