বাংলার যাত্রামঞ্চের এক কিংবদন্তি নটরাজ
বাংলার লোকনাট্য ও যাত্রাশিল্পের ইতিহাসে কিছু নাম উচ্চারিত হয় গভীর শ্রদ্ধা ও ভালোবাসায়। যাঁদের অসাধারণ অভিনয়প্রতিভা, শিল্পের প্রতি নিষ্ঠা এবং নিরলস সাধনা একটি শিল্পমাধ্যমকে মানুষের হৃদয়ের আরও কাছে নিয়ে গেছে, অমলেন্দু বিশ্বাস তাঁদেরই একজন। অভিনয়, নির্দেশনা ও যাত্রাশিল্পের বিকাশে অসামান্য অবদান রেখে তিনি হয়ে উঠেছিলেন বাংলাদেশের যাত্রাঙ্গনের এক অনন্য কিংবদন্তি। তাঁর কণ্ঠ, অভিব্যক্তি, সংলাপ পরিবেশনের দক্ষতা এবং চরিত্রের গভীরে প্রবেশ করার ক্ষমতা তাঁকে দিয়েছিল স্বতন্ত্র মর্যাদা।
অমলেন্দু বিশ্বাস ছিলেন এমন এক শিল্পসাধক, যাঁর কাছে যাত্রা কেবল বিনোদনের মাধ্যম ছিল না; বরং ইতিহাস, ঐতিহ্য, সমাজবাস্তবতা ও মানুষের জীবনবোধ প্রকাশের এক শক্তিশালী শিল্পমাধ্যম। মঞ্চের আলোয় তিনি কখনো ইতিহাসের মহানায়ক, কখনো প্রতিবাদী চরিত্র, কখনো বা পুরাণের কোনো অবিস্মরণীয় ব্যক্তিত্ব হয়ে দর্শকের হৃদয়ে আলোড়ন তুলেছেন।
জন্ম ও শৈশব
অমলেন্দু বিশ্বাসের জন্ম ১৯২৫ সালের ২৯ মে, মিয়ানমারের ইয়াঙ্গুনে। তাঁর পিতা সুরেন্দ্র লাল বিশ্বাস ইয়াঙ্গুনে কাস্টমস বিভাগে কর্মরত ছিলেন এবং মায়ের নাম জ্ঞানদা দেবী। তাঁদের পৈতৃক নিবাস বাংলাদেশের চট্টগ্রাম জেলার সীতাকুণ্ড উপজেলার মসজিদিয়া গ্রামে।
জীবনের শুরুর পর্ব থেকেই নানা অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে এগিয়ে চলেছিলেন তিনি। বিচিত্র কর্মজীবনের মধ্য দিয়ে তাঁর জীবন যে পথে এগিয়েছে, শেষ পর্যন্ত সেই পথই তাঁকে নিয়ে যায় অভিনয় ও নাট্যসাধনার জগতে—যেখানে তিনি নিজের প্রতিভার পূর্ণ বিকাশ ঘটান।
বিচিত্র কর্মজীবন থেকে শিল্পসাধনায়
১৯৪১ সালে প্রবেশিকা পরীক্ষা দেওয়ার পর অমলেন্দু বিশ্বাস কলকাতায় বিমানবাহিনীতে যোগ দেন। পরে সেই চাকরি ছেড়ে কিছুদিন পুলিশ বিভাগেও কাজ করেন। ১৯৪৪ সালে রবার্টসন কলেজ থেকে এফএ পাস করেন। ১৯৪৭ সালে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান রেলওয়েতে হিসাবরক্ষকের দায়িত্ব গ্রহণ করেন।
কিন্তু চাকরির বাঁধাধরা জীবনের বাইরেও তাঁর মন পড়ে থাকত নাটক, অভিনয় ও গণসংগীতের জগতে। শিল্প-সংস্কৃতির প্রতি গভীর অনুরাগ তাঁকে ক্রমশ টেনে নিয়ে যায় মুক্তমঞ্চের দিকে। আইয়ুববিরোধী আন্দোলনে যুক্ত হওয়ার কারণে তাঁর বিরুদ্ধে হুলিয়া জারি হয়েছিল বলেও তাঁর জীবনীতে উল্লেখ পাওয়া যায়।
