রাজধানীর পশ্চিম রামপুরার ভাড়া বাসায় বসে কথা বলার সময় মুঠোফোনে থাকা ছবিগুলো একে একে দেখাচ্ছিল আরফা। কোথাও বাবার সঙ্গে তার ছবি, কোথাও মা-বাবার বিয়ের ছবি। এরপর একটি কবরের ছবি দেখিয়ে বলল, ‘এটা মায়ের কবর।’ আরেকটি ছবি বের করে জানাল, সেটি বাবার কবর। ছোট্ট বয়সেই সে জেনে গেছে—মাকে নড়াইলে তাঁর স্বজনদের কাছে এবং বাবাকে বাবার বাড়িতে দাফন করা হয়েছে।
কথার একপর্যায়ে মন খারাপ হয়ে গেলেও প্রিয় বিড়াল ‘ভুতুম’কে কোলে নিয়ে আবার স্বাভাবিক হয়ে যায় আরফা। কিছুক্ষণ পর রংপেনসিল নিয়ে বসে পড়ে ছবি আঁকতে। শিশুর স্বাভাবিক আনন্দ আর গভীর শোক—দুই বিপরীত অনুভূতিই যেন পাশাপাশি বাস করছে তার ছোট্ট জীবনে।
আরফা রাজধানীর রামপুরা একরামুন্নেছা বালিকা উচ্চবিদ্যালয়ের তৃতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থী। আগে বাবা ও দাদির সঙ্গে স্কুলে যেত। এখন বাবার জায়গাটি শূন্য। দাদিই তাকে স্কুলে নিয়ে যান।
জন্মের পরই মাকে হারানো
তাজুল ইসলাম ও মারুফা আক্তার দুজনই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ছিলেন। তাঁদের পরিচয় থেকে প্রেম, পরে পারিবারিকভাবে বিয়ে। ২০১৪ সালে তাঁদের বিয়ে হয়। ২০১৮ সালের ১৩ ফেব্রুয়ারি তাঁদের মেয়ে আরফার জন্ম। কিন্তু সন্তান জন্ম দেওয়ার পরই গুরুতর শারীরিক জটিলতায় পড়েন মারুফা। নড়াইল থেকে যশোরে নেওয়ার পথে অ্যাম্বুলেন্সেই তাঁর মৃত্যু হয়।
জন্মের মাত্র তিন দিন পর মাকে হারায় আরফা। পরে শফিকুল ইসলামসহ পরিবারের অন্য সদস্যরা তাকে ঢাকায় নিয়ে আসেন। সেই থেকে দাদি সখিনা বেগমই অনেকটা মায়ের মতো করে নাতনিকে বড় করেছেন।
স্বামীর মৃত্যুর পর তাজুল ইসলাম আর বিয়ে করেননি। বড় ভাই শফিকুল ইসলামের ভাষ্য, মেয়ের কথা ভেবেই তিনি নতুন করে সংসার করার সিদ্ধান্ত নেননি। নিজের মেয়ের জন্য মা ও বাবার—দুই ভূমিকাই পালন করার চেষ্টা করেছেন। মেয়েকে দোকানে নিয়ে যেতেন, ঘুরতে নিয়ে যেতেন, মাঝেমধ্যে টাকা দিতেন।
আরফার কথাতেও বাবার সেই উপস্থিতির স্মৃতি স্পষ্ট। বাবার দোকানে যাওয়া, বাবার কাছ থেকে টাকা পাওয়া, বাবার সঙ্গে ঘুরতে যাওয়া—সবই তার মনে আছে। মে মাসেও বাবা তাকে ঘুরতে নিয়ে গিয়েছিলেন। হাসপাতালে আইসিইউতে থাকা অবস্থাতেও তাজুল মেয়েকে আশ্বস্ত করেছিলেন, তাঁর তেমন কিছু হয়নি, সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরবেন।
কিন্তু সেই প্রতিশ্রুতি আর পূরণ হয়নি।
নানা রোগের পর ডেঙ্গুতে মৃত্যু
পরিবারের ভাষ্য অনুযায়ী, তাজুল ইসলাম নিজের স্বাস্থ্য নিয়ে খুব একটা সচেতন ছিলেন না। জীবনে যক্ষ্মা, করোনাভাইরাস ও চিকুনগুনিয়ায় আক্রান্ত হয়েছিলেন। শেষ পর্যন্ত ডেঙ্গুতে তাঁর মৃত্যু হয়।
তাজুলের বড় ভাই শফিকুল ইসলাম বলেন, স্ত্রী মারা যাওয়ার পর থেকেই ভাইটি মানসিকভাবে বিপর্যস্ত ছিলেন। মেয়েকে ঘিরেই ছিল তাঁর জীবন। কিন্তু নিজের ভবিষ্যৎ বা মেয়ের ভবিষ্যতের জন্য উল্লেখযোগ্য কোনো সঞ্চয় করে যেতে পারেননি।
তাজুল একটি মুদিদোকান চালানোর পাশাপাশি ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশের (টিসিবি) ডিলার ছিলেন। পরিবারের সঙ্গে একই বাসায় থাকতেন তাঁর মেয়ে, এক ভাইয়ের পরিবার এবং মা-বাবা। পাশের বাসাতেই থাকেন বড় ভাই শফিকুল ইসলাম।
তাজুলের মৃত্যুর পর নতুন সংকট দেখা দিয়েছে আর্থিক দিক থেকেও। তাঁর কাছে পাওনা রয়েছে—এমন দাবি নিয়ে লোকজন আসছেন। পরিবারকে সেসব দেনা পরিশোধের চেষ্টা করতে হচ্ছে। বিপরীতে তাজুল নিজে কারও কাছে টাকা পেতেন কি না, সে সম্পর্কে পরিবারের কাছে স্পষ্ট কোনো হিসাব নেই। ফলে আরফার ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ আরও বেড়েছে।
