সারাদেশে আশঙ্কাজনক হারে বাড়তে থাকা হামের প্রকোপে মৃত্যু ও সংক্রমণের মিছিল আরও দীর্ঘ হচ্ছে। দেশে হাম ও হামের উপসর্গে নতুন করে আরও ১১ জনের প্রাণহানি ঘটেছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হেলথ ইমার্জেন্সি অপারেশন সেন্টার ও কন্ট্রোল রুম থেকে প্রাপ্ত তথ্যে এই চিত্র উঠে এসেছে। নতুন করে মারা যাওয়া ব্যক্তিদের তালিকায় তথ্য হস্তান্তরে বিলম্বের কারণে ২১ সেপ্টেম্বরের অপ্রকাশিত চারজনের মৃত্যুর ঘটনাও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হিসাব অনুযায়ী, সর্বশেষ ২৪ ঘণ্টায় (মঙ্গলবার সকাল থেকে বুধবার সকাল পর্যন্ত) সারাদেশে নতুন করে ১ হাজার ১৫৭ জন হামের উপসর্গে আক্রান্ত হয়েছেন। পাশাপাশি ল্যাবরেটরি পরীক্ষায় ১১৩ জনের দেহে নিশ্চিতভাবে হামের সংক্রমণ শনাক্ত হয়েছে। চিকিৎসা শেষে সুস্থ হয়ে ওঠার আশার মাঝেও প্রতিদিন শতাধিক মানুষের নতুন করে সংক্রমিত হওয়া জনস্বাস্থ্য খাতকে চরম ঝুঁকিতে ফেলছে।
চলতি বছরের ১৫ মার্চ থেকে শুরু করে আজ পর্যন্ত দেশে সর্বমোট ১ লাখ ৮৩ হাজার ৪৪৯ জন রোগী হামের উপসর্গ নিয়ে চিকিৎসকের শরণাপন্ন হয়েছেন। এর মধ্যে ল্যাব পরীক্ষায় ২০ হাজার ৮৫১ জনের শরীরে নিশ্চিতভাবে হাম ভাইরাসের উপস্থিতি পাওয়া গেছে। মহামারির মতো ছড়িয়ে পড়া এই রোগে এ পর্যন্ত সর্বমোট ৯৭৫ জন হামের উপসর্গে এবং ১০১ জন নিশ্চিত হামে আক্রান্ত হয়ে মারা গেছেন। অর্থাৎ দুটি মিলিয়ে দেশে হাম ও সংশ্লিষ্ট জটিলতায় মোট মৃত্যুর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ৭৬ জনে। কেবল চলতি মাসেই এখন পর্যন্ত ৯৭ জনের প্রাণহানি ঘটেছে।
হাসপাতালগুলোর পরিসংখ্যানে দেখা যায়, গত সাড়ে পাঁচ মাসে সন্দেহজনক হাম নিয়ে ১ লাখ ৬২ হাজার ৪৮ জন রোগী বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। এদের মধ্যে যথাযথ চিকিৎসা শেষে ১ লাখ ৫৫ হাজার ৬১২ জন সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছেন।
বিভাগভিত্তিক সংক্রমণের চিত্রে দেখা যাচ্ছে, রাজধানীসহ ঢাকা বিভাগ এখন সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে। এলাকাভিত্তিক আক্রান্ত ও মৃত্যুর বিবরণ নিচে তুলে ধরা হলো:
-
ঢাকা বিভাগ: গত ২৪ ঘণ্টায় সর্বোচ্চ ৩৮২ জন হামের উপসর্গে আক্রান্ত হয়েছেন। একই সময়ে এই বিভাগে প্রাণ হারিয়েছেন ৬ জন, যার মধ্যে কেবল ঢাকা জেলাতেই মারা গেছেন ৫ জন।
-
চট্টগ্রাম বিভাগ: আক্রান্তের দিক থেকে দ্বিতীয় অবস্থানে থাকা এই বিভাগে ২৪ ঘণ্টায় ২৩৮ জন আক্রান্ত হয়েছেন এবং মারা গেছেন ২ জন।
-
খুলনা বিভাগ: নতুন আক্রান্তের পাশাপাশি হামের উপসর্গে ১ জনের মৃত্যু রেকর্ড করা হয়েছে।
-
রংপুর বিভাগ: এই বিভাগেও গত ২৪ ঘণ্টায় হামের উপসর্গে ১ জন প্রাণ হারিয়েছেন।
-
সিলেট বিভাগ: গত একদিনে হামের উপসর্গে ১ জনের মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করা হয়েছে।
বাংলাদেশের ইতিহাসে এর আগে কখনো একক কোনো বছরে হামে আক্রান্ত হয়ে এত শিশু ও রোগীর প্রাণহানির ঘটনা ঘটেনি। চলতি বছরের শুরু থেকেই সারাদেশে একটু একটু করে হামের সংক্রমণ বাড়তে শুরু করেছিল। তবে শুরুর দিকে রোগ প্রতিরোধ ও টিকাদান জোরদারে সমন্বিত ও কার্যকর কোনো সরকারি পদক্ষেপ না থাকায় পরবর্তীতে পরিস্থিতি মারাত্মক রূপ নেয়।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ এবং জাতিসংঘের একাধিক আন্তর্জাতিক সংস্থার পর্যালোচনায় উঠে এসেছে যে, পূর্ববর্তী অন্তর্বর্তী সরকারের সময় নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচিতে চরম অবহেলা ও মাঠপর্যায়ে তদারকির অভাবই মূলত আজকের এই মানবিক বিপর্যয়ের প্রধান কারণ। শিশুদের সময়মতো হামের টিকা (এমআর ভ্যাকসিন) না দেওয়া এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে স্বাস্থ্য সচেতনতা তৈরিতে ব্যর্থ হওয়ায় এই প্রতিরোধযোগ্য রোগটি দেশজুড়ে রেকর্ড ভয়াবহতায় ছড়িয়ে পড়েছে।


