ককপিটের লড়াইয়ে রক্ষা পেল ইসরায়েলগামী ফ্লাইদুবাই

দুবাই থেকে তেল আবিবগামী ফ্লাইদুবাইয়ের একটি যাত্রীবাহী উড়োজাহাজ মাঝ আকাশে ভয়াবহ পরিস্থিতির মুখে পড়ার পর যাত্রী ও ক্রুদের দ্রুত পদক্ষেপে বড় ধরনের দুর্ঘটনা এড়ানো গেছে। উড়োজাহাজটির সহকারী পাইলট মূল পাইলটকে ছুরিকাঘাত করার পর বিমানটি অস্বাভাবিকভাবে দ্রুত নিচে নামতে শুরু করে। পরে যাত্রী ও ক্রু সদস্যরা ককপিটে ঢুকে ওই সহকারী পাইলটকে নিয়ন্ত্রণে আনেন। উড়োজাহাজটি শেষ পর্যন্ত সৌদি আরবের তাবুক বিমানবন্দরে নিরাপদে অবতরণ করে।

ঘটনাটি নিয়ে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু বলেছেন, সহকারী পাইলট উড়োজাহাজটি বিধ্বস্ত করার চেষ্টা করেছিলেন বলে প্রাথমিকভাবে মনে হচ্ছে। তবে হামলার উদ্দেশ্য কী ছিল, এর পেছনে কোনো সংগঠন বা রাষ্ট্রের সংশ্লিষ্টতা রয়েছে কি না—এসব বিষয়ে এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায়নি। নেতানিয়াহু জানিয়েছেন, ঘটনার সব দিক খতিয়ে দেখা হচ্ছে এবং হামলাকারীর সঙ্গে অন্য কেউ যুক্ত ছিল কি না, সেটিও তদন্তে বেরিয়ে আসবে।

ঘটনাটি ঘটে ফ্লাইদুবাইয়ের এফজেড ১০৭৩ ফ্লাইটে। উড়োজাহাজটি দুবাই থেকে তেল আবিবের উদ্দেশে রওনা হয়েছিল। ফ্লাইট-ট্র্যাকিং তথ্য অনুযায়ী, ক্রুজিং উচ্চতায় ওঠার পর উড়োজাহাজটি হঠাৎ অস্বাভাবিকভাবে নিচে নামতে শুরু করে। এক পর্যায়ে মাত্র ৩০ সেকেন্ডেরও কম সময়ে এটি প্রায় ১৪ হাজার ফুট নিচে নেমে যায় বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। পরে উড়োজাহাজটির গতিপথে আরও কয়েক দফা অস্বাভাবিক ওঠানামা দেখা যায়।

এ সময় উড়োজাহাজটি প্রথমে ৭৭০০ নম্বর জরুরি সংকেত পাঠায়। এরপর ৭৫০০ সংকেত পাঠানো হয়, যা উড়োজাহাজে বেআইনি হস্তক্ষেপ বা সম্ভাব্য ছিনতাইয়ের পরিস্থিতি বোঝাতে ব্যবহৃত হয়। বিষয়টি নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হলে ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষও সতর্ক হয়ে ওঠে। পরে উড়োজাহাজটি তেল আবিবের পরিবর্তে সৌদি আরবের তাবুকের দিকে ঘুরে যায় এবং জরুরি অবতরণের অনুমতি চায়।

নেতানিয়াহুর বক্তব্য অনুযায়ী, সহকারী পাইলট প্রথমে মূল পাইলটকে ছুরিকাঘাত করেন। গুরুতর আহত হওয়ার পরও মূল পাইলট প্রতিরোধ করেন এবং ককপিটের দরজা খোলার সুযোগ তৈরি করেন। তখন কয়েকজন যাত্রী ও একজন ক্রু সদস্য দ্রুত ককপিটে ঢুকে হামলাকারীকে কাবু করেন। উড়োজাহাজটিতে থাকা আরও দুজন পাইলট পরে নিয়ন্ত্রণ নিয়ে বিমানটিকে তাবুকে নিরাপদে নামাতে সহায়তা করেন।

তাবুকে অবতরণের পর আহত পাইলট এবং সহকারী পাইলটকে চিকিৎসা দেওয়া হয়। হামলার সন্দেহে সহকারী পাইলটকে সৌদি কর্তৃপক্ষ আটক করে জিজ্ঞাসাবাদ শুরু করেছে বলে ইসরায়েলি পক্ষ জানিয়েছে। তার জাতীয়তা ও ঘটনার পেছনের উদ্দেশ্য নিয়েও তদন্ত চলছে। প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, তিনি ওমানের নাগরিক।

নেতানিয়াহু জানিয়েছেন, হামলার পেছনে ইরানের কোনো ভূমিকা ছিল কি না, সে বিষয়ে এই মুহূর্তে নিশ্চিতভাবে কিছু বলা যাচ্ছে না। তিনি বলেন, হামলাকারীর ‘শিকড়’ পর্যন্ত খুঁজে বের করার চেষ্টা করা হবে। তার কোনো সহযোগী ছিল কি না কিংবা কোনো সংগঠন বা রাষ্ট্র এ ঘটনার সঙ্গে যুক্ত ছিল কি না, তদন্তের মাধ্যমে তা পরিষ্কার হওয়ার কথা।

ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী আরও জানান, তিনি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে ঘটনাটি নিয়ে কথা বলেছেন। সংযুক্ত আরব আমিরাতের প্রেসিডেন্ট শেখ মোহাম্মদ বিন জায়েদের সঙ্গেও এ বিষয়ে যোগাযোগ হয়েছে। যেহেতু ফ্লাইটটি দুবাই থেকে যাত্রা করেছিল এবং সন্দেহভাজন সহকারী পাইলট সেখান থেকেই উড়োজাহাজে উঠেছিলেন, তাই তদন্তে সংযুক্ত আরব আমিরাতের অংশগ্রহণের বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

নেতানিয়াহু বলেছেন, প্রয়োজনে সন্দেহভাজন সহকারী পাইলটকে সংযুক্ত আরব আমিরাতে নেওয়া হতে পারে। ইসরায়েলও তদন্তে অংশ নেওয়ার বিষয়টি বিবেচনা করছে। তবে কোন দেশের কোন সংস্থা তদন্তের নেতৃত্ব দেবে এবং তদন্তের চূড়ান্ত ফল কী হবে, তা এখনো স্পষ্ট নয়।

ইসরায়েল ইতোমধ্যে ঘটনাটিকে গুরুতর নিরাপত্তা ঘটনা হিসেবে দেখছে এবং কর্মকর্তারা এটিকে সন্ত্রাসী হামলার চেষ্টা হিসেবে তদন্ত করছেন। তবে নেতানিয়াহু নিজেও হামলার উদ্দেশ্য সম্পর্কে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দেওয়ার আগে তদন্ত শেষ হওয়ার প্রয়োজনীয়তার কথা বলেছেন। একই সঙ্গে তিনি যাত্রী ও ক্রুদের দ্রুত পদক্ষেপের প্রশংসা করে বলেছেন, তাদের প্রতিক্রিয়ার কারণেই বড় ধরনের প্রাণহানি এড়ানো সম্ভব হয়েছে।

অন্যদিকে, ফ্লাইদুবাই ঘটনার কারণ সম্পর্কে আগাম কোনো সিদ্ধান্তে না পৌঁছানোর আহ্বান জানিয়েছে। বিমান সংস্থাটির ভাষ্য অনুযায়ী, উড়োজাহাজটি একটি গুরুতর ঘটনার কারণে তাবুকে জরুরি অবতরণ করলেও ঘটনার প্রকৃত কারণ তখনও তদন্তাধীন ছিল। যাত্রীদের নিরাপদে বের করে আনার পর বিকল্প ফ্লাইটের মাধ্যমে তাদের ইসরায়েলে পৌঁছে দেওয়া হয়।

ঘটনাটি শুধু একটি ফ্লাইটের নিরাপত্তা সংকট হিসেবেই নয়, আন্তর্জাতিক বেসামরিক বিমান চলাচলের নিরাপত্তা নিয়েও নতুন প্রশ্ন তুলেছে। বিশেষ করে ককপিটে কর্মরত কোনো সদস্য নিজেই যদি সহিংসতায় জড়িয়ে পড়েন, সে ক্ষেত্রে প্রচলিত নিরাপত্তাব্যবস্থা কতটা কার্যকর—এ নিয়ে বিমান চলাচল খাতে নতুন করে আলোচনা শুরু হতে পারে। তবে এ ঘটনায় নিরাপত্তাব্যবস্থার কোনো নির্দিষ্ট দুর্বলতা ছিল কি না, তা তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত নিশ্চিতভাবে বলা যাচ্ছে না।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, ফ্লাইটটি শেষ পর্যন্ত বিধ্বস্ত হয়নি এবং যাত্রীরা নিরাপদে সৌদি আরবে নামতে সক্ষম হন। যাত্রী ও ক্রুদের তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া, আহত মূল পাইলটের প্রতিরোধ এবং উড়োজাহাজে থাকা অন্য পাইলটদের সহায়তা—সব মিলিয়েই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসে। ঘটনার উদ্দেশ্য, হামলাকারীর সম্ভাব্য সহযোগী এবং কোনো আন্তর্জাতিক সংশ্লিষ্টতা ছিল কি না—এসব প্রশ্নের উত্তর এখন তদন্তের ওপরই নির্ভর করছে।

Tags :

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সর্বশেষ খবর

খবরওয়ালা একটি বিশ্বস্ত অনলাইন নিউজ পোর্টাল, যেখানে বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও আপডেট প্রকাশ করা হয়। রাজনীতি, জাতীয় ও স্থানীয় সংবাদ, শিক্ষা, খেলাধুলা, ব্যবসা, বিনোদন ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনের গুরুত্বপূর্ণ খবর নিয়ে পাঠকদের জন্য রয়েছে নির্ভরযোগ্য ও সময়োপযোগী সংবাদ পরিবেশন।

© ২০২৬ খবরওয়ালা। সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।