নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের সাবেক মেয়র ডা. সেলিনা হায়াৎ আইভীর আইনজীবী ও নারায়ণগঞ্জ সাংস্কৃতিক জোটের সাবেক সভাপতি অ্যাডভোকেট জিয়াউল ইসলাম কাজলসহ তিনজনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। ‘জয় বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু’ স্লোগান দেওয়ার অভিযোগে সন্ত্রাসবিরোধী আইনের একটি পুরোনো মামলায় তাঁদের গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে। তবে গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের দাবি, তাঁরা আদালত প্রাঙ্গণে কোনো স্লোগান দেননি।
বুধবার (১৪ অক্টোবর) ভোররাতে নারায়ণগঞ্জ শহরের আল্লামা ইকবাল রোড ও দেওভোগ পাক্কা রোড এলাকায় পৃথক অভিযান চালিয়ে তাঁদের নিজ নিজ বাসা থেকে গ্রেপ্তার করা হয়। জেলা পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (অপরাধ) তারেক আল মেহেদী এ তথ্য জানিয়েছেন।
গ্রেপ্তার অন্য দুজন হলেন আইনজীবী মাহবুবুর রহমান তুষার এবং জিয়াউল ইসলাম কাজলের ভাই আতিকুল ইসলাম। মাহবুবুর রহমান তুষার জেলা ও দায়রা জজ আদালতের সাবেক পাবলিক প্রসিকিউটর মো. আসাদুজ্জামানের ছেলে।
পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সময় সংঘটিত একটি হত্যা মামলায় মঙ্গলবার সাবেক মেয়র সেলিনা হায়াৎ আইভী নারায়ণগঞ্জ জেলা ও দায়রা জজ আদালতে হাজিরা দিতে যান। ওই সময় আদালত প্রাঙ্গণে আওয়ামী লীগের পক্ষে ‘জয় বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু’ স্লোগান দেওয়া হয়েছিল বলে অভিযোগ ওঠে। এ ঘটনায় সন্ত্রাসবিরোধী আইনের একটি পুরোনো মামলায় তাঁদের গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে।
অতিরিক্ত পুলিশ সুপার তারেক আল মেহেদী বলেন, গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের ওই মামলার এজাহারে নাম নেই। তবে তদন্তের স্বার্থে তাঁদের সন্দেহভাজন হিসেবে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। পরে তাঁদের আদালতে পাঠানো হয়েছে বলেও জানান তিনি।
আদালতে আইভীর জামিন, স্লোগান নিয়ে বিতর্ক
এর আগে মঙ্গলবার নারায়ণগঞ্জের সিদ্ধিরগঞ্জে তুহিন হত্যা মামলায় এজাহারভুক্ত আসামি সাবেক মেয়র সেলিনা হায়াৎ আইভীর জামিন মঞ্জুর করেন আদালত। ওই দিন সকালে তিনি সশরীরে আদালতে হাজির হন। মামলাটির শুনানি করেন নারায়ণগঞ্জের দায়রা জজ আদালতের বিচারক মো. আবু শামীম আজাদ।
জামিন পাওয়ার পর আদালত প্রাঙ্গণে উপস্থিত সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেননি আইভী। তবে গাড়িতে ওঠার আগে তিনি বলেন, “জয় বাংলাকে দমিয়ে রাখা যাবে না।” তাঁর এই বক্তব্য এবং আদালত প্রাঙ্গণে স্লোগান দেওয়ার অভিযোগকে কেন্দ্র করে পরবর্তী সময়ে গ্রেপ্তারের বিষয়টি আলোচনায় আসে।
এদিকে জিয়াউল ইসলাম কাজল ও মাহবুবুর রহমান তুষারের সহকর্মী আইনজীবী এবং সংস্কৃতিকর্মীরা দাবি করেছেন, তাঁরা পেশাগত দায়িত্ব পালনের অংশ হিসেবে আদালতে উপস্থিত ছিলেন। তাঁদের হাতে মামলার নথিপত্র ছিল। তবে তাঁরা কোনো স্লোগান দেননি বলে দাবি করেছেন সহকর্মীরা।
গ্রেপ্তার নিয়ে সংস্কৃতিকর্মীদের প্রতিবাদ
জিয়াউল ইসলাম কাজল নারায়ণগঞ্জের সাংস্কৃতিক অঙ্গনে পরিচিত মুখ। তিনি আবৃত্তিশিল্পী এবং নারায়ণগঞ্জ সাংস্কৃতিক জোটের সাবেক সভাপতি। শহরের আলোচিত তানভীর মুহাম্মদ ত্বকী হত্যা, সন্ত্রাস ও চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে বিভিন্ন আন্দোলনেও তিনি সক্রিয় ছিলেন। তাঁর সহকর্মীদের ভাষ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সময়ও সাংস্কৃতিক জোটের সভাপতি হিসেবে তিনি ছাত্র-জনতার পক্ষে বিভিন্ন কর্মসূচিতে অংশ নিয়েছিলেন।
নারায়ণগঞ্জ সাংস্কৃতিক জোটের উপদেষ্টা রফিউর রাব্বি কাজলের গ্রেপ্তারের নিন্দা জানিয়েছেন। তিনি বলেন, কাজল দীর্ঘদিন ধরে সন্ত্রাস, খুন ও চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে আন্দোলনে তাঁদের সঙ্গে ছিলেন। ২০২৪ সালের আন্দোলনের সময়ও তিনি সাংস্কৃতিক জোটের নেতৃত্বে ছিলেন।
রফিউর রাব্বির অভিযোগ, কাজলকে গ্রেপ্তারের পক্ষে পুলিশের দেওয়া যুক্তি গ্রহণযোগ্য নয়। এ ঘটনায় তাঁরা নিন্দা ও প্রতিবাদ জানাচ্ছেন।
অন্যদিকে পুলিশের বক্তব্য, কারও অতীতের অবস্থান ও বর্তমান অবস্থান ভিন্ন হতে পারে। তদন্তের স্বার্থেই গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে এ পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।
ঘটনাটি ঘিরে একদিকে পুলিশের তদন্তসংক্রান্ত বক্তব্য, অন্যদিকে গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের সহকর্মীদের দাবি—দুই পক্ষের অবস্থান সামনে এসেছে। তবে আদালত প্রাঙ্গণে স্লোগান দেওয়ার অভিযোগের বিষয়ে গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের ভূমিকা এবং পুরোনো মামলায় তাঁদের সংশ্লিষ্টতা তদন্তের মাধ্যমে কতটা প্রতিষ্ঠিত হয়, তা পরবর্তী আইনি প্রক্রিয়ায় স্পষ্ট হবে।



