ডিমের দাম বাড়ায় চাপে নিম্ন আয়ের পরিবার

রাজধানীর বাজারে আবারও বেড়েছে ডিমের দাম। একসময় নিম্ন ও স্বল্প আয়ের মানুষের জন্য তুলনামূলক সাশ্রয়ী আমিষের উৎস হিসেবে ডিমের ওপর নির্ভরতা থাকলেও সাম্প্রতিক মূল্যবৃদ্ধিতে সেই সুবিধাও কমে এসেছে। সবজির বাড়তি দামের সঙ্গে ডিমের দামও বেড়ে যাওয়ায় সীমিত আয়ের পরিবারগুলোকে খাবারের তালিকা নিয়ে নতুন করে হিসাব করতে হচ্ছে।

গতকাল শনিবার সকাল ১০টার দিকে রাজধানীর তেজগাঁও এলাকার পূর্ব নাখালপাড়া সমিতি বাজারে ডিম কিনতে এসেছিলেন গৃহিণী সাজুদা বেগম। চারটি ডিম কিনতে তাঁকে দিতে হয়েছে ৫৫ টাকা। এতে ক্ষোভ ও হতাশা প্রকাশ করে তিনি বলেন, সবজির দাম বেশি হওয়ায় তাঁরা তুলনামূলকভাবে বেশি ডিম খেতেন। কিন্তু এখন ডিমের দামও বেড়ে যাওয়ায় সংসারের খাবারের খরচ সামলানো কঠিন হয়ে পড়েছে।

সাজুদার স্বামী একটি ওয়ার্কশপে দৈনিক ৬০০ টাকা মজুরিতে রংমিস্ত্রির কাজ করেন। পরিবারের প্রধান আয়ের উৎস তাঁর এই দৈনিক মজুরি। মাছ-মাংস নিয়মিত কেনার সামর্থ্য না থাকায় ডিম ও সবজি দিয়েই কোনোভাবে সংসারের খাবারের চাহিদা মেটানোর চেষ্টা করেন তারা। কিন্তু ডিমের দাম বাড়ায় সেই নির্ভরতাতেও চাপ তৈরি হয়েছে।

বাজার ঘুরে দেখা গেছে, কয়েক মাস আগেও ডিমের দাম তুলনামূলকভাবে কম ছিল। প্রায় চার মাস আগে প্রতি ডজন ডিমের দাম ১০০ থেকে ১১০ টাকায় নেমে এসেছিল। এরপর ধীরে ধীরে দাম বাড়তে থাকে। বর্তমানে রাজধানীর সমিতি বাজার, কারওয়ান বাজার ও নাখালপাড়া এলাকায় ফার্মের সাদা ডিম প্রতি ডজন ১৪০ থেকে ১৪৫ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। বাদামি ডিমের দাম আরও কিছুটা বেশি—প্রতি ডজন ১৪৫ থেকে ১৫০ টাকা।

তবে পাড়া-মহল্লার খুচরা দোকানে চারটি ডিম কিনতে গেলে ক্রেতাকে গুনতে হচ্ছে ৫৫ টাকা। সেই হিসাবে এক ডজন ডিমের দাম দাঁড়ায় ১৬৫ টাকা। ব্যবসায়ীদের ভাষ্য অনুযায়ী, প্রায় দুই মাস ধরে ডিমের দাম তুলনামূলকভাবে উঁচু পর্যায়ে রয়েছে। সরকারি সংস্থা ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশের (টিসিবি) তথ্যেও সাম্প্রতিক সময়ে ডিমের দাম বাড়ার চিত্র উঠে এসেছে। সংস্থাটির হিসাবে, গত এক মাসে ডিমের দাম ৩ শতাংশের বেশি বেড়েছে।

