লর্ডসে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে দ্বিতীয় টেস্টে বড় ব্যবধানে হারের পর পাকিস্তান ক্রিকেটে আবারও আলোচনার কেন্দ্রে উঠে এসেছেন বাবর আজম। ৩৮৯ রানের লক্ষ্য তাড়া করতে নেমে পাকিস্তানের ব্যাটিং ভেঙে পড়ে ১৯৪ রানে হারের পর সাবেক ক্রিকেটার বাসিত আলী সরাসরি প্রশ্ন তুলেছেন বাবরের সামর্থ্য ও বড় ম্যাচে তাঁর ভূমিকা নিয়ে।
হাতের চোট কাটিয়ে মাঠে ফিরেছিলেন বাবর। ম্যাচের আগে তাঁকে প্রায় ৯০ শতাংশ ফিট বলা হলেও ব্যাট হাতে সেই প্রত্যাশার প্রতিফলন ঘটেনি। প্রথম ইনিংসে ৮ রানে ফেরার পর দ্বিতীয় ইনিংসেও তাঁর ব্যাট থেমেছে মাত্র ৬ রানে। দলের সবচেয়ে অভিজ্ঞ ব্যাটসম্যানদের একজন হিসেবে তাঁর কাছ থেকে কঠিন পরিস্থিতিতে দায়িত্বশীল ইনিংসের প্রত্যাশা ছিল। কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ সময়ে দ্রুত ফিরে যাওয়ায় পাকিস্তানের চাপ আরও বেড়ে যায়।
লর্ডস টেস্টে পরাজয়ের ফলে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে সিরিজে পাকিস্তান ২-০ ব্যবধানে পিছিয়ে পড়েছে। এর পরই বাবরকে ঘিরে সমালোচনা নতুন মাত্রা পেয়েছে। সাবেক পাকিস্তানি ব্যাটসম্যান বাসিত আলী তাঁর স্বভাবসুলভ সরাসরি ভঙ্গিতে বাবরের বড় খেলোয়াড় হিসেবে পরিচিতি নিয়েই প্রশ্ন তুলেছেন।
একটি ক্রিকেটভিত্তিক অনুষ্ঠানে বাসিত বলেন, বড় খেলোয়াড়ের পরিচয় কেবল জনপ্রিয়তা বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের আলোচনায় থাকার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকতে পারে না। তাঁর মতে, সত্যিকারের কিংবদন্তিরা নিজেদের দলের কঠিন সময়ে পারফর্ম করে সেই মর্যাদা অর্জন করেন।
নিজ দেশের কয়েকজন কিংবদন্তি ব্যাটসম্যানের উদাহরণ টেনে তিনি মজিদ খান, জহির আব্বাস, জাভেদ মিয়াঁদাদ, ইনজামাম-উল-হক, ইউনিস খান ও সাঈদ আনোয়ারের কথা উল্লেখ করেন। তাঁর বক্তব্যের মূল সুর ছিল—দলের প্রয়োজনের মুহূর্তে যাঁরা ম্যাচের গতিপথ বদলে দিতে পারেন, বড় খেলোয়াড় হিসেবে তাঁদের মূল্যায়ন সেখানেই।
বাবরের সাম্প্রতিক টেস্ট পারফরম্যান্সও বাসিতের সমালোচনার বড় কারণ। ২০২২ সালের ডিসেম্বরে করাচিতে নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে ১৬১ রানের ইনিংস খেলার পর টেস্ট ক্রিকেটে আর শতকের দেখা পাননি বাবর। দীর্ঘ সময় ধরে তিন অঙ্কের রান না পাওয়ায় তাঁর ব্যাটিং নিয়ে প্রশ্ন ক্রমেই জোরালো হয়েছে। সর্বশেষ ১৬ টেস্টে তাঁর ব্যাটিং গড় ৩০.৫৩-এ নেমে এসেছে। এর প্রভাব পড়েছে ক্যারিয়ার গড়েও, যা এখন প্রায় ৪৩।