‘বাবা ছাড়া কিছুই ভালো লাগে না’
বাবাকে হারানোর কথা বলতে গিয়ে আরফা বলেছে, ‘বাবার দোকানে যাইতাম। বাবা মাঝেমধ্যে টাকা দিত। বাবা ঘুরতে নিয়া যাইত।’
বাবার সঙ্গে কাটানো সময়ের কথা বলতে গিয়ে শিশুটির কণ্ঠে ফিরে আসে অভাবের অনুভূতি। বাবার সঙ্গে ঘোরাঘুরি, দোকানে যাওয়া কিংবা বাবার কাছ থেকে আদর পাওয়ার ছোট ছোট স্মৃতিই এখন তার কাছে সবচেয়ে বড় সম্পদ।
সে বলেছে, ‘বাবা হাসপাতালের আইসিইউতেও বলছিল, তার বেশি কিছু হয় নাই, বাসায় আইসা পড়ব। এখন বাবা ছাড়া কিছুই ভালো লাগে না।’
এই বয়সে একজন শিশুর কাছে মা-বাবার অনুপস্থিতি কেবল আবেগের শূন্যতা নয়। নিরাপত্তা, পড়াশোনা, বেড়ে ওঠা এবং ভবিষ্যৎ—সবকিছুর সঙ্গেই বিষয়টি জড়িয়ে থাকে। আরফার ক্ষেত্রে সেই অনিশ্চয়তা আরও তীব্র, কারণ তার জীবনে মা-বাবা দুজনেরই জায়গা এখন স্থায়ীভাবে শূন্য।
‘আমারও তো বয়স হইছে’
নাতনির ভবিষ্যৎ নিয়ে দাদি সখিনা বেগমের উদ্বেগও স্পষ্ট। বয়স হয়েছে তাঁর। আগামী দিনে কী হবে, সেই নিশ্চয়তা নেই। তাই আরফা আরেকটু বড় হলে হয়তো কিছুটা নিশ্চিন্ত হওয়া যেত—এমন আক্ষেপ তাঁর কথায়।
তিনি বলেন, তাঁর ছেলেরা ভালোভাবে পড়াশোনা করেছেন এবং হালাল উপার্জন করেন। কিন্তু তাঁদের আর্থিক সামর্থ্য সীমিত। তাই নাতনির ভবিষ্যতের জন্য সরকারি বা অন্য কোনো সহায়তা এলে তিনি তা গ্রহণ করবেন।
শফিকুল ইসলামও পরিবারের এই অসহায় অবস্থার কথা তুলে ধরেছেন। তিন ভাই ও এক বোনের মধ্যে তাজুল ছিলেন ছোট। ভাইকে হারানোর জন্য তাঁরা প্রস্তুত ছিলেন না। বিশেষ করে ডেঙ্গুর মতো মশাবাহিত একটি রোগে তাঁর মৃত্যু পরিবারের কাছে বড় ধাক্কা হয়ে এসেছে।
শফিকুলের প্রশ্ন, ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে নানা উদ্যোগের কথা বলা হলেও সাধারণ মানুষ তার সুফল কতটা পাচ্ছে। তাঁর নিজের পরিবারের অভিজ্ঞতায়, একটি মশাবাহিত রোগই এক শিশুকে মা-বাবাহীন করে দিয়েছে।
এখন ভরসা দাদি ও চাচারা
বাবার মৃত্যুর পর আরফাকে বারবার আশ্বস্ত করছেন দাদি ও চাচারা। তাঁরা বলছেন, পরিবারের মানুষ তাকে দেখবেন, পড়াশোনা চালিয়ে যাবেন এবং একা হতে দেবেন না। কিন্তু তাঁরা নিজেরাও জানেন, বাবার জায়গা কেউ পূরণ করতে পারবেন না।
কথা বলার সময় আরফার কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে খুব সাধারণ কিছু বিষয়। স্কুল, বন্ধু, আঁকাআঁকি আর প্রিয় বিড়াল ভুতুম। এসবের মধ্যেই সে নিজের মতো করে স্বাভাবিক থাকার চেষ্টা করছে।
একপর্যায়ে ক্ষুধার কথা জানালে দাদি সখিনা বেগম মুরগির মাংস ও আলুর ঝোল দিয়ে ভাত মেখে নাতনির পাশে বসেন। নিজের হাতে খেলে আরফা ঠিকমতো খেতে চায় না—তাই দাদি মুখে তুলে খাওয়ান। নাতনির পেট ভরে খাওয়াটুকুই যেন এই মুহূর্তে তাঁর কাছে সবচেয়ে জরুরি দায়িত্ব।
মা-বাবার স্মৃতি আর পরিবারের সীমিত সামর্থ্যকে সঙ্গে নিয়ে আরফার সামনে এখন দীর্ঘ পথ। সেই পথের শুরুতেই তার সবচেয়ে বড় প্রয়োজন নিরাপদ আশ্রয়, পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়ার সুযোগ এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে একটি স্থির নিশ্চয়তা। তার ছোট্ট জীবনে যে শূন্যতা তৈরি হয়েছে, তা পূরণ করা সম্ভব নয়; তবে পাশে দাঁড়ানো মানুষের সংখ্যা বাড়লে সেই শূন্যতার ভার কিছুটা হলেও বহন করা সম্ভব।


