স্মরণ – সৈয়দা সাজেদা চৌধুরী

বীর মুক্তিযোদ্ধা | মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক | সাবেক সাধারণ সম্পাদক, বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ | সাবেক সংসদ উপনেতা

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে কিছু মানুষ তাঁদের পদ-পদবি দিয়ে নয়, বরং ত্যাগ, সাহস, নিষ্ঠা ও দীর্ঘ সংগ্রামের মধ্য দিয়ে নিজেদের নামকে ইতিহাসের পাতায় স্থায়ী করে রাখেন। সৈয়দা সাজেদা চৌধুরী ছিলেন তেমনই এক সংগ্রামী নারী—যাঁর জীবন বাংলাদেশের স্বাধীনতা, গণতান্ত্রিক আন্দোলন ও রাজনৈতিক সংগঠনের ইতিহাসের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িয়ে আছে।

১৯৩৫ সালের ৮ মে মাগুরায় এক সম্ভ্রান্ত পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন সৈয়দা সাজেদা চৌধুরী। তাঁর পিতা সৈয়দ শাহ হামিদ উল্লাহ এবং মাতা সৈয়দা আছিয়া খাতুন। তাঁর স্বামী গোলাম আকবর চৌধুরী ছিলেন দেশের একজন বিশিষ্ট বীমা ব্যক্তিত্ব।

১৯৫৬ সালে তিনি আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে যোগ দেন। এরপর ধীরে ধীরে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেন একজন নিবেদিতপ্রাণ সংগঠক হিসেবে। ১৯৬৯ থেকে ১৯৭৫ সাল পর্যন্ত তিনি মহিলা আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাতা সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। রাজনৈতিক জীবনের পাশাপাশি নারীসমাজের সংগঠন, শিক্ষা ও সামাজিক উন্নয়নেও তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন।

মহান মুক্তিযুদ্ধের উত্তাল দিনগুলোতে তাঁর অবদান ছিল বিশেষভাবে স্মরণীয়। মুক্তিযুদ্ধকালীন কলকাতার গোবরা নার্সিং ক্যাম্প প্রতিষ্ঠা ও পরিচালনায় তিনি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন। যুদ্ধের ময়দানে অস্ত্র হাতে না থাকলেও দেশমাতৃকার মুক্তির জন্য তাঁর সংগঠকসুলভ ভূমিকা ছিল এক অনন্য অবদান।

১৯৭৪ সালে গ্রামীণ উন্নয়ন ও শিক্ষাক্ষেত্রে বিশেষ অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ তিনি UNESCO Fellowship লাভ করেন। একই বছর বাংলাদেশ গার্ল গাইড অ্যাসোসিয়েশনের ন্যাশনাল কমিশনার হিসেবে অর্জন করেন সর্বোচ্চ সম্মানসূচক ‘সিলভার এলিফ্যান্ট’ পদক।

জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নির্মম হত্যাকাণ্ডের পর আওয়ামী লীগ যখন এক গভীর সংকট, বিপর্যয় ও অনিশ্চয়তার মধ্য দিয়ে যাচ্ছিল, তখন দলের হাল ধরে রাখার কঠিন দায়িত্ব যাঁরা সাহসের সঙ্গে পালন করেছিলেন, সৈয়দা সাজেদা চৌধুরী তাঁদের অন্যতম। তিনি দলের ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন।

১৯৮১ সালে আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা দীর্ঘ নির্বাসন শেষে দেশে ফিরে এলে তাঁর পাশে যে কজন বিশ্বস্ত ও পরীক্ষিত সহযোদ্ধা দৃঢ়ভাবে দাঁড়িয়েছিলেন, সৈয়দা সাজেদা চৌধুরী ছিলেন তাঁদের অন্যতম। তাঁর রাজনৈতিক প্রজ্ঞা, সাংগঠনিক দক্ষতা ও দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা দলের পুনর্গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগে ১৯৮৬ থেকে ১৯৯২ সাল পর্যন্ত তিনি দলের সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন। পরবর্তীকালে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত আওয়ামী লীগের গঠিত বিভিন্ন কমিটিতে তিনি সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করে গেছেন।

১৯৯৬ থেকে ২০০১ মেয়াদে তিনি বাংলাদেশ সরকারের পরিবেশ ও বনমন্ত্রী হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন। তাঁর রাজনৈতিক ও সামাজিক অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ ২০০০ সালে American Biographical Institute তাঁকে ‘Woman of the Year’ নির্বাচিত করে। জাতীয় জীবনে তাঁর অবদানের সর্বোচ্চ স্বীকৃতিগুলোর একটি হিসেবে ২০১০ সালে তিনি লাভ করেন স্বাধীনতা পুরস্কার।

রাজনীতির পাশাপাশি সাংস্কৃতিক অঙ্গনেও তাঁর উত্তরাধিকার উজ্জ্বল। দেশের প্রথিতযশা রবীন্দ্রসঙ্গীত শিল্পী সাজেদ আকবর ও শামা রহমান তাঁর সুযোগ্য পুত্র-কন্যা।

সৈয়দা সাজেদা চৌধুরীর জীবন ছিল দীর্ঘ রাজনৈতিক সংগ্রাম, সাংগঠনিক নিষ্ঠা ও দেশপ্রেমের এক বিস্তৃত অধ্যায়। স্বাধীনতার জন্য তাঁর ভূমিকা, আওয়ামী লীগের দুঃসময়ে তাঁর দৃঢ় অবস্থান এবং দীর্ঘ রাজনৈতিক পথচলা বাংলাদেশের ইতিহাসে তাঁকে একটি স্বতন্ত্র স্থান দিয়েছে।

১১ সেপ্টেম্বর ২০২২—নশ্বর পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করে তিনি চলে যান অনন্তের পথে। কিন্তু মানুষের জীবন শেষ হয়ে গেলেও তাঁর কর্ম, সংগ্রাম ও স্মৃতি কখনো শেষ হয় না। ইতিহাসের পাতায়, মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় এবং বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনের স্মৃতিতে তিনি বেঁচে থাকবেন দীর্ঘকাল।

বিনম্র শ্রদ্ধা।
স্মৃতির পাতায় অমলিন থাকুন, সৈয়দা সাজেদা চৌধুরী।

Tags :

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সর্বশেষ খবর

খবরওয়ালা একটি বিশ্বস্ত অনলাইন নিউজ পোর্টাল, যেখানে বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও আপডেট প্রকাশ করা হয়। রাজনীতি, জাতীয় ও স্থানীয় সংবাদ, শিক্ষা, খেলাধুলা, ব্যবসা, বিনোদন ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনের গুরুত্বপূর্ণ খবর নিয়ে পাঠকদের জন্য রয়েছে নির্ভরযোগ্য ও সময়োপযোগী সংবাদ পরিবেশন।

© ২০২৬ খবরওয়ালা। সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।