বাসিত বিশেষভাবে হতাশা প্রকাশ করেছেন বাবরের আউট হওয়ার ধরন নিয়ে। তাঁর মতে, যখন দলের পুরো ব্যাটিং লাইনআপ একজন অভিজ্ঞ ব্যাটসম্যানের দিকে তাকিয়ে থাকে, তখন দায়িত্বজ্ঞানহীন শট খেলে উইকেট হারানো আরও হতাশাজনক।
তবে বাসিতের সমালোচনা শুধু বাবরেই থেমে থাকেনি। লর্ডসের দ্বিতীয় ইনিংসে পাকিস্তানের হয়ে সবচেয়ে বেশি প্রতিরোধ গড়েছিলেন সৌদ শাকিল। তিনি ৯৭ রান করে দলের ইনিংসকে কিছুটা টেনে নেওয়ার চেষ্টা করেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত জশ টাংয়ের শর্ট বল সামলাতে গিয়ে সীমানার কাছে ক্যাচ দিয়ে ফেরেন। শাকিলের আউট হওয়ার ধরনও বাসিতের পছন্দ হয়নি। তাঁর মতে, মাঠে ফিল্ডারদের অবস্থান বিবেচনা না করে এমন শট খেলা টেস্ট ক্রিকেটে গ্রহণযোগ্য নয়।
উইকেটরক্ষক-ব্যাটসম্যান মোহাম্মদ রিজওয়ানের ব্যাটিং নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন বাসিত। দ্বিতীয় ইনিংসে মাত্র ১ রান করে ফেরেন রিজওয়ান। তাঁর শট নির্বাচনের সমালোচনা করে বাসিত বলেন, টেস্ট ম্যাচের পরিস্থিতি বুঝে ব্যাটিং করার ক্ষেত্রে আরও সতর্ক হওয়া প্রয়োজন ছিল।
লর্ডসে পাকিস্তানের ব্যাটিং ব্যর্থতা তাই কেবল একটি ম্যাচের ফল হিসেবে দেখা হচ্ছে না। দলের শীর্ষ ব্যাটসম্যানদের সাম্প্রতিক ফর্ম, চাপের সময়ে দায়িত্ব নেওয়ার সক্ষমতা এবং টেস্ট ক্রিকেটে দীর্ঘ ইনিংস খেলার ঘাটতি—সবকিছু নিয়েই নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।
বিশেষ করে বাবরের মতো দলের অন্যতম প্রধান ব্যাটসম্যানের ক্ষেত্রে প্রত্যাশার চাপ স্বাভাবিকভাবেই বেশি। আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে তাঁর অসাধারণ সাফল্য, দীর্ঘ সময়ের ধারাবাহিকতা এবং পাকিস্তানের ব্যাটিংয়ের অন্যতম মুখ হয়ে ওঠার কারণে গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচে তাঁর ব্যাটিং দলের ফলাফলে বড় প্রভাব ফেলে। সেই জায়গা থেকেই তাঁর সাম্প্রতিক টেস্ট ফর্ম নিয়ে সমালোচনা আরও তীব্র হয়েছে।
ইংল্যান্ডের বিপক্ষে সিরিজের এখনো একটি ম্যাচ বাকি। তৃতীয় ও শেষ টেস্ট ৯ সেপ্টেম্বর এজবাস্টনে শুরু হওয়ার কথা। সিরিজ ইতিমধ্যে হাতছাড়া হলেও শেষ ম্যাচটি পাকিস্তানের জন্য নিজেদের সামর্থ্য প্রমাণের সুযোগ। বিশেষ করে বাবর আজম ও দলের অন্যান্য অভিজ্ঞ ব্যাটসম্যানরা সেখানে কীভাবে ঘুরে দাঁড়ান, সেটিই এখন পাকিস্তান ক্রিকেটের অন্যতম বড় আলোচনার বিষয়।



