চ্যাম্পিয়ন্স লিগের নতুন মৌসুমের প্রথম ম্যাচেই কঠিন পরীক্ষায় পড়ে জয় তুলে নিয়েছে রিয়াল মাদ্রিদ। সান্তিয়াগো বার্নাব্যুতে ইন্টার মিলানকে ২-১ গোলে হারিয়ে ইউরোপের শীর্ষ ক্লাব প্রতিযোগিতায় শুভসূচনা করেছে স্প্যানিশ জায়ান্টরা। জয়ের রাতে গোল করেছেন কিলিয়ান এমবাপ্পে ও ফেদেরিকো ভালভার্দে। ইন্টারের হয়ে ব্যবধান কমান কার্লোস অগাস্টো।
তবে ফলাফল দেখে রিয়ালের জয় যতটা সহজ মনে হচ্ছে, ম্যাচের চিত্র ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। বিশেষ করে প্রথম ২০ মিনিটে ইন্টারই বরং বেশি সক্রিয় ছিল। ম্যাচের মাত্র তৃতীয় মিনিটে মার্কোস থুরামের হাফ ভলি দারুণ দক্ষতায় ঠেকিয়ে দেন রিয়ালের গোলরক্ষক থিবো কুর্তোয়া। কিছুক্ষণ পর হাকান চালহানোলুর ফ্রি-কিকও আটকে দেন তিনি। শুরুতেই ইন্টারের আক্রমণের ধার স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
কিন্তু ১৪ মিনিটে ম্যাচের গতিপথ বদলে দেয় একটি ভুল। ইন্টারের কার্টিস জোন্সের দুর্বল পাসের কারণে ইয়ান বিসেক চাপে পড়ে যান। ব্রাহিম দিয়াজ সেই সুযোগে বল দখলে নিয়ে এমবাপ্পের দিকে বাড়িয়ে দেন। বক্সের ভেতর বল পেয়েই নিখুঁত শটে জাল কাঁপান ফ্রান্সের অধিনায়ক। রিয়াল এগিয়ে যায় ১-০ গোলে।
এই গোলের মাধ্যমে ইউরোপের ক্লাব প্রতিযোগিতায় এমবাপ্পের গোলসংখ্যা দাঁড়ায় ৭১। একই সংখ্যক গোল নিয়ে তাঁর পাশে উঠে আসেন রিয়াল মাদ্রিদের কিংবদন্তি রাউল গঞ্জালেস। ২৭ বছর বয়সেই এই মাইলফলকে পৌঁছে এমবাপ্পে নিজের ধারাবাহিকতার আরেকটি প্রমাণ দিলেন।
প্রথম গোলের নয় মিনিট পর রিয়াল পেয়ে যায় দ্বিতীয় গোলও। এবারও ইন্টারের ভুলের সুযোগ নেয় স্বাগতিকরা। বেনজামিন পাভারের ব্যাকপাসের পর গোলরক্ষক জোসেপ মার্তিনেজ বল নিয়ে অতিরিক্ত সময় নিলে ভালভার্দে দ্রুত চাপ তৈরি করেন। বল কেড়ে নিয়ে তিনি সেটি ইন্টারের জালে পাঠিয়ে দেন। ২-০ ব্যবধানে এগিয়ে যায় রিয়াল।
মজার বিষয়, দুই গোল করার পরও প্রথমার্ধের ওই পর্যায় পর্যন্ত রিয়ালের লক্ষ্যে শট ছিল মাত্র একটি। অন্যদিকে ইন্টার একাধিকবার আক্রমণ গড়ে তুলেছিল। কার্টিস জোন্সের একটি শট ক্রসবারে লেগে ফিরে আসে। বিরতির আগে এমবাপ্পে, জুড বেলিংহাম ও ব্রাহিম দিয়াজের সমন্বয়ে রিয়াল তৃতীয় গোলের সুযোগ তৈরি করলেও তা কাজে লাগানো সম্ভব হয়নি।
