আ.লীগের মিছিল ঠেকাতে ব্যর্থতা, ওসি-ডিসিকে দায় নিতে হবে

রাজধানীর কোনো থানা এলাকায় আওয়ামী লীগের মিছিল, জমায়েত বা অপ্রীতিকর কোনো ঘটনা ঘটলে সংশ্লিষ্ট থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) এবং দায়িত্বপ্রাপ্ত উপ-পুলিশ কমিশনারকে (ডিসি) এর দায় নিতে হবে। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থতা কিংবা দায়িত্ব পালনে অপারেশনাল ঘাটতি দেখা দিলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের জবাবদিহির আওতায় আনার পাশাপাশি প্রয়োজনে দায়িত্বে পরিবর্তন আনা হতে পারে বলে জানিয়েছে ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি)।

সোমবার (১৪ ডিসেম্বর) অনুষ্ঠিত ডিএমপির মাসিক অপরাধ পর্যালোচনা সভা বা ক্রাইম কনফারেন্সে মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের এ বিষয়ে কঠোর নির্দেশনা দেওয়া হয়। সভায় বলা হয়েছে, কোনো ঘটনা ঘটে যাওয়ার পর অভিযান চালিয়ে দায়িত্ব শেষ করা যাবে না। সম্ভাব্য মিছিল, জমায়েত, নাশকতা বা অন্য কোনো অপতৎপরতার বিষয়ে আগাম তথ্য সংগ্রহ করে প্রয়োজনীয় প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নিতে হবে।

ডিএমপির একাধিক কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলে সভার এসব সিদ্ধান্ত ও নির্দেশনার বিষয়ে জানা গেছে।

সভায় সভাপতিত্ব করেন ডিএমপি কমিশনার মোসলেহ উদ্দিন আহমেদ। এতে ডিএমপির বিভিন্ন বিভাগের অতিরিক্ত কমিশনার, যুগ্ম কমিশনার, ক্রাইম বিভাগের উপ-পুলিশ কমিশনার এবং রাজধানীর ৫০ থানার ওসিরা উপস্থিত ছিলেন। আগস্ট মাসে রাজধানীতে সংঘটিত বিভিন্ন অপরাধের পরিস্থিতি পর্যালোচনার পাশাপাশি সামনে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের করণীয় নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়।

ডিএমপির গোয়েন্দা গুলশান বিভাগের উপকমিশনার আ ফ ম আনোয়ার হোসেন খান বলেন, গুলশানের সাম্প্রতিক মিছিলের ঘটনাটি সভায় গুরুত্বের সঙ্গে আলোচনা হয়েছে। তবে এ ঘটনায় কোনো নির্দিষ্ট পুলিশ কর্মকর্তাকে এককভাবে দায়ী করা হয়নি। বরং কোথায় তথ্যের ঘাটতি ছিল, কেন আগাম প্রস্তুতি আরও কার্যকর করা যায়নি এবং ভবিষ্যতে একই ধরনের পরিস্থিতি কীভাবে প্রতিরোধ করা সম্ভব—এসব বিষয় পর্যালোচনা করা হয়েছে।

সভায় জানানো হয়, গত শুক্রবার গুলশানে আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীদের একটি মিছিলের বিষয়ে পুলিশ মাত্র আট মিনিট আগে একটি গোয়েন্দা সংস্থার কাছ থেকে তথ্য পেয়েছিল। তথ্য পাওয়ার পরপরই গুলশান থানা পুলিশ মিছিল ঠেকাতে তৎপর হয়। কিন্তু বড় ধরনের জমায়েত প্রতিরোধের জন্য আট মিনিটের মতো স্বল্প সময় যথেষ্ট নয়—এ কারণে আগাম গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ ও বিভিন্ন সংস্থার মধ্যে সমন্বয় আরও জোরদারের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।

গুলশানের ওই ঘটনার পর ঢাকার বিভিন্ন প্রবেশপথে নজরদারি বাড়ানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ এলাকা ও রাতের চেকপোস্টগুলোতে ব্লক চেকসহ প্রয়োজনীয় নিরাপত্তাব্যবস্থা জোরদার করতে বলা হয়েছে। ঢাকার বাইরে থেকে কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠী রাজধানীতে এসে যাতে অপতৎপরতা চালাতে না পারে, সে বিষয়েও সতর্ক থাকতে বলা হয়েছে।

ডিএমপির কর্মকর্তারা জানান, কোনো থানা এলাকায় মিছিল বা অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটলে শুধু গোয়েন্দা সংস্থার ওপর দায় চাপিয়ে দায়িত্ব এড়ানোর সুযোগ থাকবে না। সংশ্লিষ্ট থানার ওসি এবং ওই এলাকার জোনের ডিসিকে মাঠপর্যায়ে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের প্রাথমিক দায়িত্ব নিতে হবে। দায়িত্ব পালনে ব্যর্থতা বা ব্যবস্থাপনায় ঘাটতি পাওয়া গেলে তাদের জবাবদিহির মুখোমুখি হতে হবে।

