পার্বত্য জেলা বান্দরবানে হঠাৎ করে তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাসের (এলপিজি) তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে। রান্নার গ্যাসের এই আকস্মিক ঘাটতিকে পুঁজি করে একশ্রেণির অসাধু ব্যবসায়ী সিন্ডিকেট গড়ে তুলেছেন। সরকার নির্ধারিত মূল্যের তোয়াক্কা না করে দ্বিগুণ দামে বিক্রি করা হচ্ছে ১২ কেজি ওজনের এলপিজি সিলিন্ডার। এর সাথে যুক্ত হয়েছে নতুন সিলিন্ডার কেনার বাধ্যবাধকতা। রিফিল সিলিন্ডার না পেয়ে বিপাকে পড়েছেন হাজার হাজার সাধারণ গ্রাহক ও গৃহিণী।
ভোক্তা অধিকার ও স্থানীয় সূত্রের তথ্যমতে, বর্তমানে সরকার নির্ধারিত ১২ কেজির একটি এলপিজি সিলিন্ডারের অফিশিয়াল খুচরা মূল্য ১ হাজার ৮৫০ টাকা। অথচ বান্দরবান জেলা শহরের বাজারগুলোতে তা প্রকাশ্যে ৩ হাজার ৩০০ থেকে সাড়ে ৩ হাজার টাকায় বিক্রি করা হচ্ছে। কেবল বাড়তি দাম দিয়েই মিলছে না কাঙ্ক্ষিত গ্যাস। অনেক ব্যবসায়ী খালি সিলিন্ডার জমা নিয়ে গ্যাসভর্তি সিলিন্ডার দিতে সরাসরি অস্বীকৃতি জানাচ্ছেন। ফলে সাধারণ গ্রাহকরা বাধ্য হয়ে চড়া দামে গ্যাসের সঙ্গে অনাবশ্যক নতুন সিলিন্ডার কিনতে বাধ্য হচ্ছেন।
সোমবার (৫ অক্টোবর ২০২৬) বান্দরবান শহরের বিভিন্ন এলপিজি বিক্রয়কেন্দ্রে সরেজমিনে গিয়ে এক অস্বাভাবিক চিত্র দেখা যায়। ডিলার ও খুচরা বিক্রেতাদের অনেক দোকান বাইরে থেকে তালাবদ্ধ ঝুলছে। তবে বাইরে তালা থাকলেও ভেতরের বাতি জ্বলছে এবং ভেতরে সিলিন্ডারের পর্যাপ্ত মজুত চোখে পড়ে। অভিযোগ রয়েছে, দোকানে তালা ঝুলিয়ে রেখে পেছনে গোপন যোগাযোগের মাধ্যমে কালোবাজারিতে চড়া দামে সিলিন্ডার বিক্রি করছেন অসাধু ব্যবসায়ীরা।
গ্যাস সংকটে সাধারণ মানুষের চরম ভোগান্তির চিত্র উঠে এসেছে বান্দরবান সদরের মধ্যমপাড়ার বাসিন্দা ইম্মা মারমার কথায়। তিনি জানান, রবিবার বিকেলে রান্নার সময় হঠাৎ তাদের বাসার এলপিজি শেষ হয়ে যায়। এরপর তার স্বামী শহরের বিভিন্ন দোকানে কল করে সিলিন্ডারের খোঁজ নিলে কোনো বিক্রেতাই খালি সিলিন্ডারের বদলে রিফিল দিতে রাজি হননি।
ইম্মা মারমা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ব্যবসায়ীরা সাফ জানিয়ে দিয়েছে, গ্যাস নিতে হলে সাড়ে তিন হাজার টাকা দিয়ে নতুন সিলিন্ডারসহ কিনতে হবে। সাধ্যের বাইরে হওয়ায় সিলিন্ডার না কিনে ফিরে আসতে হয়। ফলে গত দুই দিন ধরে তাদের বাসায় চুলা জ্বলেনি। ঘরে থাকা সাড়ে তিন বছর বয়সী ছেলে ও সাড়ে সাত মাসের শিশুসন্তানকে রাতে না খাইয়ে ঘুম পাড়াতে হয়েছে এবং অষ্টম শ্রেণিতে পড়ুয়া বড় মেয়ে সকালে কিছু না খেয়েই খালি পেটে স্কুলে যেতে বাধ্য হয়েছে।
ভোক্তা সেজে কয়েকজন এলপিজি ডিলার ও খুচরা বিক্রেতার সঙ্গে ফোনে কথা বললে তারা জানান, বর্তমানে খালি সিলিন্ডারের বদলে সিলিন্ডার রিফিল দেওয়ার মতো গ্যাস তাদের কাছে নেই। গ্যাস পেতে হলে গ্রাহককে বাধ্য হয়েই নতুন সিলিন্ডার কিনতে হবে, যার দাম হাঁকা হচ্ছে ৩ হাজার ৩০০ থেকে ৩ হাজার ৫০০ টাকা।
পাহাড়ের স্থানীয় পরিবেশক উজানীপাড়ার এম ও এন্টারপ্রাইজের মালিক রাকিব জানান, এলপিজি পেতে গ্রাহকদের নতুন সিলিন্ডার কেনা ছাড়া উপায় নেই। তারা নতুন সিলিন্ডারের অতিরিক্ত দাম নিচ্ছেন দেড় হাজার টাকা। বাজারে বসুন্ধরাসহ প্রধান প্রধান কোম্পানিগুলোর গ্যাসের কোনো সরবরাহ নেই বলেও দাবি করেন তিনি।
অন্যদিকে এভারগ্রিন এন্টারপ্রাইজের গ্যাস সরবরাহকারী কর্মী ওসমান বলেন, তাদের প্রতিষ্ঠানে বর্তমানে কেবল ইন্ডিপেন্ডেন্টের ‘আই গ্যাস’ নামের এলপিজি সিলিন্ডার মজুত রয়েছে। অন্যান্য স্বনামধন্য কোম্পানির এলপিজি সাপ্লাই পুরোপুরি বন্ধ। সে কারণে অন্য কোম্পানির খালি সিলিন্ডার জমা নিয়ে রিফিল করা সম্ভব হচ্ছে না। সম্পূর্ণ নতুন আই গ্যাসের সিলিন্ডার কিনতে গ্রাহককে গুনতে হচ্ছে সাড়ে তিন হাজার টাকা।
সিন্ডিকেটের মাধ্যমে কৃত্রিম সংকট তৈরি করে এলপিজির এমন আকাশচুম্বী দাম হাঁকানো এবং ভোক্তাদের নতুন সিলিন্ডার কিনতে বাধ্য করার ঘটনায় বান্দরবানজুড়ে তীব্র সামাজিক ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। সাধারণ মানুষ এই অসাধু চক্রের বিরুদ্ধে স্থানীয় জেলা প্রশাসন ও ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের জরুরি বাজার মনিটরিং ও কঠোর আইনি পদক্ষেপ দাবি করেছেন।


