সাত মাসে প্রায় ১৬ হাজার শিশু নিখোঁজ: উদ্বেগজনক পরিসংখ্যান ও নিরাপত্তার বড় প্রশ্ন

মাত্র সাত মাস, আর এই সাত মাসের মধ্যে দেশজুড়ে প্রায় ১৬ হাজার শিশু নিখোঁজের ঘটনা ঘটেছে। প্রতিদিন গড়ে ৭৫টির বেশি শিশু গায়েব হয়ে যাওয়ার মতো ভয়ঙ্কর তথ্য পুলিশের সরকারি খাতায় নথিভুক্ত হয়েছে। এই বিশাল এবং আশঙ্কাজনক নিখোঁজের তথ্য শুধু একটি পরিসংখ্যান নয়—এটি হাজারো পরিবারের চরম উৎকণ্ঠা, আতঙ্ক এবং কান্না। রাজধানী ঢাকা থেকে শুরু করে দেশের প্রান্তিক জনপদ পর্যন্ত এই নিখোঁজের আতঙ্ক এখন চেপে বসেছে।

পরিসংখ্যানের ভয়াবহ চিত্র
পুলিশ সদর দপ্তরের দেওয়া তথ্য বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত মাত্র সাত মাসে সারা দেশে মোট ১৫,৯১৭ জন শিশু নিখোঁজের ঘটনায় পরিবারগুলো বিভিন্ন থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেছে। এর মধ্যে মাসভিত্তিক নিখোঁজের চিত্রে দেখা গেছে চরম ওঠানামা:
  • জানুয়ারি: ১,৭৬৮ জন
  • ফেব্রুয়ারি: ১,৩৯২ জন
  • মার্চ: ১,৭০৮ জন
  • এপ্রিল: ২,৬৬০ জন
  • মে: ২৫৬ জন
  • জুন: ৩,১৬৩ জন (শীর্ষ নিখোঁজের মাস)
  • জুলাই: ৩১১ জন
পরিসংখ্যান অনুযায়ী জুনে সবচেয়ে বেশি শিশু নিখোঁজ হয়েছে, যেখানে প্রতিদিন গড়ে ১০০ জনের বেশি শিশু নিখোঁজ হওয়ার চিত্র উঠে এসেছে।
বাস্তবতার শিকার শিশুদের গল্প
প্রতিটি ডায়েরির পেছনে লুকিয়ে আছে স্বজন হারানোর দীর্ঘশ্বাস। উদাহরণস্বরূপ, মাদ্রাসায় যাওয়ার কথা বলে বাড়ি থেকে বেরিয়ে আর ফেরেনি ১০ বছরের মোহাম্মদ তানভীর আহমেদ। দশ দিন ধরে চারদিকে হন্যে হয়ে খুঁজে না পেয়ে রূপনগর থানায় সাধারণ ডায়েরি করেন তার বাবা আবদুর রহিম। অন্যদিকে, গত ৯ মে মিরপুরের দারুস সালাম থেকে বিকেলে খেলতে গিয়ে নিখোঁজ হয় ৯ বছরের শিশু আলি হোসেন। সম্ভাব্য সব জায়গায় খুঁজেও ছেলের হদিশ না পেয়ে পরদিন দারুস সালাম থানায় ডায়েরি করতে বাধ্য হন তার বাবা। কেউ খেলতে গিয়ে পরিবারের চোখের আড়ালে হারিয়েছে, কেউ বাস বা গণপরিবহনে ভুল জায়গায় নেমে আর ফিরতে পারেনি, আবার কাউকে ফুসলিয়ে ও প্রলোভন দেখিয়ে নিয়ে যাওয়ার অভিযোগ উঠেছে।
ঢাকার বাইরে প্রান্তিক জনপদ ও সীমান্ত ঝুঁকি
শিশু নিখোঁজের এই আতঙ্ক এখন কেবল রাজধানী ঢাকার গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ নেই। চট্টগ্রাম, পাবনা, সাতক্ষীরা এবং ঝিনাইদহের মতো জেলাগুলো থেকেও আশঙ্কাজনক তথ্য পাওয়া যাচ্ছে। বিশেষ করে সাতক্ষীরা ও ঝিনাইদহের মতো সীমান্ত এলাকাগুলোতে মানব পাচারকারী চক্রের ব্যাপক সক্রিয়তা নিয়ে স্থানীয় বাসিন্দারা চরম উদ্বিগ্ন। সীমান্ত পেরিয়ে শিশুদের পাচার করে দেওয়ার বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।
কেন নিখোঁজ হচ্ছে এত শিশু?
অপরাধ বিশেষজ্ঞ ও মানবাধিকার কর্মীদের মতে, শিশুদের নিখোঁজের পেছনে বেশ কিছু সুসংগঠিত অপরাধ চক্র ও সামাজিকভাবে গড়ে ওঠা সংকট সক্রিয় রয়েছে:
  • মানব পাচার ও অঙ্গহানি: পাচারকারী চক্র শিশুদের ফুসলিয়ে কিংবা অপহরণ করে সীমান্ত পার করে দেয়। অনেক সময় অঙ্গহানি করে তাদের জোরপূর্বক ভিক্ষাবৃত্তিতে নিয়োজিত করা হয়।
  • মুক্তিপণ ও প্রতিশোধ: পূর্বশত্রুতা, পারিবারিক দ্বন্দ্ব, বা প্রতিপক্ষকে ফাঁসাতে শিশুদের জিম্মি করা হয়। এছাড়া বড় অঙ্কের মুক্তিপণ আদায়ের জন্যও অপহরণের ঘটনা ঘটে।
  • নবজাতক চুরি: সন্তানহীন দম্পতিদের কাছে চড়া দামে বিক্রির উদ্দেশ্যে হাসপাতাল বা ঘর থেকে ছোট শিশু ও নবজাতক চুরি করে সংঘবদ্ধ চক্র।
  • বিকৃত যৌন লালসা ও মাদকের বিস্তার: ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাধ বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক তৌহিদুল হকের মতে, সমাজে মাদকের বিস্তারের সঙ্গে অপরাধ বৃদ্ধির সরাসরি যোগাযোগ রয়েছে। বিকৃত যৌন লালসার শিকার হওয়া এবং বিচারে দীর্ঘসূত্রতার কারণে অপরাধীরা পার পেয়ে যাওয়ার সাহস পাচ্ছে।