ক্রাইম ডিভিশনের এক কর্মকর্তা বলেন, কমিশনার স্পষ্ট জানিয়েছেন, কোনো ইউনিট বা কর্মকর্তা দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হলে প্রয়োজন অনুযায়ী সেখানে পরিবর্তন আনা হবে। দায়িত্বে গাফিলতি বা অপেশাদার আচরণকে কোনোভাবেই প্রশ্রয় দেওয়া হবে না। মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের উদ্দেশে তিনি বলেন, ‘যে জায়গায় কাজ হবে না, সেই জায়গায় পরিবর্তন।’

গোয়েন্দা সমন্বয়ে বাড়তি গুরুত্ব

ক্রাইম কনফারেন্সে গোয়েন্দা তথ্যের সমন্বয় নিয়ে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়। শুধু পুলিশের নিজস্ব তথ্যের ওপর নির্ভর না করে ডিজিএফআই, এনএসআই, সিটিএসবি এবং সংশ্লিষ্ট অন্যান্য গোয়েন্দা সংস্থার সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

কোনো সম্ভাব্য মিছিল, জমায়েত, নাশকতা বা অপতৎপরতার তথ্য পাওয়া গেলে তা দ্রুত মাঠপর্যায়ের সংশ্লিষ্ট ইউনিটকে জানাতে হবে। তথ্য পাওয়ার পর যেন প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নেওয়ার মতো পর্যাপ্ত সময় থাকে, সে বিষয়েও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

তবে মিছিল ঠেকানোর নামে নিরপরাধ মানুষ যাতে হয়রানির শিকার না হন, সে বিষয়েও পুলিশ কর্মকর্তাদের সতর্ক করা হয়েছে। শুধু অতীতে কোনো রাজনৈতিক দলের সঙ্গে সম্পৃক্ততা ছিল কিংবা কোনো দলের সমর্থক ছিলেন—এমন পরিচয়ের ভিত্তিতে কাউকে গ্রেপ্তার না করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

মিছিলে সরাসরি অংশ নেওয়া ব্যক্তিদের শনাক্ত করতে ছবি, ভিডিও এবং তথ্যপ্রযুক্তিগত বিশ্লেষণের মতো সুনির্দিষ্ট প্রমাণ ব্যবহার করতে বলা হয়েছে। এরপর প্রমাণের ভিত্তিতে আইনগত ব্যবস্থা নিতে হবে।

একটি থানার ওসি বলেন, মিছিলের সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত ব্যক্তিদের শনাক্ত করার ক্ষেত্রে ছবি ও ভিডিও বিশ্লেষণে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। রাজনৈতিক পরিচয় বা কেবল সন্দেহের ভিত্তিতে কাউকে আটক করে হয়রানি করা যাবে না। একই সঙ্গে গ্রেপ্তারের ভয় দেখিয়ে কোনো পুলিশ সদস্য আর্থিক সুবিধা নিলে তার বিরুদ্ধেও কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে সভায় সতর্ক করা হয়েছে।

অপরাধ ঘটার আগেই প্রতিরোধের নির্দেশ

সভায় ‘প্রিভেন্টিভ পুলিশিং’ বা অপরাধ সংঘটনের আগেই তা প্রতিরোধের কৌশলের ওপরও জোর দেওয়া হয়। কর্মকর্তাদের বলা হয়েছে, কোনো অপরাধ ঘটে যাওয়ার পর শুধু আসামি ধরার ওপর নির্ভর করলে হবে না। সম্ভাব্য ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা চিহ্নিত করা, আগাম তথ্য সংগ্রহ এবং সন্দেহজনক গতিবিধি পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে হবে।

রাজধানীর আবাসিক ও অন্যান্য হোটেলে অবস্থানকারী অতিথিদের তথ্য নিয়মিত সংগ্রহ ও সংরক্ষণের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে বাসাবাড়িতে নতুন ভাড়াটিয়া ওঠার তথ্য যাচাইয়ের পাশাপাশি পুরোনো ভাড়াটিয়াদের তথ্যও হালনাগাদ করতে বলা হয়েছে।

তেজগাঁও বিভাগের একজন অতিরিক্ত উপ-পুলিশ কমিশনার (এডিসি) পদমর্যাদার কর্মকর্তা বলেন, সন্দেহজনক সাবলেট, অস্থায়ী আবাস এবং নতুন করে ঢাকায় আসা ব্যক্তিদের বিষয়ে স্থানীয় পর্যায়ে নজরদারি বাড়ানোর নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।

কমিউনিটি পুলিশিংয়ের ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। ওসিদের স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, গণ্যমান্য ব্যক্তি, কমিউনিটি পুলিশিংয়ের সদস্য এবং এলাকার নাগরিকদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখতে বলা হয়েছে। নতুন বা অপরিচিত ব্যক্তির আনাগোনা কিংবা সন্দেহজনক কর্মকাণ্ড নজরে এলে স্থানীয় বাসিন্দারা যাতে দ্রুত থানাকে জানাতে পারেন, সে ধরনের যোগাযোগব্যবস্থা গড়ে তোলার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

