জাকিয়া সুলতানা কর্নিয়া—সংগীতাঙ্গনে যিনি কর্নিয়া নামেই পরিচিত। গানের প্রতি ভালোবাসা আর নিজেকে নতুনভাবে তুলে ধরার আগ্রহ নিয়ে এগিয়ে চলেছেন এই সংগীতশিল্পী। নিজের গানের পাশাপাশি এবার নতুন দায়িত্ব পালন করছেন রিয়েলিটি শো ‘আরটিভি লিটল স্টার সিজন-২’-এর বিচারক হিসেবে। একসময় প্রতিযোগিতার মঞ্চে নিজের প্রতিভা প্রমাণের চেষ্টা করেছেন, আর এখন সেই মঞ্চেই নতুন প্রজন্মের প্রতিভা মূল্যায়ন করছেন তিনি।
বিচারকের দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি নতুন গান প্রকাশ, নিয়মিত সংগীতচর্চা এবং মঞ্চ পরিবেশনা নিয়ে ব্যস্ত সময় কাটছে কর্নিয়ার। তাঁর প্রকাশিত ‘জামদানি শাড়ি’ গানটি শ্রোতাদের কাছ থেকে ভালোবাসা পেয়েছে। সামনে একক ও দ্বৈত গান প্রকাশের পরিকল্পনাও রয়েছে। তবে সংগীতের বাইরের অন্য কোনো পরিচয়ের চেয়ে কণ্ঠশিল্পী হিসেবেই নিজেকে প্রতিষ্ঠিত রাখতে চান তিনি। তাঁর কাছে গান শুধু পেশা নয়, ভালোবাসার জায়গা।
বিচারকের দায়িত্বে নতুন অভিজ্ঞতা
‘আরটিভি লিটল স্টার সিজন-২’-এর বিচারক হিসেবে দায়িত্ব পালন করাকে ক্যারিয়ারের উল্লেখযোগ্য অভিজ্ঞতা হিসেবে দেখছেন কর্নিয়া। এত বড় একটি আয়োজনের বিচারক হিসেবে প্রথমবার কাজ করার অনুভূতি তাঁর কাছে আলাদা। আয়োজকেরা যখন আস্থা রেখে এমন দায়িত্ব দেন, তখন তা যথাযথভাবে পালনের চেষ্টা করেন বলে জানান তিনি।
প্রতিযোগীদের পরিবেশনা মূল্যায়নের ক্ষেত্রে নিরপেক্ষ থাকাকে গুরুত্ব দেন কর্নিয়া। তাঁর মতে, কোনো প্রতিযোগীর আবেগ কিংবা অন্য কোনো বিষয় যেন গানের মূল্যায়নে প্রভাব না ফেলে, সেদিকে খেয়াল রাখা প্রয়োজন। একজন বিচারকের দায়িত্ব কেবল নম্বর দেওয়া নয়; প্রতিযোগীর দক্ষতা বোঝা এবং তার উন্নতির পথ দেখানোও গুরুত্বপূর্ণ।
এই আয়োজনের বিচারক হিসেবে রয়েছেন বরেণ্য পপশিল্পী ফেরদৌস ওয়াহিদ ও সংগীতশিল্পী লিজা। তাঁদের সঙ্গে কাজ করার অভিজ্ঞতাও উপভোগ করছেন কর্নিয়া। শুটিংয়ের বাইরে ফেরদৌস ওয়াহিদ তাঁর প্রাণবন্ত উপস্থিতি দিয়ে সবাইকে আনন্দে মাতিয়ে রাখতেন বলে জানান তিনি। বয়স ও অভিজ্ঞতার ব্যবধান থাকলেও তাঁর সঙ্গে সময় কাটানোর পরিবেশ ছিল সহজ ও আনন্দময়।
আয়োজনটির ফাইনাল ১৮ অক্টোবর অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। এমন একটি অনুষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার সুযোগ করে দেওয়ায় আরটিভির প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়েছেন কর্নিয়া।
নিজের প্রতিযোগিতার দিনের কথা মনে পড়ে
