ডেঙ্গুর টিকা নিয়ে আপাতত সতর্ক অবস্থানে সরকার

ডেঙ্গু পরিস্থিতি উদ্বেগজনক হয়ে উঠলেও এখনই জাতীয় পর্যায়ে ডেঙ্গুর টিকা চালুর কথা ভাবছে না সরকার। স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন জানিয়েছেন, আন্তর্জাতিক পর্যায়ে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর অনুমোদন ও সুপারিশ পাওয়ার পরই এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।

তিনি বলেন, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও), ইউনিসেফ এবং গাভির মতো আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো ডেঙ্গুর টিকা ব্যবহারের বিষয়ে অনুমোদন বা সুপারিশ দিলে সরকার বিষয়টি নিয়ে পরবর্তী পদক্ষেপ বিবেচনা করবে। অর্থাৎ, আপাতত টিকা চালুর পরিবর্তে আন্তর্জাতিক স্বাস্থ্য নির্দেশনা ও বৈজ্ঞানিক মূল্যায়নের ওপরই গুরুত্ব দিচ্ছে সরকার।

বাংলাদেশে ডেঙ্গুর প্রকোপের মধ্যে স্বাস্থ্যমন্ত্রীর এই বক্তব্য এমন সময়ে এলো, যখন চলতি বছর রোগটির কারণে স্বাস্থ্যব্যবস্থার ওপর চাপ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। রয়টার্সের ১ অক্টোবরের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সেপ্টেম্বর ছিল ২০২৬ সালে বাংলাদেশের ডেঙ্গু পরিস্থিতির সবচেয়ে প্রাণঘাতী মাস। জানুয়ারি থেকে এ পর্যন্ত অন্তত ৭৯ হাজার ৬২০ জন ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন এবং ২৪৫ জনের মৃত্যু হয়েছে। শুধু সেপ্টেম্বরেই ১৪৮ জনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার বর্তমান নির্দেশনায় ডেঙ্গুর জন্য ব্যবহারের ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ টিকা হলো TAK-003 বা Qdenga। ২০২৪ সালের মে মাসে টিকাটি ডব্লিউএইচওর প্রিকোয়ালিফিকেশন পায়। সংস্থাটি উচ্চমাত্রার ডেঙ্গু সংক্রমণ রয়েছে—এমন এলাকায় ৬ থেকে ১৬ বছর বয়সী শিশুদের জন্য নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে এই টিকা ব্যবহারের সুপারিশ করেছে। টিকাটি দুই ডোজে দিতে হয় এবং দুই ডোজের মধ্যে অন্তত তিন মাসের ব্যবধান রাখার পরামর্শ রয়েছে।

তবে ডব্লিউএইচও স্পষ্ট করেছে, ডেঙ্গুর টিকা রোগ প্রতিরোধের একমাত্র উপায় নয়। টিকা ব্যবহারের পাশাপাশি মশার প্রজননস্থল ধ্বংস, রোগীর দ্রুত শনাক্তকরণ ও যথাযথ চিকিৎসা, জনসচেতনতা এবং স্থানীয় পর্যায়ে মশা নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রম চালিয়ে যেতে হবে। কারণ টিকা সব ধরনের ডেঙ্গু সংক্রমণ ঠেকাতে সক্ষম নয়।

টিকা ব্যবহারের ক্ষেত্রেও কিছু সীমাবদ্ধতা রয়েছে। ডব্লিউএইচওর সুপারিশ অনুযায়ী, উচ্চ সংক্রমণ পরিস্থিতির বাইরে TAK-003-এর নিয়মিত ব্যবহার বর্তমানে সমর্থিত নয়। ছয় বছরের কম বয়সী শিশুদের ক্ষেত্রেও এই টিকার নিয়মিত ব্যবহারের সুপারিশ নেই। গর্ভাবস্থা, স্তন্যদান এবং নির্দিষ্ট ধরনের রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা-সংক্রান্ত অবস্থার ক্ষেত্রেও টিকাটি ব্যবহারে বিধিনিষেধ রয়েছে।

ডেঙ্গুর টিকা নিয়ে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে নিরাপত্তা ও কার্যকারিতা নিয়েও পর্যবেক্ষণ অব্যাহত রয়েছে। ডব্লিউএইচওর ভ্যাকসিন সেফটি কমিটি Qdenga ব্যবহারের পর ব্রাজিলে অ্যানাফাইল্যাক্সিসসহ কিছু অতিসংবেদনশীল প্রতিক্রিয়ার তথ্য পর্যালোচনা করেছে। সংস্থাটি এসব তথ্যের ভিত্তিতে নিরাপত্তা পর্যবেক্ষণ ও প্রয়োজনীয় সতর্কতামূলক ব্যবস্থা গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করছে।

ফলে বাংলাদেশে ডেঙ্গুর টিকা চালুর সিদ্ধান্ত কেবল দেশে রোগীর সংখ্যা বা সংক্রমণের তীব্রতার ওপর নির্ভর করবে না। স্থানীয় পর্যায়ে ডেঙ্গু সংক্রমণের ধরন, কোন বয়সের মানুষ বেশি ঝুঁকিতে, টিকার কার্যকারিতা ও নিরাপত্তা, টিকা দেওয়ার অবকাঠামো এবং আন্তর্জাতিক স্বাস্থ্য সংস্থাগুলোর সুপারিশ—সবকিছু বিবেচনায় নিতে হবে।

স্বাস্থ্যমন্ত্রীর বক্তব্য থেকে আপাতত যে বিষয়টি স্পষ্ট, তা হলো সরকার ডেঙ্গুর টিকা চালুর ক্ষেত্রে তাড়াহুড়ো করতে চাইছে না। আন্তর্জাতিকভাবে গ্রহণযোগ্য নির্দেশনা ও অনুমোদন পাওয়ার পর পরিস্থিতি মূল্যায়ন করে পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেওয়ার পথেই এগোতে চায় সরকার।

Tags :

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সর্বশেষ খবর

খবরওয়ালা একটি বিশ্বস্ত অনলাইন নিউজ পোর্টাল, যেখানে বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও আপডেট প্রকাশ করা হয়। রাজনীতি, জাতীয় ও স্থানীয় সংবাদ, শিক্ষা, খেলাধুলা, ব্যবসা, বিনোদন ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনের গুরুত্বপূর্ণ খবর নিয়ে পাঠকদের জন্য রয়েছে নির্ভরযোগ্য ও সময়োপযোগী সংবাদ পরিবেশন।

© ২০২৬ খবরওয়ালা। সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।