প্রতিদিন ক্ষতির পরিমাণ ২ হাজার ৩৮৭ কোটি টাকা

দেশের শিল্প ও ব্যবসা খাতে জ্বালানি সংকট ক্রমেই বড় অর্থনৈতিক ঝুঁকিতে পরিণত হচ্ছে। গ্যাস ও বিদ্যুতের অনিয়মিত সরবরাহের কারণে শুধু বড় শিল্প নয়, ওষুধ, বস্ত্র, সিরামিক, চিনি পরিশোধন, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পসহ বিভিন্ন উৎপাদন ও সেবা খাতও ক্ষতির মুখে পড়েছে। সংশ্লিষ্টদের হিসাবে, দেশের শিল্পকারখানাগুলোতে জ্বালানি সংকটের কারণে প্রতিদিন প্রায় ২ হাজার ৩৮৭ কোটি টাকার উৎপাদন ক্ষতি হচ্ছে।

রাজধানীর গুলশানে রোববার অনুষ্ঠিত ‘বাংলাদেশের বিদ্যুৎ ও জ্বালানি চ্যালেঞ্জ : ব্যবসার পরিবেশের জন্য নির্ভরযোগ্য অবকাঠামো নিশ্চিতকরণ’ শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠকে উপস্থাপিত মূল প্রবন্ধে এসব তথ্য উঠে আসে। পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশ ও মেট্রোপলিটন চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি যৌথভাবে অস্ট্রেলিয়া সরকারের পররাষ্ট্র ও বাণিজ্যবিষয়ক দপ্তরের সহযোগিতায় এ বৈঠকের আয়োজন করে।

বৈঠকে জানানো হয়, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে দেশের উৎপাদন খাতের প্রবৃদ্ধি কমে ২ দশমিক ৮৬ শতাংশে নেমেছে। আগের অর্থবছরে এ প্রবৃদ্ধি ছিল ৩ দশমিক ৭১ শতাংশ। শিল্প উৎপাদনে জ্বালানি সরবরাহের অনিশ্চয়তা এই মন্থরতার অন্যতম বড় কারণ হিসেবে আলোচনায় উঠে আসে।

শিল্পাঞ্চলে তীব্র সংকট

জ্বালানি সংকটের প্রভাব সবচেয়ে বেশি দেখা যাচ্ছে দেশের প্রধান শিল্পাঞ্চলগুলোতে। নরসিংদীতে ৩০০টির বেশি কারখানা বন্ধ থাকার তথ্য তুলে ধরা হয়েছে। জেলাটিতে প্রায় ৩ হাজার বস্ত্র ও রং করার কারখানা রয়েছে, যেগুলো দেশের স্থানীয় কাপড়ের চাহিদার প্রায় ৭০ শতাংশ পূরণ করে। গ্যাসের ঘাটতির কারণে কিছু কারখানা বয়লার চালাতে কাঠের মতো বিকল্প জ্বালানি ব্যবহার করছে, এতে উৎপাদন ব্যয়ও বাড়ছে।

গাজীপুরেও পরিস্থিতি উদ্বেগজনক। সেখানে শিল্পকারখানার দৈনিক গ্যাসের চাহিদা ৫৯০ থেকে ৬০০ মিলিয়ন ঘনফুটের মধ্যে হলেও সরবরাহ হচ্ছে মাত্র ২৫০ থেকে ২৭০ মিলিয়ন ঘনফুট। অর্থাৎ চাহিদার প্রায় ৪৫ শতাংশ গ্যাস পাওয়া যাচ্ছে। এর প্রভাবে জেলার ১৮ থেকে ২২ শতাংশ কারখানা বন্ধ হয়ে যাওয়ার তথ্য দেওয়া হয়েছে।

নারায়ণগঞ্জে প্রায় ১ হাজার ৮৫০টি কারখানার মধ্যে প্রায় ৯০০টি বর্তমানে উৎপাদনের বাইরে রয়েছে। অর্থাৎ মোট কারখানার প্রায় ৪৯ শতাংশই বন্ধ। ময়মনসিংহে ২৯৩টি শিল্প ইউনিটের মধ্যে ৯৯টি গ্যাসনির্ভর। সেখানে গ্যাসের ঘাটতির কারণে গড়ে উৎপাদন কমেছে প্রায় ৫০ শতাংশ।