একসময় রিয়েলিটি শোর প্রতিযোগী হিসেবে নিজেকে প্রমাণের চেষ্টা করেছেন কর্নিয়া। এখন বিচারকের আসনে বসে সেই দিনগুলোর কথা মনে পড়ে তাঁর। নিজের অভিজ্ঞতার কারণে প্রতিযোগীদের মানসিক চাপ ও প্রত্যাশার বিষয়টি সহজে বুঝতে পারেন বলে মনে করেন তিনি।
কর্নিয়ার মতে, বিচারকদের একটি মন্তব্যও প্রতিযোগীর মনে দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব ফেলতে পারে। তাই ভুল ধরিয়ে দেওয়ার পাশাপাশি ভালো দিকগুলো তুলে ধরাও জরুরি। কোথায় উন্নতি করতে হবে, কীভাবে পরিবেশনা আরও ভালো করা যায়—এসব বিষয় বুঝিয়ে বলা উচিত।
শিশুদের ক্ষেত্রে বিষয়টি আরও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, এই বয়সে তারা শুধু গান শেখে না, নিজেদের আত্মবিশ্বাসও তৈরি করে। অতিরিক্ত চাপ বা নেতিবাচক মন্তব্য তাদের আগ্রহ কমিয়ে দিতে পারে। অন্যদিকে, যথাযথ উৎসাহ ও গঠনমূলক পরামর্শ তাদের শেখার পথে এগিয়ে নিতে পারে।
কর্নিয়া চান, প্রতিযোগীরা যেন নিজেদের দুর্বলতা বুঝতে পারে এবং সেগুলো কাটিয়ে ওঠার চেষ্টা করে। তাঁর বিশ্বাস, নিয়মিত চর্চা ও সঠিক দিকনির্দেশনা পেলে তাদের অনেকেই ভবিষ্যতে ভালো শিল্পী হয়ে উঠতে পারবে।
শিশুশিল্পীদের প্রতিভায় আশাবাদী কর্নিয়া
‘আরটিভি লিটল স্টার সিজন-২’-এ অংশ নেওয়া শিশুদের মধ্যে বেশ কিছু প্রতিভাবান শিল্পীকে খুঁজে পেয়েছেন কর্নিয়া। কারও কণ্ঠে স্বাভাবিক মাধুর্য রয়েছে, কেউ আবার দ্রুত সুর আয়ত্ত করতে পারে। তাঁদের পরিবেশনায় আগামীর সম্ভাবনা দেখছেন তিনি।
তবে শুধু ভালো কণ্ঠস্বর থাকলেই সংগীতে দীর্ঘ পথ পাড়ি দেওয়া সম্ভব নয় বলে মনে করেন এই শিল্পী। গান শেখার আগ্রহ, নিয়মিত অনুশীলন এবং সংগীতের প্রতি ভালোবাসা ধরে রাখাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। প্রতিযোগিতায় ভালো ফল করার পাশাপাশি নিজেদের দক্ষতা বাড়ানোর দিকে মনোযোগ দিতে হবে।
কর্নিয়ার প্রত্যাশা, শিশুরা যেন শুরু থেকেই সংগীতকে গুরুত্বের সঙ্গে নেয়। পুরস্কার বা স্বীকৃতি পাওয়ার জন্যই শুধু গান না শিখে, গানের প্রতি আন্তরিকতা তৈরি করুক। তাঁর মতে, প্রতিভার সঙ্গে অধ্যবসায় যুক্ত হলে ভবিষ্যতে ভালো করার সুযোগ তৈরি হয়।
রিয়েলিটি শোর পরও নিয়মিত চর্চা জরুরি
রিয়েলিটি শো থেকে পরিচিতি পাওয়া অনেক শিল্পী পরবর্তী সময়ে নিজেদের প্রত্যাশিত অবস্থানে নিয়ে যেতে পারেন না—এমন ধারণার সঙ্গে একমত কর্নিয়া। তাঁর মতে, এর একটি কারণ হলো প্রতিযোগিতা শেষ হওয়ার পর নিয়মিত সংগীতচর্চা ধরে রাখতে না পারা।