দাম বাড়ার কারণ নিয়ে বাজারসংশ্লিষ্টদের মধ্যে অবশ্য ভিন্ন ভিন্ন বক্তব্য রয়েছে। ভোক্তা-সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, কিছু অসাধু ব্যবসায়ী বাজারে কারসাজি করে ডিমের দাম বাড়াচ্ছেন। তাদের অতিরিক্ত মুনাফার প্রবণতার কারণে সাধারণ মানুষের জন্য গুরুত্বপূর্ণ এই খাদ্যপণ্যটি ক্রমেই ব্যয়বহুল হয়ে উঠছে।

অন্যদিকে খুচরা ব্যবসায়ীদের দাবি, বছরের এই সময়ে সাধারণত সবজির দাম বাড়ে। ফলে অনেক পরিবার সবজির পরিবর্তে ডিমের দিকে বেশি ঝোঁকে। চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় বাজারে ডিমের দামও বাড়ে। কয়েকজন ব্যবসায়ী জানিয়েছেন, দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ডিমের সরবরাহ থাকলেও ঢাকার ব্যবসায়ীদের বাজারদর নির্ধারণে বড় ধরনের প্রভাব রয়েছে।

কারওয়ান বাজারের খুচরা ডিম বিক্রেতা সাইফুল গাজীর ভাষ্য, পাইকারি বাজারে কখনো এক-দুই দিন দাম কমছে, আবার পরের কয়েক দিন বাড়ছে। এভাবে ধাপে ধাপে দাম বেড়ে বর্তমানে প্রতি ডজন প্রায় দেড়শ টাকার কাছাকাছি পৌঁছেছে।

ডিমের দামের অস্বাভাবিক বৃদ্ধির ঘটনা অবশ্য নতুন নয়। ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বর ও অক্টোবরে দেশে ডিমের দাম ব্যাপকভাবে বেড়েছিল। সে সময় প্রতি ডজন ডিমের দাম ১৬০ থেকে ১৬৫ টাকা পর্যন্ত উঠেছিল। পরিস্থিতি সামাল দিতে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় খুচরা পর্যায়ে প্রতিটি ডিমের দাম ১১ টাকা ৮৭ পয়সা নির্ধারণ করেছিল। সে হিসাবে প্রতি ডজনের দাম নির্ধারিত হয় ১৪২ টাকা।

এবার রাজধানীর পাশাপাশি চট্টগ্রামেও ডিমের বাজারে মূল্যবৃদ্ধির খবর পাওয়া গেছে। এক সপ্তাহ আগে সেখানে প্রতি ডজন ডিম ১৪০ থেকে ১৪৫ টাকায় বিক্রি হলেও বর্তমানে তা বেড়ে ১৬০ থেকে ১৬৫ টাকায় উঠেছে। অর্থাৎ মাত্র এক সপ্তাহের ব্যবধানে ডজনে প্রায় ১৫ থেকে ২০ টাকা পর্যন্ত দাম বেড়েছে।

চট্টগ্রাম নগরীর বহদ্দারহাট এলাকার একটি পাইকারি বিক্রয়কেন্দ্রের ব্যবসায়ী আহমেদ ফারুক জানান, কিছুদিন ডিমের বাজার স্থিতিশীল ছিল। তবে সাম্প্রতিক বৃষ্টির পর সরবরাহ ও উৎপাদন পরিস্থিতিতে পরিবর্তন এসেছে বলে তিনি মনে করেন। তাঁর মতে, সরবরাহকারী খামারি ও আড়তদার পর্যায়ে দাম বাড়ার প্রভাব শেষ পর্যন্ত খুচরা বাজারে পড়ছে। নগরীর আগ্রাবাদসংলগ্ন চৌমুহনী বাজারেও একই ধরনের পরিস্থিতি দেখা গেছে।