হবিগঞ্জে গ্যাস সরবরাহ পুরোপুরি বন্ধ থাকার কারণে ১৭১টি কারখানা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সেখানে প্রতিদিনের উৎপাদন ক্ষতির পরিমাণ ১ হাজার কোটি টাকার বেশি বলে বৈঠকে জানানো হয়। চট্টগ্রামেও শিল্পের উৎপাদন সক্ষমতা প্রায় ২৫ শতাংশ কমেছে। জাতীয় পর্যায়ে বস্ত্র ও রং করার শিল্পের উৎপাদন ৩০ থেকে ৫০ শতাংশ পর্যন্ত কমে যাওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে।

বাড়ছে আমদানিনির্ভরতা

মূল প্রবন্ধে বলা হয়, গত চার বছরে বাংলাদেশের জ্বালানি আমদানিনির্ভরতা ৪৭ দশমিক ৭ শতাংশ থেকে বেড়ে ৬২ দশমিক ৫ শতাংশ হয়েছে। এর ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দাম বৃদ্ধি কিংবা সরবরাহব্যবস্থায় অস্থিরতা তৈরি হলে তার সরাসরি প্রভাব পড়ছে দেশের শিল্প ও সামগ্রিক অর্থনীতিতে।

জ্বালানি আমদানির ওপর নির্ভরতা বাড়ার পাশাপাশি দেশীয় সরবরাহের অনিশ্চয়তা শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোর দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনাকেও কঠিন করে তুলছে। কারখানাগুলো কখন পর্যাপ্ত গ্যাস বা বিদ্যুৎ পাবে, তা নিশ্চিতভাবে জানা না থাকায় উৎপাদনসূচি নির্ধারণ, কাঁচামাল ব্যবস্থাপনা এবং রপ্তানি আদেশ পূরণে বাড়তি চাপ তৈরি হচ্ছে।

৩৫ হাজার কোটি টাকার বিনিয়োগ আটকে

নতুন গ্যাস সংযোগের জন্য ১ হাজার ৮৫৭টি আবেদন ঝুলে রয়েছে। এসব সংযোগের সঙ্গে প্রায় ৩৫ হাজার কোটি টাকার শিল্প বিনিয়োগ জড়িত। অর্থাৎ গ্যাস সংযোগের অনিশ্চয়তা শুধু বিদ্যমান শিল্পের উৎপাদন ব্যাহত করছে না, নতুন বিনিয়োগের সিদ্ধান্তকেও প্রভাবিত করছে।

ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পেও সংকটের প্রভাব স্পষ্ট। এসব প্রতিষ্ঠানে উৎপাদন ২৫ থেকে ৩০ শতাংশ পর্যন্ত কমেছে বলে বৈঠকে জানানো হয়। বড় শিল্পের তুলনায় ছোট ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের বিকল্প জ্বালানি ব্যবহারের সক্ষমতা কম হওয়ায় তাদের ওপর সংকটের আর্থিক চাপ আরও বেশি পড়তে পারে।

ব্যবসায়ীদের দাবি দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা

বৈঠকে ব্যবসায়ী নেতারা বলেন, অনির্ভরযোগ্য গ্যাস ও বিদ্যুৎ সরবরাহ দেশের শিল্পের প্রতিযোগিতা সক্ষমতাকে সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত করছে। গ্যাসের চাপ কমে গেলে উৎপাদন বন্ধ রাখতে হচ্ছে। আবার উৎপাদন চালু রাখতে বিকল্প জ্বালানি ব্যবহার করলে ব্যয় বেড়ে যাচ্ছে। বিশেষ করে রপ্তানিমুখী শিল্পে এ বাড়তি ব্যয় আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতার সক্ষমতাকে দুর্বল করছে।

বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি শওকত আজিজ রাসেল বলেন, বর্তমান সংকট দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা এবং জ্বালানি সংগ্রহের দুর্বলতার প্রতিফলন। শিল্প ও রপ্তানিমুখী খাতকে সুরক্ষা দিতে একটি পৃথক শিল্প জ্বালানি নীতি প্রণয়ন এবং দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান তিনি।

