টিকাদান ঘাটতিতে বাংলাদেশে ভয়াবহ হাম প্রাদুর্ভাব

টিকাদান কর্মসূচিতে দীর্ঘদিনের ঘাটতি, নিয়মিত টিকা কার্যক্রমে ব্যাঘাত এবং বিপুলসংখ্যক শিশুর টিকার আওতার বাইরে থেকে যাওয়ার প্রভাব এখন ভয়াবহভাবে দৃশ্যমান। বাংলাদেশ বর্তমানে বিশ্বের সবচেয়ে বড় হাম প্রাদুর্ভাবের মুখোমুখি। ৯ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত দেশে হাম ও হামসদৃশ উপসর্গে ১,০০২ জনের মৃত্যু হয়েছে। একই সময়ে হাম বা হামসদৃশ সংক্রমণের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৮৭ হাজার ৪৮৪।

যুক্তরাষ্ট্রের সেন্টারস ফর ডিজিজ কন্ট্রোল অ্যান্ড প্রিভেনশন (সিডিসি)-এর বৈশ্বিক হাম পরিস্থিতির তালিকাতেও বাংলাদেশ সবচেয়ে বড় প্রাদুর্ভাবের দেশ হিসেবে উঠে এসেছে। ২০২৬ সালের প্রথম ছয় মাসে বাংলাদেশে ৫৭ হাজার ৫৬১টি হাম সংক্রমণ নথিভুক্ত হয়েছিল, যা ওই সময়ে বিশ্বের দেশগুলোর মধ্যে সর্বোচ্চ।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সর্বশেষ হিসাব অনুযায়ী, ১,০০২ মৃত্যুর মধ্যে ১০০ জনের হাম পরীক্ষায় নিশ্চিত হয়েছিল। বাকি ৯০২ জনের মৃত্যু হামসদৃশ উপসর্গের সঙ্গে সম্পর্কিত হিসেবে সন্দেহভাজন তালিকায় রয়েছে। একই সময়ে নিশ্চিত হাম রোগীর সংখ্যা প্রায় ১৯ হাজার ৯০৪ এবং সন্দেহভাজন রোগীর সংখ্যা ১ লাখ ৬৭ হাজার ৫৮০।

প্রাদুর্ভাবের শুরু থেকে পরিস্থিতি কতটা ভয়াবহ হয়েছে, তা বোঝা যায় হাসপাতালে ভর্তি রোগীর সংখ্যাতেও। ৯ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত হাম বা হামসদৃশ উপসর্গ নিয়ে ১ লাখ ৪৭ হাজার ৩৯৩ জন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। এর মধ্যে ১ লাখ ৪১ হাজার ৮১৯ জন চিকিৎসা শেষে ছাড়পত্র পেয়েছেন। ওই সময়ও ৫ হাজার ৫৭৪ জন রোগী হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিলেন।

টিকাদানে ঘাটতিই বড় কারণ

বিশেষজ্ঞ ও আন্তর্জাতিক স্বাস্থ্য সংস্থাগুলোর পর্যবেক্ষণে হাম প্রাদুর্ভাবের পেছনে টিকাদান কর্মসূচির দুর্বলতা গুরুত্বপূর্ণ কারণ হিসেবে উঠে এসেছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) এপ্রিলের পরিস্থিতি বিশ্লেষণে জানিয়েছিল, দেশের ৬৪ জেলার মধ্যে ৫৮টিতেই হাম ছড়িয়ে পড়েছিল। আক্রান্তদের ৭৯ শতাংশই ছিল পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশু। দুই বছরের কম বয়সী এবং টিকা না পাওয়া শিশুদের মধ্যে ঝুঁকি ছিল আরও বেশি।

২০২৪ ও ২০২৫ সালে রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থায় নানা ধরনের ব্যাঘাতের কারণে নিয়মিত টিকাদান কার্যক্রম ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এর ফলে অনেক শিশু নির্ধারিত সময়ে হাম-রুবেলার টিকা পায়নি। টিকা সংগ্রহ ও সরবরাহ ব্যবস্থার সমস্যাও পরিস্থিতিকে জটিল করেছে বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।

এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, কেবল একটি বিশেষ টিকাদান অভিযান চালালেই ঝুঁকি পুরোপুরি দূর হয় না। নিয়মিত টিকাদান ব্যবস্থার মাধ্যমে নির্ধারিত বয়সে শিশুদের টিকা দেওয়া এবং যারা কোনো কারণে বাদ পড়ে গেছে, তাদের শনাক্ত করে পরে টিকার আওতায় আনা জরুরি। সেই ধারাবাহিকতায় ঘাটতি তৈরি হলে কয়েক বছর পর তার প্রভাব একসঙ্গে দৃশ্যমান হতে পারে।

জরুরি টিকাদান অভিযানেও পুরো ঝুঁকি কাটেনি

প্রাদুর্ভাব মোকাবিলায় সরকার বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা, ইউনিসেফ ও অন্যান্য অংশীদারের সহযোগিতায় জরুরি হাম-রুবেলা টিকাদান কর্মসূচি চালায়। জুনের শেষ নাগাদ এই কর্মসূচির আওতায় ১ কোটি ৮৪ লাখের বেশি শিশুকে টিকা দেওয়া হয়েছিল, যা নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রার চেয়েও বেশি।