দ্বিতীয়ার্ধে ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ আরও জোরালোভাবে নেওয়ার চেষ্টা করে ইন্টার। একের পর এক আক্রমণে রিয়ালের রক্ষণকে চাপে রাখে ইতালিয়ান দলটি। জোন্সের আরেকটি প্রচেষ্টা কুর্তোয়া ঠেকিয়ে দেন। থুরামও সুযোগ পেয়েছিলেন, কিন্তু শেষ মুহূর্তে তা কাজে লাগাতে পারেননি। লাউতারো মার্তিনেজের সামনেও গোলের সুযোগ আসে।
ইন্টারের গোলরক্ষক জোসেপ মার্তিনেজও প্রথমার্ধের ভুলের পর নিজেকে সামলে নেন। ৫৮ মিনিটে বেলিংহামের হেড ঠেকান তিনি। আট মিনিট পর এমবাপ্পের শক্তিশালী শট পা দিয়ে রুখে দেন। পরে ব্রাহিম দিয়াজের বাঁকানো শটও তাঁকে পরীক্ষায় ফেললেও গোল হয়নি। রিয়াল ব্যবধান বাড়ানোর সুযোগ পাচ্ছিল, কিন্তু ম্যাচ পুরোপুরি নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিতে পারছিল না।
শেষ পর্যন্ত ৭৭ মিনিটে ইন্টার ব্যবধান কমিয়ে আনে। লাউতারো মার্তিনেজের নিখুঁত ক্রস থেকে কার্লোস অগাস্টো শক্তিশালী শটে কুর্তোয়াকে পরাস্ত করেন। স্কোর দাঁড়ায় ২-১। এরপর ম্যাচের শেষ সময়টুকুতে সমতা ফেরানোর জন্য মরিয়া হয়ে ওঠে ইন্টার।
সেই চাপ সামলানোর মূল দায়িত্ব নেন কুর্তোয়া। একাধিক গুরুত্বপূর্ণ সেভ করে তিনি রিয়ালকে বিপদ থেকে বাঁচান। ম্যাচের শেষ দিকে হেনরিখ মখিতারিয়ানের গোলমুখী প্রচেষ্টাও দুর্দান্তভাবে ঠেকিয়ে দেন বেলজিয়ান গোলরক্ষক। তাঁর নৈপুণ্যেই শেষ পর্যন্ত ২-১ ব্যবধানের জয় ধরে রাখে রিয়াল।
এমবাপ্পের ব্যক্তিগত অর্জনও ম্যাচটির অন্যতম বড় আলোচনার বিষয়। ৯৯তম ম্যাচে চ্যাম্পিয়ন্স লিগ ও ইউরোপিয়ান কাপ মিলিয়ে তাঁর গোলসংখ্যা হলো ৭১। এই সংখ্যায় তিনি রাউলের সঙ্গে যৌথভাবে সর্বকালের গোলদাতাদের তালিকায় পঞ্চম স্থানে উঠে এসেছেন।
এই তালিকায় এমবাপ্পের ওপরে রয়েছেন করিম বেনজেমা, রবার্ট লেভানডভস্কি, লিওনেল মেসি ও ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো। বেনজেমার গোল ৯০, লেভানডভস্কির ১০৯, মেসির ১২৯ এবং রোনালদোর ১৪০। ফলে বয়স ও ম্যাচসংখ্যার বিচারে এমবাপ্পের সামনে আরও ওপরে ওঠার যথেষ্ট সুযোগ রয়েছে।
রিয়ালের জন্য জয়টি তাই শুধু তিন পয়েন্ট পাওয়ার ঘটনা নয়। কঠিন প্রতিপক্ষের বিপক্ষে দলটি আক্রমণভাগের কার্যকারিতা, এমবাপ্পের গোল করার ধার এবং কুর্তোয়ার দুর্দান্ত গোলরক্ষকসুলভ পারফরম্যান্স—তিনটিই একসঙ্গে পেয়েছে। অন্যদিকে ইন্টার হারলেও ম্যাচের বড় অংশে রিয়ালকে চাপে রাখার সক্ষমতা দেখিয়েছে। ফলে ২-১ ব্যবধানের এই জয় রিয়ালের জন্য স্বস্তির হলেও ম্যাচের পারফরম্যান্সে উন্নতির জায়গা যে রয়েছে, সেটিও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।