লাফার্জহোলসিমের পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ ইকবাল চৌধুরী বিদ্যমান শিল্প বিনিয়োগ সুরক্ষায় দীর্ঘমেয়াদি ও পূর্বানুমানযোগ্য জ্বালানি পরিকল্পনার ওপর গুরুত্ব দেন। তাঁর মতে, প্রতিযোগিতা সক্ষমতা ও টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করতে আগামী ১০ থেকে ২০ বছরের জন্য একটি সুস্পষ্ট জ্বালানি কৌশল প্রয়োজন।

বাংলাদেশ সিরামিক ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মঈনুল ইসলাম বলেন, সিরামিক শিল্পে গ্যাস কেবল জ্বালানি হিসেবে ব্যবহৃত হয় না; উৎপাদন প্রক্রিয়ারও গুরুত্বপূর্ণ অংশ। দীর্ঘদিন সরবরাহের অনিশ্চয়তা থাকলে উৎপাদনের পাশাপাশি কর্মসংস্থান ও নতুন বিনিয়োগও ঝুঁকিতে পড়বে।

ইএসটেক্স ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. ইজাজ হোসেনের মতে, জ্বালানি সংকটকে এখন শুধু সরবরাহ ঘাটতি হিসেবে দেখলে হবে না। মূল্য নির্ধারণ, বরাদ্দব্যবস্থা, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, জ্বালানি ব্যবহারের দক্ষতা এবং দেশের প্রয়োজন অনুযায়ী জ্বালানি ব্যবস্থাপনার মধ্যে সমন্বয় জরুরি।

আগাম সূচি প্রকাশের দাবি

শিল্পোদ্যোক্তারা রপ্তানিমুখী কারখানা ও বড় শিল্পাঞ্চলে জ্বালানি সরবরাহে অগ্রাধিকার দেওয়ার দাবি জানিয়েছেন। একই সঙ্গে বিদ্যুৎ সরবরাহে ঘাটতি থাকলে আগাম ও নির্ভরযোগ্য লোডশেডিং সূচি প্রকাশের কথাও বলা হয়েছে। এতে কারখানাগুলো উৎপাদন পরিকল্পনা, শ্রমিকের কর্মঘণ্টা এবং যন্ত্রপাতি পরিচালনার সময় আগেভাগে নির্ধারণ করতে পারবে।

বৈঠকে জ্বালানি নিরাপত্তা শক্তিশালী করা, গ্যাস ও বিদ্যুৎ সরবরাহ আরও নির্ভরযোগ্য করা, জ্বালানির মূল্য নির্ধারণে পূর্বানুমানযোগ্যতা আনা, দেশীয় জ্বালানি অনুসন্ধান বাড়ানো এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার দ্রুত সম্প্রসারণের সুপারিশ করা হয়। পাশাপাশি সরকারি ও বেসরকারি খাতের মধ্যে সমন্বয় বাড়ানোর ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

শিল্প খাতে জ্বালানি সরবরাহের এই অনিশ্চয়তা দীর্ঘায়িত হলে উৎপাদন, বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান ও রপ্তানি—চার ক্ষেত্রেই চাপ আরও বাড়তে পারে। তাই তাৎক্ষণিক সংকট মোকাবিলার পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি পরিকল্পনা বাস্তবায়নকে শিল্প খাতের স্থিতিশীলতার জন্য গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

Tags :

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সর্বশেষ খবর

খবরওয়ালা একটি বিশ্বস্ত অনলাইন নিউজ পোর্টাল, যেখানে বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও আপডেট প্রকাশ করা হয়। রাজনীতি, জাতীয় ও স্থানীয় সংবাদ, শিক্ষা, খেলাধুলা, ব্যবসা, বিনোদন ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনের গুরুত্বপূর্ণ খবর নিয়ে পাঠকদের জন্য রয়েছে নির্ভরযোগ্য ও সময়োপযোগী সংবাদ পরিবেশন।

© ২০২৬ খবরওয়ালা। সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।