স্মরণে ভাষার অধিকারের লড়াইয়ে এক নির্ভীক নাম—আবদুল মতিন

বাংলা ভাষার মর্যাদা ও অধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রামের ইতিহাসে যে ক’জন সাহসী ছাত্রনেতার নাম চিরদিন উচ্চারিত হবে, তাঁদের অন্যতম ভাষাসৈনিক আবদুল মতিন। তিনি শুধু ভাষা আন্দোলনের একজন সক্রিয় কর্মী ছিলেন না—ছিলেন সেই ঐতিহাসিক আন্দোলনের অন্যতম সংগঠক ও সম্মুখসারির নেতৃত্বদানকারী। মানুষের ভালোবাসায় তিনি পরিচিত হয়ে উঠেছিলেন ‘ভাষা মতিন’ নামে।

আবদুল মতিন জন্মগ্রহণ করেন ৩ ডিসেম্বর ১৯২৬ সালে সিরাজগঞ্জের চৌহালি উপজেলার ধুবালীয়া গ্রামের এক মধ্যবিত্ত কৃষক পরিবারে। তাঁর বাবা আবদুল জলিল এবং মা আমেনা খাতুন। মেধা, সাহস, অন্যায়ের বিরুদ্ধে আপসহীনতা এবং মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার আকাঙ্ক্ষা—কৈশোর থেকেই তাঁর ব্যক্তিত্বের গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হয়ে উঠেছিল।

পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পরপরই যখন বাঙালির মাতৃভাষা বাংলাকে উপেক্ষা করে উর্দুকে একমাত্র রাষ্ট্রভাষা করার ষড়যন্ত্র শুরু হয়, তখন তরুণ আবদুল মতিন প্রতিবাদী হয়ে ওঠেন। ১৯৪৮ সালের ভাষা আন্দোলনের সূচনাপর্ব থেকেই তিনি সক্রিয়ভাবে যুক্ত ছিলেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাবর্তনে মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ যখন উর্দুকে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা করার কথা পুনর্ব্যক্ত করেন, তখন আবদুল মতিন প্রকাশ্যেই প্রতিবাদ জানিয়েছিলেন।

ভাষার দাবিকে সংগঠিত আন্দোলনে রূপ দেওয়ার ক্ষেত্রে তাঁর ভূমিকা ছিল অসামান্য। ১৯৫১ সালের ১১ মার্চ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম কমিটির আহ্বায়ক নির্বাচিত হন তিনি। পরবর্তী সময়ে তিনি সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনের কর্মপরিষদের সঙ্গেও যুক্ত হন।

১৯৫২ সালের জানুয়ারিতে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী খাজা নাজিমুদ্দীন যখন আবারও ঘোষণা করলেন—উর্দুই হবে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা—তখন পূর্ববাংলার ছাত্রসমাজ ও সাধারণ মানুষের ক্ষোভ বিস্ফোরিত হয়ে ওঠে। ২০ ফেব্রুয়ারি সরকার ঢাকায় ১৪৪ ধারা জারি করে সভা-সমাবেশ ও মিছিল নিষিদ্ধ করে। রাজনৈতিক নেতৃত্বের একাংশ তখন সংঘাত এড়াতে ১৪৪ ধারা না ভাঙার পক্ষে অবস্থান নেয়। কিন্তু ছাত্রসমাজ সেই সিদ্ধান্ত মেনে নেয়নি।

২১ ফেব্রুয়ারি ১৯৫২।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আমতলায় ছাত্রদের ঐতিহাসিক সভায় আবদুল মতিন ও গাজীউল হক ১৪৪ ধারা ভাঙার পক্ষে দৃঢ় অবস্থান নেন। শেষ পর্যন্ত ছাত্ররা ১৪৪ ধারা অমান্য করে মিছিল নিয়ে রাজপথে বেরিয়ে আসে। সেই মিছিলের ওপর পাকিস্তানি পুলিশ গুলি চালায়। রফিক, জব্বার, বরকতসহ অনেকেই শহীদ হন; পরে সালামসহ আরও অনেকে প্রাণ হারান। রক্তে রঞ্জিত হয় ঢাকার রাজপথ।

সেদিনের সেই রক্তাক্ত প্রতিবাদ কেবল একটি ভাষার অধিকার প্রতিষ্ঠার আন্দোলন ছিল না; তা হয়ে উঠেছিল বাঙালির আত্মপরিচয়, সাংস্কৃতিক মর্যাদা ও রাজনৈতিক অধিকার প্রতিষ্ঠার এক ঐতিহাসিক সূচনা। একুশের চেতনা পরবর্তী সময়ে স্বাধিকার আন্দোলন, ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান এবং একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের পথকে গভীরভাবে প্রভাবিত করে। আজকের বাংলাদেশ নির্মাণের দীর্ঘ অভিযাত্রায় তাই ভাষা মতিনের ভূমিকা এক অনিবার্য অধ্যায়।