 

উদ্ধার অভিযানে সময় ও প্রযুক্তির গুরুত্ব
মানবাধিকার কর্মীদের মতে, শিশু নিখোঁজের খবর পাওয়ার পর প্রথম কয়েক ঘণ্টাই অনুসন্ধানের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সময় (Golden Hours)। এই সময়ে দ্রুত শিশুর ছবি ও প্রয়োজনীয় তথ্য ছড়িয়ে দেওয়া গেলে তাকে সুস্থ অবস্থায় খুঁজে পাওয়ার সম্ভাবনা বহুলাংশে বেড়ে যায়। অতীতে মুসকান ও সাইফ নিখোঁজের ঘটনার পর ‘মুন অ্যালার্ট’ এবং মহাসড়ক বা শহরের বিলবোর্ডে দ্রুত তথ্য প্রচারের ফলেই তাদের উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছিল।
কিন্তু বাস্তবে অভিযোগ রয়েছে, জিডি করার পর পুলিশের গয়ংগচ্ছ মনোভাব ও উদ্ধার অভিযানে বিলম্বের কারণে অনেক শিশুই আর ফিরে আসে না। এক থানার সঙ্গে আরেক থানার দ্রুত যোগাযোগ না থাকা এবং প্রযুক্তির যথাযথ ব্যবহারের অভাবে প্রথম কয়েক ঘণ্টার মূল্যবান সময় নষ্ট হয়ে যায়।
পুলিশ প্রশাসনের বক্তব্য
শিশু নিখোঁজ ও জিডির বিষয় নিয়ে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের উপ-কমিশনার আকতার হোসেন জানান, প্রতিটি জিডিই গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করা হয়। তবে তিনি একটি ব্যবহারিক জটিলতার কথা উল্লেখ করে বলেন, অনেক শিশু সাময়িকভাবে হারিয়ে গেলেও পরে নিজেরাই ফিরে আসে বা স্বজনেরা তাদের খুঁজে পান। কিন্তু পরিবারগুলো পরবর্তীতে থানায় এসে সেই তথ্য হালনাগাদ করে না। ফলে সরকারি খাতায় নিখোঁজের জিডিটি রয়ে যায়, যার কারণে প্রকৃত উদ্ধার বা ফেরার সঠিক পরিসংখ্যান পুলিশের কাছে পুরোপুরি থাকে না।
রাষ্ট্র ও সমাজের করণীয়
শুধু থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) নথিভুক্ত করেই দায়িত্ব শেষ করার সুযোগ নেই। একটি শিশু নিখোঁজ হওয়ার পর তার পরিবার শুধু অপেক্ষাই করে না, প্রতিটি মুহূর্ত চরম আতঙ্কে কাটায়।
১. রাষ্ট্রীয় দ্রুত সাড়া প্রদান: নিখোঁজের খবর পাওয়া মাত্রই এক থানার সাথে অন্য থানার তথ্য আদান-প্রদান এবং ট্রাফিক ও সীমান্ত এলাকাগুলোতে তাৎক্ষণিক অ্যালার্ট জারি করতে হবে।
২. প্রযুক্তির ব্যবহার: নিখোঁজের পরপরই জাতীয় ডেটাবেজ, সোশ্যাল মিডিয়া এবং ডিজিটাল বিলবোর্ডের মাধ্যমে দ্রুত শিশুর তথ্য ও ছবি ছড়িয়ে দেওয়া প্রয়োজন।
৩. নজরদারি ও বিচার: শিশু পাচারকারী ও অপহরণকারী চক্রগুলোর বিরুদ্ধে দ্রুত বিচার ও কঠোর শাস্তির ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে।
৪. পারিবারিক সচেতনতা: সন্তানকে জনবহুল বা অপরিচিত স্থানে একা না ছাড়া, গণপরিবহন ব্যবহারের সময় খেয়াল রাখা এবং অপরিচিত কারো প্রলোভনে না পড়ার বিষয়ে সন্তানদের সতর্ক করতে হবে।
শিশু সুরক্ষায় প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা ও ঘটনার সাথে সাথেই রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার সমন্বিত পদক্ষেপই পারে এই আতঙ্কজনক পরিস্থিতি থেকে শিশুদের রক্ষা করতে।
Tags :

সামিউর রহমান রাতুল | উপ-সম্পাদক | খবরওয়ালা বাংলা

https://bn.khaborwala.com/

সর্বশেষ খবর

খবরওয়ালা একটি বিশ্বস্ত অনলাইন নিউজ পোর্টাল, যেখানে বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও আপডেট প্রকাশ করা হয়। রাজনীতি, জাতীয় ও স্থানীয় সংবাদ, শিক্ষা, খেলাধুলা, ব্যবসা, বিনোদন ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনের গুরুত্বপূর্ণ খবর নিয়ে পাঠকদের জন্য রয়েছে নির্ভরযোগ্য ও সময়োপযোগী সংবাদ পরিবেশন।

© ২০২৬ খবরওয়ালা। সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।