তবে জরুরি কর্মসূচির সাফল্য সত্ত্বেও নতুন রোগী ও মৃত্যুর ঘটনা পুরোপুরি বন্ধ হয়নি। এর একটি কারণ হলো—আগের বছরগুলোতে টিকা থেকে বাদ পড়া শিশুদের একটি অংশ ইতোমধ্যেই সংক্রমণের ঝুঁকিতে ছিল। আবার টিকাদানের প্রশাসনিক হিসাব ও বাস্তবে একটি শিশুর পূর্ণ সুরক্ষা পাওয়ার মধ্যে পার্থক্যও থাকতে পারে। ফলে কাগজে টিকার আওতা বেশি দেখালেও কিছু এলাকায় বা নির্দিষ্ট বয়সগোষ্ঠীতে রোগ প্রতিরোধক্ষমতার ঘাটতি থেকে যেতে পারে।

শিশুদের ওপর সবচেয়ে বড় আঘাত

হাম অত্যন্ত সংক্রামক একটি ভাইরাসজনিত রোগ। আক্রান্ত ব্যক্তির কাশি বা হাঁচির মাধ্যমে সহজেই ভাইরাস ছড়িয়ে পড়তে পারে। টিকা না নেওয়া বা পর্যাপ্ত সুরক্ষা না থাকা শিশুদের মধ্যে সংক্রমণের ঝুঁকি বেশি।

রোগটি অনেক ক্ষেত্রে কয়েক দিনের জ্বর, কাশি, সর্দি ও চোখ লাল হওয়ার মতো উপসর্গ দিয়ে শুরু হলেও জটিলতা দেখা দিলে নিউমোনিয়া, তীব্র শ্বাসকষ্ট কিংবা মস্তিষ্কে প্রদাহের মতো গুরুতর পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে। বিশেষ করে অপুষ্টিতে ভোগা, খুব অল্প বয়সী কিংবা অন্যান্য স্বাস্থ্যঝুঁকি থাকা শিশুদের ক্ষেত্রে পরিস্থিতি দ্রুত খারাপ হতে পারে।

বাংলাদেশে চলমান প্রাদুর্ভাবের সময় হাসপাতালগুলোর ওপরও ব্যাপক চাপ তৈরি হয়েছে। একই সময়ে দেশে ডেঙ্গুর প্রকোপ বাড়ায় শিশু ও প্রাপ্তবয়স্ক—দুই ধরনের রোগীর চিকিৎসা দিতে গিয়ে স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থায় অতিরিক্ত চাপ পড়ছে।

কয়েক দশকের অগ্রগতিতে বড় ধাক্কা

বাংলাদেশে দীর্ঘদিন ধরে হাম নিয়ন্ত্রণে টিকাদান কর্মসূচি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। কিন্তু সাম্প্রতিক প্রাদুর্ভাব সেই অর্জনের স্থায়িত্ব নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে। একটি রোগ নিয়ন্ত্রণে আনতে শুধু একবারের টিকাদান অভিযান যথেষ্ট নয়; নিয়মিত টিকাদানের ধারাবাহিকতা, মাঠপর্যায়ে নজরদারি এবং বাদ পড়া শিশুদের দ্রুত শনাক্ত করা সমান গুরুত্বপূর্ণ।

বর্তমান পরিস্থিতিতে বিশেষজ্ঞরা নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচি শক্তিশালী করা, টিকা সরবরাহের ঘাটতি দূর করা এবং টিকা থেকে বাদ পড়া শিশুদের খুঁজে বের করে সুরক্ষার আওতায় আনার ওপর জোর দিচ্ছেন। পাশাপাশি হাম আক্রান্তদের দ্রুত শনাক্ত করা এবং গুরুতর রোগীদের যথাযথ চিকিৎসা নিশ্চিত করাও জরুরি।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার এপ্রিলের মূল্যায়নেই বাংলাদেশে হাম সংক্রমণের জাতীয় ঝুঁকি ‘উচ্চ’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছিল। তখন থেকেই সংস্থাটি বিপুলসংখ্যক টিকা-বঞ্চিত বা ঝুঁকিতে থাকা শিশুকে পরিস্থিতির অন্যতম বড় কারণ হিসেবে দেখিয়ে আসছে।

একসময় যে রোগ প্রতিরোধে বাংলাদেশ উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছিল, সেই হামই এখন দেশের শিশুস্বাস্থ্যের জন্য বড় সংকট হয়ে দাঁড়িয়েছে। এক হাজারের বেশি মৃত্যু এবং প্রায় দুই লাখ সংক্রমণের এই চিত্র দেখিয়ে দিচ্ছে—টিকাদান কর্মসূচির সাময়িক দুর্বলতাও কতটা বড় জনস্বাস্থ্য ঝুঁকিতে রূপ নিতে পারে। এই প্রাদুর্ভাব নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি ভবিষ্যতে এমন পরিস্থিতি ঠেকাতে নিয়মিত টিকাদান ব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী করাই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।

Tags :

মুরসালিন মাহমুদ তাইসিন | উপ-সম্পাদক | খবরওয়ালা বাংলা

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সর্বশেষ খবর

খবরওয়ালা একটি বিশ্বস্ত অনলাইন নিউজ পোর্টাল, যেখানে বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও আপডেট প্রকাশ করা হয়। রাজনীতি, জাতীয় ও স্থানীয় সংবাদ, শিক্ষা, খেলাধুলা, ব্যবসা, বিনোদন ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনের গুরুত্বপূর্ণ খবর নিয়ে পাঠকদের জন্য রয়েছে নির্ভরযোগ্য ও সময়োপযোগী সংবাদ পরিবেশন।

© ২০২৬ খবরওয়ালা। সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।