ভারতের কিংবদন্তি সংগীত পরিচালক ইলাইয়ারাজার পুরোনো গান ও যন্ত্রসংগীত নতুন করে আকৃষ্ট করছে জেনারেশন জেডের (জেন জি) শ্রোতাদের। কয়েক দশক আগে তৈরি তাঁর সুর এখন স্ট্রিমিং প্ল্যাটফর্ম, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের রিলস এবং অনলাইন সংগীতভান্ডারের মাধ্যমে পৌঁছে যাচ্ছে এমন এক প্রজন্মের কাছে, যাদের অনেকের জন্মই হয়েছে এসব গান প্রকাশের বহু বছর পর।
সংগীত শোনার অভ্যাস বদলে যাওয়ায় পুরোনো গান আবিষ্কারের পথও পাল্টেছে। আগের প্রজন্ম নতুন গানের জন্য অপেক্ষা করত ক্যাসেটের, শুনত রেডিওতে কিংবা চলচ্চিত্রের অ্যালবাম প্রকাশের পর গান সংগ্রহ করত। এখন স্মার্টফোনে প্লেলিস্ট শুনতে গিয়ে, ইউটিউবের সুপারিশে কিংবা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছোট ভিডিও দেখতে গিয়ে তরুণেরা হঠাৎ খুঁজে পাচ্ছেন ইলাইয়ারাজার সৃষ্টি।
এই আগ্রহের পেছনে শুধু পুরোনো দিনের স্মৃতি কাজ করছে না। তরুণ শ্রোতাদের অনেকের কাছে তাঁর গান একেবারেই নতুন অভিজ্ঞতা। কোনো ভিডিওতে কয়েক সেকেন্ডের সুর শুনে মূল গানটি খুঁজে নেওয়া, এরপর একই সুরকারের অন্য গান কিংবা চলচ্চিত্রের আবহসংগীত শোনার মধ্য দিয়ে তাঁদের পরিচয় বিস্তৃত হচ্ছে। এভাবেই ডিজিটাল যুগে কয়েক দশক আগের সংগীত নতুন শ্রোতা তৈরি করছে।
অনলাইন প্ল্যাটফর্মে ফিরছে জনপ্রিয় গান
একসময় রেডিওর অনুষ্ঠান, ক্যাসেটের দোকান ও টেলিভিশনের সংগীতানুষ্ঠান ছিল গান আবিষ্কারের গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। এখন সেই ভূমিকার বড় অংশ নিয়েছে স্ট্রিমিং সেবা ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম। শ্রোতার পছন্দ অনুযায়ী গান সুপারিশ করার প্রযুক্তি পুরোনো সংগীতের সঙ্গে নতুন করে পরিচিত হওয়ার সুযোগ তৈরি করছে।
ইলাইয়ারাজার ইলয়া নিলা, ভালাইওসাই, মন্দ্রম ভান্ধা থেন্দ্রালুক্কু, পুভে সেম্পুভে, নিলাভে ভা এবং রাজা রাজা চোলান—এ ধরনের গান তামিল চলচ্চিত্রের সংগীত অনুসন্ধান করতে গিয়ে নতুন শ্রোতাদের আকৃষ্ট করছে।
কোনো একটি গানের অংশ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জনপ্রিয় হলে অনেকেই পুরো গানটি শোনার চেষ্টা করেন। সেখান থেকে সংশ্লিষ্ট চলচ্চিত্রের গান, একই সময়ের অন্য সৃষ্টি কিংবা সুরকারের যন্ত্রসংগীতের অ্যালবামেও পৌঁছে যেতে পারেন তাঁরা। একটি ছোট ভিডিও তাই কখনো কখনো বৃহত্তর সংগীতভান্ডার আবিষ্কারের প্রবেশদ্বার হয়ে উঠছে।
এ ক্ষেত্রে ভাষাগত সীমাবদ্ধতাও সব সময় বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে না। তামিল ভাষা না জানলেও শ্রোতারা সুরের সৌন্দর্য, বাদ্যযন্ত্রের বিন্যাস এবং আবহসংগীতের আবেগ উপভোগ করতে পারেন। বিশেষ কোনো দৃশ্যের সঙ্গে যুক্ত সুর দর্শকের মনে দাগ কাটলে সেই সংগীতের প্রতি আগ্রহ আরও বাড়তে পারে।
নতুন চলচ্চিত্রে পুরোনো সুরের পুনরাবিষ্কার
ইলাইয়ারাজার সংগীতকে নতুন প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেওয়ার ক্ষেত্রে চলচ্চিত্রের ভূমিকাও গুরুত্বপূর্ণ। ২০২৪ সালে মুক্তি পাওয়া মালয়ালম চলচ্চিত্র মাঞ্জুমেল বয়েজ-এ ব্যবহৃত হয়েছিল তাঁর জনপ্রিয় গান কানমানি আনবোদু। গানটি মূলত ১৯৯১ সালের তামিল চলচ্চিত্র গুনা-এর জন্য তৈরি হয়েছিল।
