রাজশাহীর ঐতিহ্যবাহী সাহেববাজারের ‘কারুশ্রী জুয়েলার্স’-এ সংঘটিত চাঞ্চল্যকর ও পরিকল্পিত সিঁধেল চুরির ঘটনায় আন্তর্জাতিক চক্রের ৮ সদস্যকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। একই সঙ্গে উদ্ধার করা হয়েছে চোরাই যাওয়া ২৬ ভরি স্বর্ণ, ৬২ ভরি রূপা এবং চোরাই অলংকার বিক্রির নগদ ২৫ লাখ টাকা। চুরির মূল ঘটনাটি ঘটাতে টানা চার মাস ধরে ক্রেতা ও ব্যবসায়ী সেজে এলাকাটি রেকি করে দুর্ধর্ষ এই অপরাধী চক্র।
বৃহস্পতিবার (১০ সেপ্টেম্বর) দুপুরে রাজশাহী মহানগর পুলিশের (আরএমপি) সদর দপ্তরে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য আনুষ্ঠানিকভাবে জানান সংস্থাটির মুখপাত্র ও উপপুলিশ কমিশনার গাজিউর রহমান।
পুলিশ কর্মকর্তা ও মামলার বিবরণ থেকে জানা যায়, ঘটনার প্রায় চার মাস আগে ১০-১২ জনের এই দুর্ধর্ষ দলটি রাজশাহীতে এসে সাহেববাজারের আশপাশের বিভিন্ন আবাসিক হোটেলে অবস্থান নেওয়া শুরু করে। কখনো ছোটখাটো ব্যবসায়ী, আবার কখনো ক্রেতা সেজে তারা প্রতিনিয়ত কারুশ্রী জুয়েলার্স এবং সংলগ্ন এলাকা গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করে। এই সুদীর্ঘ সময় নিয়ে তারা দোকানে ঢোকার পথ, দেয়ালের দুর্বলতা এবং চুরির পর নিরাপদে পালিয়ে যাওয়ার সব রুট নিখুঁতভাবে নির্ধারণ করে নেয়।
পরিকল্পনা অনুযায়ী গত ১৯ জুন ভোরে চক্রটির সদস্যরা কারুশ্রী জুয়েলার্সের সামনে অবস্থান নেয়। পুলিশের চোখ ফাঁকি দিতে ও স্থানীয়দের বিভ্রান্ত করতে তারা ফুটপাতে ভ্রাম্যমাণ কেনাবেচার দোকান বসিয়ে কৃত্রিম জটলা তৈরি করে। এরপর অতি সুকৌশলে পাশের একটি অপেক্ষাকৃত ছোট স্বর্ণের দোকানের তালা খুলে সেটির ভেতরে প্রবেশ করে। ওই দোকানের ভেতর থেকে কারুশ্রী জুয়েলার্সের পশ্চিম পাশের ইটের দেয়াল কেটে তারা মূল দোকানে হানা দেয়। পরবর্তীতে সিন্দুক ভেঙে দোকান মালিক তুর্য সরকারের দাবি অনুযায়ী প্রায় ২০০ ভরি স্বর্ণ, ২ হাজার ২০০ ভরি রূপা, তিন বক্স স্বর্ণের নাকফুল ও নগদ ২০ লাখ টাকা লুট করে সটকে পড়ে।
ঘটনার পর দোকান মালিক বোয়ালিয়া মডেল থানায় মামলা দায়ের করলে ছায়া তদন্তে নামে আরএমপি ডিবি, সাইবার ইউনিট এবং সিসি ক্যামেরা ট্র্যাকিং দল। তদন্তে দেখা যায়, অপরাধীরা অত্যন্ত ধুরন্ধর ও প্রযুক্তিসচেতন। তারা চুরির কাজে ব্যবহৃত কোনো মোবাইল ফোন বা সিম কার্ড দ্বিতীয়বার ব্যবহার করত না। তাছাড়া ভুয়া ও বেনামী নিবন্ধিত সিম ব্যবহার করার পাশাপাশি তারা দ্রুত অবস্থান পরিবর্তন করে খুলনা ও ঢাকার বিভিন্ন গোপন আস্তানায় আত্মগোপন করেছিল।
অবশেষে তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তা এবং গোপন সংবাদের ভিত্তিতে গত ৮ সেপ্টেম্বর রাতে প্রথমে খুলনার মোংলা এলাকা থেকে চোর চক্রের অন্যতম মূলহোতা রুস্তম আলী শেখকে (৬৪) গ্রেপ্তার করা হয়। পরবর্তীতে তার দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় সাঁড়াশি অভিযান চালিয়ে গ্রেপ্তার করা হয় স্বপন (৬২), উজ্জল (৩৭), রিয়াজ সুমন ওরফে গেদু (৩৯), আবু তালেব (৪৫), কালাম শেখ (৪৮) এবং ইউনুসকে (৪৫)।
পরবর্তীতে এই চোরাকারবারীদের স্বীকারোক্তির ভিত্তিতে ঢাকার জাঁকজমকপূর্ণ এলাকায় অভিযান চালিয়ে চোরাই অলংকার কেনাবেচার সাথে জড়িত স্বর্ণ ব্যবসায়ী রবিউল হাসানকে (৪৫) আটক করে ডিবি পুলিশ। রবিউলের হেফাজত থেকেই উদ্ধার করা হয় উদ্ধারকৃত ২৬ ভরি স্বর্ণ, ৬২ ভরি রূপা এবং নগদ ২৫ লাখ টাকা। আটকের পর রবিউল অসুস্থ হয়ে পড়ায় তাকে বর্তমানে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পুলিশ পাহারায় চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে।
সংবাদ সম্মেলনে আরএমপি নিশ্চিত করেছে, চক্রের বাকি পলাতক সদস্যদের গ্রেফতার এবং অবশিষ্ট মালামাল উদ্ধারে অভিযান অব্যাহত রয়েছে। গ্রেফতারকৃত ৮ আসামিকে বৃহস্পতিবার আদালতে সোপর্দ করে অধিকতর জিজ্ঞাসাবাদের জন্য সাত দিনের রিমান্ডের আবেদন জানানো হয়েছে।