ভোক্তা অধিকার সংগঠন কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) চট্টগ্রাম বিভাগীয় সভাপতি এস এম নাজের হোসাইন অভিযোগ করেন, বাজারে বিভিন্ন সময় বিভিন্ন পণ্যকে কেন্দ্র করে অসাধু ব্যবসায়ীরা সুযোগ নিচ্ছেন। তাঁর মতে, যথাযথ তদারকি না থাকলে বাজারে অতিরিক্ত মুনাফার প্রবণতা বাড়ে এবং এর চাপ গিয়ে পড়ে সাধারণ ভোক্তার ওপর। ডিমের দাম নির্ধারিত সীমার বাইরে চলে যাওয়ার বিষয়টিও তিনি গুরুত্বের সঙ্গে দেখার আহ্বান জানান।

চট্টগ্রামে ডিমের সরবরাহ পরিস্থিতিতেও কিছুটা চাপ রয়েছে। ব্যবসায়ীদের তথ্যমতে, নগরীতে প্রতিদিন প্রায় ২০ থেকে ২৫ লাখ ডিমের লেনদেন হয়। এর বড় অংশই আসে চট্টগ্রামের বাইরে থেকে। ফলে উৎপাদন, পরিবহন ও পাইকারি পর্যায়ে যেকোনো ধরনের সমস্যা সরাসরি স্থানীয় বাজারদরে প্রভাব ফেলতে পারে।

চট্টগ্রাম বিভাগীয় প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, গত জুলাইয়ের বন্যায় ছয় হাজারের বেশি হাঁস-মুরগির খামার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত খামারগুলোর মধ্যে ডিম উৎপাদনকারী লেয়ার মুরগির খামারও রয়েছে। চট্টগ্রামে স্থানীয় উৎপাদন এমনিতেই চাহিদার তুলনায় কম হওয়ায় বাইরের জেলার সরবরাহের ওপর নির্ভরতা রয়েছে। বন্যার কারণে খামার ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় সেই সরবরাহ ব্যবস্থায় বাড়তি চাপ তৈরি হয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।

তবে উৎপাদন বা সরবরাহের ঘাটতির পাশাপাশি বাজারে কোনো ধরনের সিন্ডিকেট বা কারসাজি কাজ করছে কি না, সেটিও খতিয়ে দেখার দাবি উঠেছে। কারণ প্রকৃত উৎপাদন ব্যয় ও সরবরাহ পরিস্থিতির সঙ্গে খুচরা বাজারের দামের পার্থক্য কতটা যৌক্তিক, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।

জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের পরিচালক আতিয়া সুলতানা জানিয়েছেন, বাজারে নিয়মিত তদারকি চলছে। ডিমের বাজারে কোনো ধরনের কারসাজি হচ্ছে কি না, সেটিও খতিয়ে দেখা হবে।

  1. ডিমের দাম বাড়ার প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়ছে সীমিত আয়ের পরিবারগুলোর ওপর। মাছ ও মাংসের তুলনায় দীর্ঘদিন ধরে ডিমকে কম খরচে প্রোটিন পাওয়ার সহজ উৎস হিসেবে বিবেচনা করা হলেও দাম বাড়তে থাকলে সেই বিকল্পও অনেক পরিবারের নাগালের বাইরে চলে যেতে পারে। ফলে বাজারে ডিমের সরবরাহ, পাইকারি ও খুচরা পর্যায়ের মূল্য নির্ধারণ এবং ব্যবসায়িক কারসাজির অভিযোগ—সবকিছু নজরদারির আওতায় আনা জরুরি হয়ে উঠেছে।
Tags :

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সর্বশেষ খবর

খবরওয়ালা একটি বিশ্বস্ত অনলাইন নিউজ পোর্টাল, যেখানে বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও আপডেট প্রকাশ করা হয়। রাজনীতি, জাতীয় ও স্থানীয় সংবাদ, শিক্ষা, খেলাধুলা, ব্যবসা, বিনোদন ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনের গুরুত্বপূর্ণ খবর নিয়ে পাঠকদের জন্য রয়েছে নির্ভরযোগ্য ও সময়োপযোগী সংবাদ পরিবেশন।

© ২০২৬ খবরওয়ালা। সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।