নতুন চলচ্চিত্রের একটি আবেগঘন মুহূর্তে গানটির ব্যবহার দর্শকদের মধ্যে নতুন করে আগ্রহ তৈরি করে। যাঁরা মূল চলচ্চিত্রটি দেখেননি, তাঁরাও গানটির সঙ্গে পরিচিত হওয়ার সুযোগ পান। পরে অনেকে মূল গান ও চলচ্চিত্র সম্পর্কে জানতে আগ্রহী হন। এভাবে সমসাময়িক সিনেমা পুরোনো সংগীতকে নতুন প্রেক্ষাপটে উপস্থাপন করে নতুন শ্রোতাদের কাছে পৌঁছে দিতে পারে।
২০২৬ সালে নির্মাতা কার্তিক সুব্বারাজের ডরোথি চলচ্চিত্রেও ইলাইয়ারাজার তিনটি সংগীত ব্যবহারের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। এ ধরনের উদ্যোগ তাঁর পুরোনো সৃষ্টির প্রতি আগ্রহ ধরে রাখতে সহায়তা করছে।
তবে ডিজিটাল যুগে সংগীতের ব্যবহার বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে কপিরাইট ও মালিকানার প্রশ্নও সামনে এসেছে। নিজের সৃষ্টির ওপর অধিকার নিয়ে ইলাইয়ারাজা বিভিন্ন সময়ে অবস্থান জানিয়েছেন এবং অনুমতি ছাড়া সংগীত ব্যবহারের অভিযোগে আইনি নোটিশ দিয়েছেন। অনলাইন প্ল্যাটফর্মে গান দ্রুত ছড়িয়ে পড়ার এই সময়ে কোনো সংগীত ব্যবহারের অনুমতি ও স্বত্ব নিশ্চিত করা শিল্পী এবং সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
সুরের গভীরতা ও আবহসংগীতের বিশেষ আবেদন
ইলাইয়ারাজার সংগীতের জনপ্রিয়তার কারণ শুধু মনে থাকার মতো সুর নয়। তাঁর সংগীতায়োজনে বেস গিটার, গিটার, স্ট্রিংস ও বাঁশির মতো বাদ্যযন্ত্রের ব্যবহার বিশেষ বৈশিষ্ট্য তৈরি করে। মনোযোগ দিয়ে শুনলে একই গানের মধ্যে বিভিন্ন বাদ্যযন্ত্রের আলাদা ভূমিকা এবং সুরের সূক্ষ্ম পরিবর্তন অনুভব করা যায়।
হেডফোন ও উন্নত মানের ডিজিটাল রেকর্ডিংয়ের কারণে তরুণ শ্রোতারা এসব খুঁটিনাটি আরও মনোযোগ দিয়ে শোনার সুযোগ পাচ্ছেন। শুরুতে কোনো গানের মূল সুরে আকৃষ্ট হলেও পরে তাঁরা তার সংগীতায়োজন, ছন্দের পরিবর্তন কিংবা বাদ্যযন্ত্রের সমন্বয়ের প্রতি আগ্রহী হয়ে উঠতে পারেন।
বিশেষ করে চলচ্চিত্রের আবহসংগীতে ইলাইয়ারাজার দক্ষতা তাঁর কাজকে আলাদা পরিচিতি দিয়েছে। আবহসংগীত কেবল সংলাপের পেছনে বাজতে থাকা সুর নয়; এটি দৃশ্যের আবেগকে আরও গভীর করে তুলতে পারে। নিঃসঙ্গতা, অপেক্ষা, শোক, ভালোবাসা কিংবা আশার মতো অনুভূতি প্রকাশে সংগীত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। কখনো কখনো সঠিক সময়ে সংগীতের অনুপস্থিতিও দৃশ্যের প্রভাব বাড়িয়ে দেয়।
চলচ্চিত্র পরিচালক জন মাহেন্দ্রন ইলাইয়ারাজার দ্রুত চলচ্চিত্রের পরিস্থিতি বুঝে নেওয়ার এবং কোন মুহূর্তে সংগীত দৃশ্যের আবেগ বাড়াতে পারে, তা উপলব্ধি করার দক্ষতার কথা তুলে ধরেছেন। তাঁর পর্যবেক্ষণে, ইলাইয়ারাজার আবহসংগীত শুধু পর্দার দৃশ্যের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলে না; বরং দৃশ্যের ভেতরে থাকা অনুভূতির আরেকটি স্তরও প্রকাশ করতে পারে।
সংগীত কিউরেটর ও টেলিভিশন ব্যক্তিত্ব সুবাশ্রী থানিকাচালামও তাঁর সুরের স্মরণীয় অংশগুলোর গুরুত্ব তুলে ধরেছেন। আকর্ষণীয় সুরের ছোট অংশগুলো স্বল্পদৈর্ঘ্যের ভিডিওতে সহজেই ব্যবহার করা যায়। কিন্তু সেই অংশের আবেদন শ্রোতাকে যখন পুরো গান শোনার দিকে নিয়ে যায়, তখনই পুরোনো সংগীতের নতুন করে পরিচিত হওয়ার সুযোগ তৈরি হয়।
