যুক্তরাষ্ট্রের টেনেসিতে প্রাণঘাতী ইনজেকশনের মাধ্যমে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের দুই দফা চেষ্টা ব্যর্থ হওয়ার কয়েক দিন পর চেতনা ফিরেছে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত ক্রিস্টা পাইকের। ৫০ বছর বয়সী পাইক এখন কথা বলতে পারছেন এবং হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন বলে জানিয়েছেন তার আইনজীবীরা। তবে তার শারীরিক অবস্থার ভবিষ্যৎ নিয়ে এখনো নিশ্চিত কোনো ধারণা দিতে পারছেন না চিকিৎসক ও আইনজীবীরা।
মঙ্গলবার এক বিবৃতিতে পাইকের আইনজীবীরা জানান, তিনি বর্তমানে হাসপাতালে হাতকড়া পরা অবস্থায় চিকিৎসা নিচ্ছেন। মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের ব্যর্থ প্রচেষ্টার পর কয়েক দিন তিনি অচেতন ছিলেন। এ সময় চিকিৎসাকর্মীরা তার শরীরে প্রবেশ করানো রাসায়নিক পদার্থের প্রভাব মোকাবিলা এবং সেগুলো শরীর থেকে বের করে দেওয়ার চেষ্টা করেন।
১৯৯৫ সালে ১৯ বছর বয়সী কলিন স্লেমারকে হত্যার দায়ে পাইককে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। হত্যাকাণ্ডের সময় পাইকের বয়স ছিল মাত্র ১৮ বছর। মামলার তথ্য অনুযায়ী, তৎকালীন প্রেমিক ট্যাডারিল শিপের সঙ্গে তিনি স্লেমারকে মারধর, নির্যাতন ও হত্যার ঘটনায় জড়িত ছিলেন। একটি সমস্যাগ্রস্ত কিশোর-কিশোরীদের জন্য আয়োজিত কর্মপ্রশিক্ষণ শিবিরে পাইক, শিপ ও স্লেমারের পরিচয় হয়েছিল।
গত বুধবার টেনেসিতে পাইকের মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের উদ্যোগ নেওয়া হয়। এ জন্য প্রাণঘাতী ইনজেকশন ব্যবহার করা হয়। কিন্তু পরপর দুইবার চেষ্টা করেও প্রক্রিয়াটি সফল হয়নি। এরপর তাকে হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়। সেখানে কয়েক দিন অচেতন থাকার পর অবশেষে তার জ্ঞান ফেরে এবং তিনি কথা বলতে শুরু করেন।
পাইকের আইনজীবীরা তার শারীরিক অবস্থার উন্নতিকে চিকিৎসাবিজ্ঞানের দৃষ্টিতে অত্যন্ত বিরল ও নজিরবিহীন ঘটনা হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তবে এখনই তার দীর্ঘমেয়াদি শারীরিক অবস্থার বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছানো সম্ভব নয় বলে তারা জানিয়েছেন। তাদের আশা, অন্তত আগামী দিনগুলোতে পাইকের শারীরিক অবস্থার আরও উন্নতি হবে এবং দীর্ঘ সময় ধরে তার সুস্থ হওয়ার প্রক্রিয়া চলবে।
ঘটনাটি মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের ইতিহাস নিয়েও নতুন করে আলোচনা তৈরি করেছে। ফোর্ডহ্যাম ল স্কুলের অপরাধবিজ্ঞানী ও অধ্যাপক ডেবোরা ডেনো বলেছেন, পাইকের জ্ঞান ফিরে আসা এবং তার কথা বলতে পারার খবর তাকে বিস্মিত করেছে। তার মতে, অতীতে আরও সাতটি ঘটনায় মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের নির্ধারিত সময় পার হওয়ার পর বন্দিরা বেঁচে গিয়েছিলেন।
তবে ওই ঘটনাগুলোর সঙ্গে পাইকের পরিস্থিতির বড় পার্থক্য রয়েছে। ডেনোর ভাষ্য অনুযায়ী, আগের ঘটনাগুলোতে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তারা বন্দিদের শিরায় কোনো ওষুধই প্রবেশ করাতে পারেননি। পাইকের ক্ষেত্রে তার শরীরে প্রাণঘাতী রাসায়নিক প্রবেশ করানো হয়েছিল। অর্থাৎ মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের প্রক্রিয়ায় প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হলেও শেষ পর্যন্ত তা প্রত্যাশিত ফল দেয়নি।
পাইকের শরীরে পেন্টোবারবিটাল নামের রাসায়নিক দেওয়ার পর ঠিক কী কারণে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা সম্ভব হয়নি, সে বিষয়ে টেনেসির কর্তৃপক্ষ এখনো কোনো ব্যাখ্যা দেয়নি। একইভাবে, তার মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের জন্য ভবিষ্যতে আবার চেষ্টা করা হবে কি না, সেটিও জানানো হয়নি।
এদিকে টেনেসির গভর্নর বিল লি এ বছরের বাকি সময়ের জন্য রাজ্যে সব মৃত্যুদণ্ড কার্যকর স্থগিত করেছেন। ফলে পাইকের মামলায় পরবর্তী পদক্ষেপ কী হবে, তা এখনো স্পষ্ট নয়।
বুধবার ন্যাশভিলের আদালতে পাইকের আইনজীবীদের হাজির হওয়ার কথা রয়েছে। আদালতের বাইরে তারা একটি সংবাদ সম্মেলনও করার পরিকল্পনা করেছেন। সেখানে পাইকের বর্তমান শারীরিক অবস্থা এবং ব্যর্থ মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের ঘটনা নিয়ে আরও তথ্য তুলে ধরা হতে পারে।
পাইকের প্রতিরক্ষা দলের পরামর্শক অ্যানেসথেসিওলজিস্ট ড. জোয়েল জিভট মঙ্গলবার বলেছেন, প্রাণঘাতী ইনজেকশনের পর কোনো ব্যক্তির বেঁচে যাওয়ার সম্ভাবনা অত্যন্ত কম। ফলে রাসায়নিক প্রয়োগের পর পাইকের চেতনা ফিরে পাওয়া এবং কথা বলতে পারার ঘটনা যে অত্যন্ত বিরল, তা নিয়ে বিশেষজ্ঞদের মধ্যে খুব একটা দ্বিমত নেই।
এখন মূল প্রশ্ন দুটি—পাইকের শারীরিক অবস্থার কতটা উন্নতি হবে এবং তার মৃত্যুদণ্ড নিয়ে কর্তৃপক্ষ পরবর্তী সময়ে কী সিদ্ধান্ত নেবে। তবে আপাতত হাসপাতালে চিকিৎসাধীন পাইকের ক্ষেত্রে সবচেয়ে তাৎক্ষণিক বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে তার সুস্থ হয়ে ওঠা।


