নাটোরের সিংড়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে টানা ১৩ ঘণ্টা বিদ্যুৎ না থাকায় চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন রোগী, স্বজন ও চিকিৎসক-নার্সরা। শনিবার দুপুর ১২টার দিকে বিদ্যুৎ চলে যাওয়ার পর রাত ১টা পর্যন্ত পরিস্থিতির কোনো উন্নতি হয়নি। ফলে সন্ধ্যার পর হাসপাতালের বিভিন্ন সেবা কার্যক্রম টর্চলাইট ও মোবাইল ফোনের আলোয় চালাতে হয়েছে।
হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, ট্রান্সফরমার বিকল হয়ে যাওয়ায় ৫০ শয্যার এই উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ হয়ে যায়। দিনের বেলায় প্রাকৃতিক আলো থাকায় কোনোভাবে চিকিৎসাসেবা চালিয়ে নেওয়া সম্ভব হলেও সন্ধ্যার পর পরিস্থিতি কঠিন হয়ে পড়ে। হাসপাতালের নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা আনসার সদস্যদের টর্চলাইটের আলো ধরে রাখতে দেখা যায়, আর সেই আলোয় চিকিৎসক ও নার্সরা রোগীদের প্রয়োজনীয় সেবা দেন।
বিশেষ করে রোগীদের ওষুধ, স্যালাইন ও ইনজেকশন দেওয়ার সময় পর্যাপ্ত আলোর অভাবে চিকিৎসাকর্মীদের সমস্যায় পড়তে হয়। জরুরি বিভাগের রোগীদের ক্ষেত্রেও একই পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয়েছে। হাসপাতালের মতো গুরুত্বপূর্ণ একটি প্রতিষ্ঠানে দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ না থাকায় রোগীদের স্বাভাবিক চিকিৎসাসেবা ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি চিকিৎসকদের কাজেও বাড়তি চাপ তৈরি হয়।
হাসপাতালের জরুরি বিভাগের এক চিকিৎসক জানান, সেখানে শিশু, বয়স্কসহ বিভিন্ন বয়সী রোগী ভর্তি রয়েছেন। বিদ্যুৎ না থাকায় রোগীদের প্রয়োজনীয় সেবা দিতে মোবাইল ফোনের আলো ব্যবহার করতে হয়েছে। বিদ্যুৎ বিভ্রাটের কারণে ভর্তি হতে আসা এবং জরুরি বিভাগের রোগীদের অনলাইনভিত্তিক টিকিট দেওয়ার কাজও করা সম্ভব হয়নি। তার মতে, হাসপাতালের মতো জনগুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করা জরুরি।
ভর্তি থাকা রোগী ও তাদের স্বজনদের অভিযোগ, সন্ধ্যার দিকে হাসপাতালের জেনারেটর চালু করা হলেও জ্বালানি তেলের সংকটে সেটি বেশিক্ষণ চালু রাখা যায়নি। পরে অনেক রোগী ও স্বজনকে নিজেদের মোবাইল ফোনের আলো ব্যবহার করে ওষুধ খেতে এবং প্রয়োজনীয় কাজ করতে হয়েছে।
বিদ্যুৎ না থাকায় সবচেয়ে বেশি সমস্যায় পড়েছেন শিশু, বয়স্ক ও শারীরিকভাবে দুর্বল রোগীরা। প্রচণ্ড গরমে উচ্চ রক্তচাপের রোগীদের অস্বস্তিও বেড়ে যায়। হাসপাতালে থাকা রোগীদের স্বজন হুমায়ুন কবীর, অসিত সরকার, আব্দুর রশিদসহ অন্তত সাতজন জানান, তারা শ্বাসকষ্ট, ডায়রিয়া ও উচ্চ রক্তচাপসহ বিভিন্ন সমস্যা নিয়ে হাসপাতালে রয়েছেন। দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ না থাকায় শ্বাসকষ্টের রোগীদের প্রয়োজনীয় অক্সিজেন বা গ্যাস দিতে সময়মতো ব্যবস্থা করতে সমস্যায় পড়তে হয়েছে বলেও তারা জানান।
রোগী ও স্বজনদের অভিযোগ, ট্রান্সফরমার বিকল হওয়ার পর দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও দ্রুত বিদ্যুৎ পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে কার্যকর উদ্যোগ দেখা যায়নি। এ পরিস্থিতির জন্য তারা পল্লী বিদ্যুতের গাফিলতিকে দায়ী করেন।
সিংড়া উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. মুজাহিদুল ইসলাম বলেন, বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন হওয়ার পর হাসপাতালের জেনারেটর চালু রাখা হয়েছিল। তবে জ্বালানি ব্যবস্থাপনার কারণে সেটি সব সময় চালু রাখা সম্ভব হয়নি। এতে রোগীদের কষ্ট হচ্ছে বলেও তিনি স্বীকার করেন।
এদিকে নাটোর পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি-১-এর সিংড়া জোনাল অফিসের ডেপুটি জেনারেল ম্যানেজার (ডিজিএম) সিদ্দিকুর রহমান জানান, হাসপাতালের বিদ্যুৎ লাইনের ট্রান্সফরমার বিকল হওয়ার খবর পাওয়ার পর থেকেই পল্লী বিদ্যুতের কর্মীরা মেরামতের কাজ শুরু করেন। তিনি বলেন, সমস্যাটি কিছুটা জটিল হওয়ায় কাজ শেষ করতে সময় লাগছে। রবিবার সকাল ৯টা পর্যন্ত বিদ্যুৎ পরিস্থিতি স্বাভাবিক হতে সময় লাগতে পারে বলে তিনি জানান।
রোগী ও স্বজনদের ধৈর্য ধরার আহ্বান জানিয়ে পল্লী বিদ্যুতের এই কর্মকর্তা বলেন, ট্রান্সফরমারের ত্রুটি মেরামত করে দ্রুত বিদ্যুৎ সরবরাহ স্বাভাবিক করার চেষ্টা চলছে।
তবে দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎহীন থাকার ঘটনায় হাসপাতালের জরুরি সেবা কতটা ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে, তা নিয়ে রোগী ও স্বজনদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে রাতের সময়ে চিকিৎসা, ওষুধ প্রয়োগ, জরুরি রোগীর ব্যবস্থাপনা এবং রোগীদের স্বাভাবিক চলাচলের জন্য পর্যাপ্ত আলো ও বিদ্যুৎ সরবরাহ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সিংড়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের এই পরিস্থিতি সেই প্রয়োজনীয়তার বিষয়টি আবারও সামনে এনেছে।