ভাষা আন্দোলনের পরও থেমে থাকেননি আবদুল মতিন। ১৯৫২ সালের এপ্রিল মাসে ছাত্র ইউনিয়ন গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন এবং পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়নের দ্বিতীয় সভাপতি নির্বাচিত হন। পরবর্তী জীবনে তিনি বামপন্থী রাজনীতি ও বিভিন্ন গণআন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। রাজনীতির পথ কখনোই তাঁর জন্য সহজ ছিল না; কারাবরণ, বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বহিষ্কারসহ নানা প্রতিকূলতার মধ্য দিয়েও তিনি নিজের বিশ্বাস ও আদর্শ থেকে সরে আসেননি।

আবদুল মতিন ছিলেন একজন লেখক ও চিন্তাশীল মানুষও। ভাষা আন্দোলন, বাঙালির জাতিসত্তা, ইতিহাস ও সমাজ-রাজনীতি নিয়ে তিনি একাধিক গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থ রচনা করেছেন। তাঁর উল্লেখযোগ্য বইয়ের মধ্যে রয়েছে—‘ভাষা ও একুশের আন্দোলন’, ‘ভাষা আন্দোলন কি এবং তাতে কি ছিল’, ‘ভাষা আন্দোলন: ইতিহাস ও তাৎপর্য’ (আহমদ রফিকের সঙ্গে), ‘বাঙালি জাতির উৎস সন্ধান ও ভাষা আন্দোলন’ এবং ‘জীবন পথের বাঁকে বাঁকে’।

ভাষা আন্দোলনে অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ ২০০১ সালে তিনি একুশে পদকে ভূষিত হন। ২০০৮ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় তাঁকে সম্মানসূচক ডক্টর অব লজ ডিগ্রি প্রদান করে।

জীবনের শেষ প্রান্তেও তিনি মানবিকতার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত রেখে গেছেন। মৃত্যুর পর তাঁর চোখ ও দেহ দান করার ইচ্ছা তিনি বাস্তবায়ন করে গেছেন—তাঁর দান করা কর্নিয়ায় অন্য একজন মানুষ পৃথিবীর আলো দেখেছেন। যেন মৃত্যুর পরও তিনি আলো বিলিয়ে গেছেন মানুষের জীবনে।

৮ অক্টোবর ২০১৪, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ৮৭ বছর বয়সে প্রয়াত হন এই কিংবদন্তি ভাষাসৈনিক। তাঁর চলে যাওয়া একটি জীবনের অবসান, কিন্তু তাঁর সংগ্রাম, সাহস ও আদর্শের মৃত্যু নেই।

আবদুল মতিন আমাদের মনে করিয়ে দেন—
মাতৃভাষা শুধু কথা বলার মাধ্যম নয়; ভাষা মানুষের আত্মপরিচয়, আত্মমর্যাদা ও অস্তিত্বের অবিচ্ছেদ্য অংশ। সেই ভাষার অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য যে মানুষটি একদিন পাকিস্তানি শাসকের নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে রাজপথে নেমেছিলেন, তাঁর নাম তাই বাংলাদেশের ইতিহাসে চিরভাস্বর হয়ে থাকবে।

আজ তাঁর মৃত্যুবার্ষিকীতে গভীর শ্রদ্ধায় স্মরণ করি
ভাষাসৈনিক আবদুল মতিনকে।

একুশের রক্তাক্ত পথের সেই নির্ভীক যোদ্ধার প্রতি
অশেষ শ্রদ্ধা।

Tags :

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সর্বশেষ খবর

সম্পাদক ও প্রকাশক : এ বি এম জাকিরুল হক টিটন ।

খবরওয়ালা একটি বিশ্বস্ত অনলাইন নিউজ পোর্টাল, যেখানে বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও আপডেট প্রকাশ করা হয়। রাজনীতি, জাতীয় ও স্থানীয় সংবাদ, শিক্ষা, খেলাধুলা, ব্যবসা, বিনোদন ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনের গুরুত্বপূর্ণ খবর নিয়ে পাঠকদের জন্য রয়েছে নির্ভরযোগ্য ও সময়োপযোগী সংবাদ পরিবেশন।

© ২০২৬ খবরওয়ালা। সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।