ভাষার বাইরে যন্ত্রসংগীতের জগৎ
ইলাইয়ারাজার হাউ টু নেম ইট? এবং নাথিং বাট উইন্ড অ্যালবাম দুটি তাঁর যন্ত্রসংগীতের জগতের উল্লেখযোগ্য উদাহরণ। এসব সংগীত উপভোগ করতে তামিল ভাষা জানা কিংবা কোনো নির্দিষ্ট চলচ্চিত্রের সঙ্গে পরিচিত হওয়া জরুরি নয়। সুর, ছন্দ ও বাদ্যযন্ত্রের বিন্যাসের মধ্য দিয়েই শ্রোতারা সংগীতের আবেগ উপলব্ধি করতে পারেন।
স্ট্রিমিংয়ের যুগে অনেকেই চলচ্চিত্রের সঙ্গে সম্পর্ক ছাড়াই সংগীত শুনছেন। কোনো যন্ত্রসংগীতের ছোট অংশ দিয়ে শুরু করে তাঁরা পুরো অ্যালবাম শোনার আগ্রহ পেতে পারেন। এরপর সুরকারের অন্য কাজের প্রতিও কৌতূহল তৈরি হতে পারে।
ইলাইয়ারাজার সংগীতজীবনে নতুন ধারায় কাজ করার আগ্রহও গুরুত্বপূর্ণ। ২০২৫ সালে লন্ডনে রয়্যাল ফিলহারমনিক অর্কেস্ট্রার পরিবেশনায় তাঁর ওয়েস্টার্ন ক্ল্যাসিক্যাল সিম্ফনি ভ্যালিয়্যান্ট প্রথমবারের মতো মঞ্চে পরিবেশিত হয়। ভারতীয় চলচ্চিত্রের সংগীতে দীর্ঘদিন কাজ করার পরও ভিন্ন সংগীতধারায় তাঁর সম্পৃক্ততা সৃজনশীল অনুসন্ধানের ধারাবাহিকতা তুলে ধরে।
প্রজন্ম বদলালেও সুরের আবেদন অটুট
ইলাইয়ারাজার সংগীতের সঙ্গে শ্রোতাদের পরিচিত হওয়ার মাধ্যম সময়ের সঙ্গে পাল্টেছে। আশির দশকে তাঁর গান ছড়িয়ে পড়েছিল চলচ্চিত্র ও রেডিওর মাধ্যমে। ক্যাসেটের যুগে সেই সুর পৌঁছে যায় ঘরে ঘরে, বাসে কিংবা পাড়া-মহল্লার আড্ডায়। পরে সিডি, টেলিভিশন সম্প্রচার এবং ডিজিটাল আর্কাইভ নতুন প্রজন্মকে তাঁর সংগীতের সঙ্গে পরিচিত করেছে।
বর্তমান প্রজন্মের কাছে প্লেলিস্ট, হেডফোন, স্বল্পদৈর্ঘ্যের ভিডিও এবং অনলাইন সুপারিশই সংগীত আবিষ্কারের গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। ফলে পুরোনো গান শোনার অভিজ্ঞতাও বদলে গেছে। একসময় যে গান নির্দিষ্ট চলচ্চিত্র কিংবা কোনো সময়ের স্মৃতির সঙ্গে যুক্ত ছিল, এখন সেটি চলচ্চিত্রের বাইরেও স্বতন্ত্র সংগীত হিসেবে শ্রোতার কাছে পৌঁছাচ্ছে।
এই নতুন আগ্রহ দেখিয়ে দিচ্ছে, প্রযুক্তি পুরোনো সৃষ্টিকে নতুন শ্রোতার কাছে পৌঁছে দিতে পারে। তবে শুধু প্রযুক্তির উপস্থিতিই কোনো গানকে দীর্ঘস্থায়ী করে না। সুরের গভীরতা, সংগীতায়োজনের স্বাতন্ত্র্য এবং আবেগ প্রকাশের ক্ষমতাই শ্রোতাকে বারবার ফিরে আসতে উৎসাহিত করে।
ইলাইয়ারাজার ক্ষেত্রে সেই বৈশিষ্ট্যগুলোই নতুন প্রজন্মের আগ্রহের ভিত্তি তৈরি করছে। তাঁর গান এখন আর শুধু আগের দশকগুলোর স্মৃতির সঙ্গে যুক্ত নয়; তরুণেরা নিজেদের পছন্দ ও অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়েও এসব সুর আবিষ্কার করছেন।
স্ট্রিমিং সেবা ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ভবিষ্যতেও সংগীত শোনার ধরন বদলে দেবে। তবে ইলাইয়ারাজার সংগীতের নতুন শ্রোতা তৈরি হওয়ার ঘটনা মনে করিয়ে দেয়, ভালো সুরের আবেদন কোনো নির্দিষ্ট প্রজন্মে সীমাবদ্ধ থাকে না। প্রকাশের সময় পেরিয়ে গেলেও সৃষ্টির আবেগ ও সৌন্দর্য অটুট থাকলে তা নতুন শ্রোতার মনেও জায়গা করে নিতে পারে।