থানায় ওসিদের উপস্থিতি নিশ্চিত করার নির্দেশ

থানায় ওসিদের নিয়মিত উপস্থিতির বিষয়টিও সভায় গুরুত্ব পেয়েছে। সম্প্রতি তেজগাঁও থানায় পরিদর্শনে গিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ওসিকে না পাওয়া এবং পল্টন থানায় গিয়ে আইজিপি আলী হোসেন ফকির ও ডিএমপি কমিশনারের ওসিকে না পাওয়ার বিষয়টি আলোচনায় আসে।

এরপর তেজগাঁও থানার ওসি ক্যশৈন্যু মারমা এবং পল্টন মডেল থানার ওসি মোহাম্মদ মোস্তফা কামাল খানকে প্রত্যাহার করা হয়।

যুগ্ম কমিশনার পদমর্যাদার এক কর্মকর্তা বলেন, এসব ঘটনার পর থানায় ওসিদের উপস্থিতি এবং দায়িত্ব পালনের বিষয়ে আরও কঠোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। ডিউটির সময় ওসিদের থানায় অবস্থান করে দায়িত্ব পালনের কথা বলা হয়েছে। নির্ধারিত পোশাক পরার বিষয়েও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

জরুরি প্রয়োজনে থানার বাইরে যেতে হলে জিডিতে বিষয়টি উল্লেখ করতে হবে এবং দায়িত্ব পরবর্তী জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তার কাছে বুঝিয়ে দিয়ে যেতে হবে। থানার পরিবেশ, পুলিশ সদস্যদের শৃঙ্খলা এবং দায়িত্ব পালনে পেশাদারত্ব বজায় রাখার বিষয়েও নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

ছিনতাই ও কিশোর গ্যাংয়ের বিরুদ্ধেও অভিযান

রাজধানীতে ছিনতাই ও কিশোর গ্যাংয়ের বিরুদ্ধে অভিযান আরও জোরদার করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এলাকাভিত্তিক দায়িত্ব ভাগ করে পুলিশ সদস্যদের ডিউটি করার পাশাপাশি কোনো এলাকায় যাতে নিরাপত্তার শূন্যতা তৈরি না হয়, সেদিকে নজর দিতে বলা হয়েছে।

অপরাধপ্রবণ এলাকা চিহ্নিত করে সেখানে নিয়মিত টহল ও নজরদারি বাড়ানোর কথাও বলা হয়েছে। পুলিশের দায়িত্ব শুধু কোনো ঘটনার পর ঘটনাস্থলে পৌঁছানো নয়, বরং অপরাধের সম্ভাবনা তৈরি হওয়ার আগেই তা শনাক্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে।

সভায় গুলশানের সাম্প্রতিক ঘটনার পর ডিবি ও থানা পুলিশের সমন্বিত অভিযানে প্রায় ৫০ থেকে ৭০ জনকে গ্রেপ্তারের তথ্যও জানানো হয়। কর্মকর্তারা জানান, গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের মধ্যে ঢাকার বাইরে থেকে আসা লোকজনও রয়েছেন। বগুড়া, গোপালগঞ্জ, আলফাডাঙ্গা ও হরিরামপুরসহ বিভিন্ন এলাকা থেকে আসা কয়েকজন ঢাকায় বিভিন্ন পেশায় যুক্ত ছিলেন।

একটি চাইনিজ রেস্টুরেন্টের পাঁচজন ওয়েটারকেও গ্রেপ্তার করা হয়েছে বলে সভায় জানানো হয়। এ ছাড়া নিরাপত্তাকর্মী, অটোরিকশাচালকসহ বিভিন্ন পেশার আড়ালে অবস্থান করা ব্যক্তিদের গতিবিধি ও সংশ্লিষ্টতা যাচাইয়ের বিষয়েও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

সব মিলিয়ে এবারের ক্রাইম কনফারেন্সে ডিএমপি মাঠপর্যায়ে আগাম গোয়েন্দা তথ্য, আন্তঃসংস্থা সমন্বয়, থানায় ওসিদের উপস্থিতি এবং অপরাধ প্রতিরোধমূলক কার্যক্রমকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়েছে। একই সঙ্গে রাজনৈতিক পরিচয়ের ভিত্তিতে হয়রানি না করে সুনির্দিষ্ট তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশনা দিয়ে পুলিশি কার্যক্রমে জবাবদিহি ও পেশাদারত্ব নিশ্চিত করার বার্তাও দেওয়া হয়েছে।

Tags :

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সর্বশেষ খবর

খবরওয়ালা একটি বিশ্বস্ত অনলাইন নিউজ পোর্টাল, যেখানে বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও আপডেট প্রকাশ করা হয়। রাজনীতি, জাতীয় ও স্থানীয় সংবাদ, শিক্ষা, খেলাধুলা, ব্যবসা, বিনোদন ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনের গুরুত্বপূর্ণ খবর নিয়ে পাঠকদের জন্য রয়েছে নির্ভরযোগ্য ও সময়োপযোগী সংবাদ পরিবেশন।

© ২০২৬ খবরওয়ালা। সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।