১৯৫০ সালে কয়েকজন সতীর্থকে নিয়ে তিনি প্রতিষ্ঠা করেন ‘বাবুল থিয়েটার’। এই উদ্যোগের মধ্য দিয়েই তাঁর শিল্পীজীবনের নতুন অধ্যায়ের সূচনা ঘটে। একসময় রেলের চাকরি ছেড়ে যাত্রাশিল্পের বিকাশে নিজেকে সম্পূর্ণভাবে নিয়োজিত করেন তিনি। তাঁর নেতৃত্ব ও নিষ্ঠায় ‘বাবুল থিয়েটার’ পরিণত হয় জনপ্রিয় ‘বাবুল অপেরা’য়।
এটি ছিল নিছক একটি যাত্রাদল গড়ে তোলার প্রয়াস নয়; বরং বাংলার ঐতিহ্যবাহী যাত্রাশিল্পকে আরও সমৃদ্ধ, শক্তিশালী ও দর্শকপ্রিয় করে তোলার এক আন্তরিক সাধনা।
যাত্রামঞ্চের অপ্রতিদ্বন্দ্বী অভিনেতা ও নির্দেশক
অমলেন্দু বিশ্বাসের প্রকৃত কৃতিত্ব ছিল তাঁর অভিনয়প্রতিভার বহুমাত্রিকতায়। পৌরাণিক, ঐতিহাসিক ও সামাজিক—বিভিন্ন ধরনের পালায় বিচিত্র চরিত্রকে তিনি নিজের অভিনয়গুণে জীবন্ত করে তুলতেন। চরিত্রের অন্তর্গত আবেগ, দ্বন্দ্ব, বেদনা, বীরত্ব ও প্রতিবাদকে দর্শকের সামনে বিশ্বাসযোগ্য করে উপস্থাপন করার অসাধারণ ক্ষমতা ছিল তাঁর।
দীর্ঘ ২৭ বছরের নাট্যজীবনে তিনি অভিনেতা ও নির্দেশক হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেন এক অনন্য উচ্চতায়। তাঁর অভিনীত ও নির্দেশিত উল্লেখযোগ্য যাত্রাপালার মধ্যে রয়েছে ‘মাইকেল মধুসূদন’, ‘একটি পয়সা’, ‘জানোয়ার’, ‘সম্রাট শাহজাহান বাদশা’, ‘লেনিন’, ‘নবাব সিরাজউদ্দৌলা’, ‘সোহরাব-রুস্তম’, ‘অচল পয়সা’, ‘চাঁদ সুলতানা’, ‘রাহুগ্রাস’ ও ‘জালিয়াত’।
এসব পালার মধ্য দিয়ে ইতিহাস, সাহিত্য, রাজনীতি ও সমাজজীবনের নানা দিক উঠে এসেছে যাত্রামঞ্চে। চরিত্রের সঙ্গে একাত্ম হয়ে যাওয়ার ক্ষমতা এবং সংলাপ পরিবেশনের শক্তিতে অমলেন্দু বিশ্বাস দর্শকদের মুগ্ধ করতেন। তাঁর অভিনয় ছিল আবেগময়, প্রাণবন্ত ও নাটকীয়তায় সমৃদ্ধ।
১৯৭৮-৭৯ সালে তাঁর নির্দেশিত ও অভিনীত ‘মাইকেল মধুসূদন’ পালাটি ব্যাপক প্রশংসা অর্জন করে। এই সাফল্য তাঁর শিল্পীসত্তার গভীরতা এবং নির্দেশক হিসেবে দক্ষতার উজ্জ্বল প্রমাণ।
সহশিল্পী ও জীবনসঙ্গী
যাত্রার ‘ফার্স্ট লেডি’ হিসেবে পরিচিত খ্যাতিমান শিল্পী মঞ্জুশ্রী মুখার্জি ছিলেন তাঁর অধিকাংশ পালার নায়িকা। মঞ্চে তাঁদের শিল্পীসত্তার সম্মিলন যাত্রাপ্রেমীদের কাছে বিশেষ আকর্ষণের বিষয় হয়ে উঠেছিল।