তিনি বলেন, রিয়েলিটি শোগুলোতে অনেক মধ্যবিত্ত পরিবারের প্রতিযোগী অংশ নেন। তাঁদের ঘিরে পরিবারের সদস্যদের অনেক স্বপ্ন থাকে। প্রতিযোগিতার সময় তাঁরা নিজেদের প্রমাণ করতে কঠোর পরিশ্রম করেন। কিন্তু অনুষ্ঠান শেষ হওয়ার পর অনেকের পক্ষে সেই ধারাবাহিকতা বজায় রাখা সম্ভব হয় না।
কর্নিয়ার মতে, একটি প্রতিযোগিতায় ভালো করা মানেই সংগীতজীবনে প্রতিষ্ঠিত হয়ে যাওয়া নয়। বরং প্রতিযোগিতায় পাওয়া অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে সামনে এগিয়ে যাওয়াই আসল বিষয়। নিয়মিত অনুশীলন ছাড়া গানের দক্ষতা ধরে রাখা কিংবা আরও উন্নত করা কঠিন।
পেশাগত সংগীতজীবনে বাধা আসতে পারে, প্রত্যাশিত সাফল্য পেতেও সময় লাগতে পারে। কিন্তু ব্যর্থতায় হতাশ হয়ে থেমে গেলে চলবে না। নিজের স্বপ্নের প্রতি আন্তরিক থেকে ধৈর্য ও নিষ্ঠার সঙ্গে কাজ করে যেতে হবে। কর্নিয়ার বিশ্বাস, ধারাবাহিক চর্চা ও অধ্যবসায় থাকলে একসময় নিজের জায়গা তৈরি করা সম্ভব।
‘জামদানি শাড়ি’ নিয়ে শ্রোতাদের ভালোবাসা
নিজের গান ‘জামদানি শাড়ি’ নিয়ে শ্রোতাদের কাছ থেকে পাওয়া সাড়ায় আনন্দিত কর্নিয়া। নতুন গান প্রকাশের পর শ্রোতারা সেটিকে কীভাবে গ্রহণ করছেন, তা জানা একজন শিল্পীর জন্য গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করেন তিনি।
শ্রোতাদের ভালোবাসা তাঁকে নতুন কাজের অনুপ্রেরণা দেয়। তিনি চান, তাঁর গান শুনে শ্রোতারা আনন্দ পান এবং প্রতিটি নতুন প্রকাশনায় আলাদা কিছু খুঁজে পান। এ কারণে নতুন গান নিয়ে কাজ করার সময় বৈচিত্র্য ও নিজস্বতার দিকেও নজর রাখেন।
একজন শিল্পীর কাছে শ্রোতাদের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তোলার অন্যতম মাধ্যম তাঁর গান। কর্নিয়াও সেই সম্পর্ক ধরে রাখতে চান নতুন সৃষ্টি ও পরিবেশনার মধ্য দিয়ে। ‘জামদানি শাড়ি’ নিয়ে পাওয়া ইতিবাচক অভিজ্ঞতা তাঁকে সামনে আরও কাজ করার উৎসাহ জোগাচ্ছে।
গানে বৈচিত্র্য, গায়কিতে স্বকীয়তা
ক্যারিয়ারের শুরু থেকেই বিভিন্ন ধরনের গান করার আগ্রহ রয়েছে কর্নিয়ার। একই ধরনের কাজ বারবার না করে নতুন কিছু করার মধ্য দিয়ে নিজের সংগীতজীবনকে সমৃদ্ধ করতে চান তিনি। গানের মাধ্যমে নিজেকে নতুনভাবে আবিষ্কার করার বিষয়টি তাঁর কাছে বিশেষ আনন্দের।
তবে নিরীক্ষা করার অর্থ শুধু ভিন্ন কিছু করা নয়। যে ধরনের গানই পরিবেশন করা হোক, সেটির সঙ্গে কণ্ঠ ও গায়কির যথাযথ সামঞ্জস্য থাকা প্রয়োজন। গানের প্রতি সুবিচার করার পাশাপাশি নিজের স্বকীয়তা ধরে রাখার চেষ্টা করেন তিনি।
