মা–বাবার একমাত্র ছেলে। পেশায় কাস্টমস কর্মকর্তা। ছেলেকে ঘিরে ছিল পরিবারের নানা স্বপ্ন। বিয়ের জন্য পাত্রীও দেখা শুরু হয়েছিল। সোমবারই পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে পাত্রী দেখতে যাওয়ার কথা ছিল আবদুল আলিমের (৩৫)। কিন্তু সেই অপেক্ষার দিন আর তাঁর জীবনে আসেনি। এর আগের রাতেই সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারান তিনি। কর্মস্থল থেকে ছুটি নিয়ে বিয়ের প্রস্তুতির অংশ হিসেবে বাড়ি ফেরার পথেই থেমে যায় তাঁর জীবন।
আবদুল আলিম সিলেট কাস্টমসে সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তা হিসেবে কর্মরত ছিলেন। তাঁর পৈতৃক বাড়ি চট্টগ্রামের মিরসরাই উপজেলার করেরহাট এলাকায়। তবে তাঁর বাবা-মা বর্তমানে মিরসরাইয়ের বারাইয়ারহাট পৌরসভায় নিজেদের বাড়িতে বসবাস করতেন।
রোববার রাত আনুমানিক আটটার দিকে ফেনীর লালপোল এলাকায় একটি যাত্রীবাহী বাস দুর্ঘটনার শিকার হয়। প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য অনুযায়ী, দ্রুতগতিতে চলা বাসটির সামনে একটি ট্রাক ছিল। হঠাৎ ট্রাকটি ব্রেক করলে বাসের চালক নিয়ন্ত্রণ হারান। একপর্যায়ে বাসটি সড়কের বিভাজকের ওপর উঠে উল্টে যায়। এতে ঘটনাস্থলেই আবদুল আলিমের মৃত্যু হয়। বাসটির আরও অন্তত ১০ যাত্রী আহত হন।
পরিবারের সদস্যরা জানান, বিয়ের পাত্রী দেখার উদ্দেশ্যে কর্মস্থল থেকে ছুটি নিয়ে ওই বাসে বাড়ি ফিরছিলেন আলিম। সোমবার তাঁকে নিয়ে পাত্রী দেখতে যাওয়ার প্রস্তুতিও ছিল পরিবারের। স্বজনদের কাছে তাই তাঁর এই আকস্মিক মৃত্যু আরও মর্মান্তিক হয়ে উঠেছে।
দুর্ঘটনার পর আলিমের মরদেহ উদ্ধার করে ফেনীর মহিপাল হাইওয়ে থানায় নেওয়া হয়। পরিচয় শনাক্ত করার পর পুলিশ তাঁর পরিবারের সদস্যদের খবর দেয়। সংবাদ পেয়ে বাবা মো. আবদুল কাদের স্বজনদের সঙ্গে থানায় ছুটে যান।
থানায় পৌঁছানোর পর ছেলের মৃত্যুর খবর যেন তাঁকে বাক্রুদ্ধ করে দেয়। পুলিশ কর্মকর্তাদের সামনে তিনি কোনো কথাই বলতে পারছিলেন না। চোখ দিয়ে অনবরত পানি পড়ছিল। তাঁর সঙ্গে থাকা আলিমের খালাতো ভাই হারুনুর রশিদ ও আরিফুল ইসলাম পুলিশের সঙ্গে প্রয়োজনীয় কথা বলে মরদেহ বাড়িতে নেওয়ার ব্যবস্থা করেন। রাত প্রায় তিনটার দিকে তাঁরা মরদেহ নিয়ে বাড়ির উদ্দেশে রওনা হন।
আলিমের খালাতো ভাই আরিফুল ইসলাম জানান, আলিমের কোনো ভাই ছিল না। তাঁর একমাত্র বোনের বিয়ে হয়েছে সাত-আট বছর আগে। তাঁদের বাবা বন বিভাগে চাকরি করতেন এবং চাকরির সুবাদে পরিবারটি একসময় চট্টগ্রাম নগরে থাকত। অবসর নেওয়ার পর তিনি বারাইয়ারহাট পৌরসভায় বাড়ি নির্মাণ করেন। সেখানেই স্ত্রীকে নিয়ে বসবাস করছিলেন।
আরিফুল ইসলাম বলেন, পরিবারের পক্ষ থেকে আলিমের বিয়ের জন্য পাত্রী খোঁজা হচ্ছিল। সোমবার পাত্রী দেখতে যাওয়ার কথা থাকায় তিনি ছুটি নিয়ে বাড়ি ফিরছিলেন। কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে সেই আনন্দের প্রস্তুতি শোকের আবহে পরিণত হয়।
আরেক খালাতো ভাই হারুনুর রশিদ জানান, একমাত্র ছেলেকে ঘিরে আবদুল কাদেরের অনেক আশা ছিল। ধুমধাম করে ছেলের বিয়ে দেবেন—এমন পরিকল্পনাই ছিল তাঁর। কিন্তু হঠাৎ ছেলের মৃত্যুতে তিনি মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছেন। আলিমের মাও বারবার জ্ঞান হারাচ্ছিলেন।
স্বজনদের ভাষ্য অনুযায়ী, সোমবার দুপুরে ফেনীর ছাগলনাইয়া উপজেলার শুভপুরে আলিমের নানার বাড়িতে তাঁর জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। পরে সেখানেই তাঁকে দাফন করা হয়।
মহিপাল হাইওয়ে থানার উপপরিদর্শক কবির হোসেন জানান, পরিবারের পক্ষ থেকে ময়নাতদন্ত ছাড়াই মরদেহ দাফনের অনুমতি চাওয়া হয়েছিল। তাঁদের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে মরদেহ স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হয়।
পুলিশ জানিয়েছে, দুর্ঘটনার পর বাসটি হেফাজতে নেওয়া হয়েছে। তবে দুর্ঘটনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ট্রাকটি ঘটনাস্থলে পাওয়া যায়নি। ট্রাকটি শনাক্ত করার চেষ্টা চলছে। সেটি শনাক্ত করা গেলে দুর্ঘটনার কারণ ও দায় নির্ধারণে প্রয়োজনীয় আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
একটি সম্ভাবনাময় কর্মজীবন, সামনে বিয়ের নতুন স্বপ্ন এবং পরিবারকে ঘিরে নানা পরিকল্পনা—সবকিছুই এক রাতের সড়ক দুর্ঘটনায় শেষ হয়ে গেল। আলিমের পরিবারের কাছে সোমবারটি হওয়ার কথা ছিল নতুন সম্পর্কের সূচনার দিন; তার বদলে দিনটি হয়ে থাকল একমাত্র ছেলেকে হারানোর শোকের দিন।