ব্যক্তিজীবনে অমলেন্দু বিশ্বাসের স্ত্রী ছিলেন যাত্রাসম্রাজ্ঞী জ্যোৎস্না বিশ্বাস। তাঁদের কন্যা অরুণা বিশ্বাস চলচ্চিত্র ও টেলিভিশনের একজন পরিচিত অভিনয়শিল্পী। শিল্প-সংস্কৃতির প্রতি অনুরাগ যেন এই পরিবারে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে প্রবাহিত হয়েছে।
স্বীকৃতি ও সম্মাননা
যাত্রাশিল্পে অসামান্য অভিনয় ও নির্দেশনার স্বীকৃতিস্বরূপ অমলেন্দু বিশ্বাস ১৯৭৯-৮০ সালে বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি আয়োজিত যাত্রা উৎসবে পরপর দুবার শ্রেষ্ঠ অভিনেতার সম্মান ও পুরস্কার লাভ করেন।
তাঁর শিল্পসাধনার সবচেয়ে বড় স্বীকৃতিগুলোর একটি হলো শিল্প-সংস্কৃতিতে বিশেষ অবদানের জন্য মরণোত্তর একুশে পদক অর্জন। এই সম্মাননা তাঁর ব্যক্তিগত কৃতিত্বের স্বীকৃতির পাশাপাশি বাংলাদেশের ঐতিহ্যবাহী যাত্রাশিল্পের মর্যাদাকেও উজ্জ্বল করেছে।
মহাপ্রয়াণ, কিন্তু শিল্পের মৃত্যু নেই
১৯৮৭ সালের ১৩ অক্টোবর কিংবদন্তি এই যাত্রাশিল্পীর জীবনাবসান ঘটে। তাঁর প্রস্থান ছিল বাংলার যাত্রাঙ্গনের জন্য এক অপূরণীয় ক্ষতি। কিন্তু শিল্পীর মৃত্যু হলেও তাঁর শিল্পকর্ম, অভিনয়ের স্মৃতি এবং যাত্রাশিল্পের প্রতি তাঁর অবদান হারিয়ে যায়নি।
অমলেন্দু বিশ্বাসের জীবন আমাদের মনে করিয়ে দেয়, প্রকৃত শিল্পী কেবল নিজের প্রতিভার পরিচয় দেন না; তিনি তাঁর সাধনা দিয়ে একটি শিল্পমাধ্যমের ইতিহাসেও স্থায়ী ছাপ রেখে যান। পেশাগত জীবনের নানা বাঁক পেরিয়ে যাত্রাশিল্পকে আপন করে নেওয়া, সেই শিল্পের উন্নয়নে নিজেকে উৎসর্গ করা এবং দর্শকের হৃদয়ে অমলিন হয়ে থাকা—এসবই তাঁকে দিয়েছে কিংবদন্তির মর্যাদা।
আজ তাঁর প্রয়াণবার্ষিকীতে গভীর শ্রদ্ধায় স্মরণ করি বাংলার যাত্রামঞ্চের সেই অসাধারণ শিল্পীকে। তাঁর জীবন ও শিল্পসাধনা নতুন প্রজন্মের নাট্যকর্মীদের অনুপ্রাণিত করুক। বাংলার ঐতিহ্যবাহী যাত্রাশিল্পের ইতিহাসে তাঁর নাম বেঁচে থাকুক চিরকাল, মঞ্চের আলোয়, দর্শকের স্মৃতিতে এবং আমাদের সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকারে।
বিনম্র শ্রদ্ধাঞ্জলি কিংবদন্তি নটরাজ অমলেন্দু বিশ্বাসের স্মৃতির প্রতি।