কর্নিয়ার কাছে বৈচিত্র্য ও নিজস্বতা পরস্পরের পরিপূরক। নতুন ধারায় কাজ করার আগ্রহ থাকলেও নিজের গায়কির পরিচিত বৈশিষ্ট্য হারাতে চান না। এভাবেই বিভিন্ন ধরনের গান নিয়ে কাজ করে শ্রোতাদের সামনে নতুনভাবে হাজির হতে চান এই সংগীতশিল্পী।
নতুন একক ও দ্বৈত গান প্রকাশের পরিকল্পনা
বর্তমানে কর্নিয়ার ব্যস্ততার বড় একটি অংশজুড়ে রয়েছে নতুন গান ও মঞ্চ পরিবেশনা। সামনে কয়েকটি একক ও দ্বৈত গান প্রকাশের পরিকল্পনা করছেন তিনি। নতুন গানগুলো শ্রোতাদের ভালো লাগবে বলে আশাবাদী এই শিল্পী।
এর পাশাপাশি বিভিন্ন কনসার্টে অংশ নিচ্ছেন কর্নিয়া। সম্প্রতি খাগড়াছড়িতে একটি কনসার্টে গান পরিবেশন করেছেন। সাক্ষাৎকারের দিন কক্সবাজারে তাঁর আরেকটি কনসার্ট ছিল। ঢাকাতেও কয়েকটি অনুষ্ঠানে অংশ নেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।
মঞ্চে সরাসরি গান গাওয়ার অভিজ্ঞতাকে আলাদা গুরুত্ব দেন তিনি। কনসার্টে শ্রোতাদের সঙ্গে তাৎক্ষণিক যোগাযোগ তৈরি হয়, যা একজন শিল্পীর জন্য বিশেষ আনন্দের। শ্রোতাদের প্রতিক্রিয়া সরাসরি পাওয়ার সুযোগ থাকায় মঞ্চ পরিবেশনা তাঁর সংগীতজীবনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
নতুন গান প্রকাশের পাশাপাশি নিয়মিত মঞ্চে থাকার মধ্য দিয়ে শ্রোতাদের সঙ্গে সম্পর্ক আরও দৃঢ় করতে চান কর্নিয়া। সংগীতের বিভিন্ন ধারায় কাজ করে নিজের অভিজ্ঞতা বাড়ানোও তাঁর পরিকল্পনার অংশ।
মডেলিং বা অভিনয় নয়, গানই প্রথম পছন্দ
কণ্ঠশিল্পীর পাশাপাশি কর্নিয়াকে মডেল কিংবা অভিনেত্রী হিসেবে দেখার সম্ভাবনা নিয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি জানান, অভিনয় নিয়ে তাঁর বিশেষ কোনো পরিকল্পনা নেই। বিভিন্ন পত্রিকার ফ্যাশন পাতার জন্য মডেল হিসেবে কাজ করলেও সেগুলো ছিল মূলত সংশ্লিষ্টদের অনুরোধে। মডেলিংকে পেশা হিসেবে নেওয়ার ইচ্ছা থেকে তিনি এসব কাজ করেননি।
শখের বশে অন্য কোনো কাজ করলেও নিজের মূল পরিচয় কণ্ঠশিল্পী হিসেবেই রাখতে চান কর্নিয়া। সংগীতের বাইরে অন্য পরিচয় তৈরির চেয়ে গান নিয়ে কাজ করতেই বেশি আগ্রহী তিনি।
নতুন গান প্রকাশ, নিয়মিত চর্চা, মঞ্চে পরিবেশনা এবং তরুণ প্রতিভাদের উৎসাহ দেওয়ার মধ্য দিয়ে নিজের সংগীতযাত্রাকে আরও এগিয়ে নিতে চান এই শিল্পী। তাঁর কাছে গানের প্রতি ভালোবাসাই সামনে চলার প্রধান প্রেরণা। সংগীতকে সঙ্গী করেই ভবিষ্যতে নিজের পরিচয় আরও দৃঢ় করতে চান কর্নিয়া।


