দেশে ডেঙ্গু পরিস্থিতি উদ্বেগজনক পর্যায়ে রয়েছে। গত ২৪ ঘণ্টায় মশাবাহিত এই রোগে আক্রান্ত হয়ে আরও পাঁচজনের মৃত্যু হয়েছে। একই সময়ে নতুন করে ডেঙ্গু আক্রান্ত ১ হাজার ৯২০ জন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। এ নিয়ে চলতি বছর ডেঙ্গুতে মৃতের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩২১ জনে। অক্টোবরের প্রথম ১৩ দিনেই প্রাণ হারিয়েছেন ৭৬ জন। মৃত্যুর এই পরিসংখ্যান রোগটির বিস্তার ও জনস্বাস্থ্য পরিস্থিতি নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে।
বুধবার (১৪ অক্টোবর) স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের প্রকাশিত ডেঙ্গুবিষয়ক হালনাগাদ বিজ্ঞপ্তিতে এসব তথ্য জানানো হয়। বিজ্ঞপ্তিতে মঙ্গলবার সকাল ৮টা থেকে বুধবার সকাল ৮টা পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টার আক্রান্ত ও মৃত্যুর হিসাব তুলে ধরা হয়েছে।
পাঁচজনের মৃত্যু বিভিন্ন এলাকায়
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, গত ২৪ ঘণ্টায় ডেঙ্গুতে মারা যাওয়া পাঁচজনের মধ্যে দুজন চট্টগ্রাম বিভাগের বাসিন্দা। এ ছাড়া ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন এলাকায় একজন, ময়মনসিংহ বিভাগে একজন এবং রাজশাহী বিভাগে একজনের মৃত্যু হয়েছে। মৃত ব্যক্তিদের মধ্যে তিনজন পুরুষ ও দুজন নারী।
মৃত্যুর ঘটনাগুলো বিভিন্ন অঞ্চল ও প্রশাসনিক এলাকায় ছড়িয়ে থাকার বিষয়টি ডেঙ্গু প্রতিরোধে সমন্বিত উদ্যোগের প্রয়োজনীয়তা সামনে এনেছে। আক্রান্ত ব্যক্তিদের দ্রুত শনাক্ত করা, সময়মতো চিকিৎসার ব্যবস্থা করা এবং মশার প্রজননস্থল ধ্বংস করার মতো কার্যক্রম জোরদার করা জরুরি। তবে অঞ্চলভিত্তিক মৃত্যুর সংখ্যা দিয়ে সংশ্লিষ্ট এলাকার সামগ্রিক সংক্রমণের মাত্রা নির্ধারণ করা যায় না; সে জন্য আক্রান্তের হার, জনসংখ্যা ও অন্যান্য প্রাসঙ্গিক তথ্যও বিবেচনায় নিতে হয়।
অক্টোবরেও বাড়ছে মৃত্যুর সংখ্যা
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মাসভিত্তিক পরিসংখ্যান বলছে, বছরের শুরুতে ডেঙ্গুতে মৃত্যুর সংখ্যা তুলনামূলক কম থাকলেও পরবর্তী মাসগুলোতে তা বেড়েছে। জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারিতে দুজন করে মোট চারজনের মৃত্যু হয়। মে মাসে মারা যান একজন। এরপর জুনে ১৩ জন, জুলাইয়ে ৩৬ জন, আগস্টে ৪৩ জন এবং সেপ্টেম্বরে ১৪৮ জনের মৃত্যু হয়।
অক্টোবরের প্রথম ১৩ দিনেই মারা গেছেন ৭৬ জন। অর্থাৎ, সেপ্টেম্বরের পরও মৃত্যুর সংখ্যা উল্লেখযোগ্য হারে অব্যাহত রয়েছে। চলতি বছরের মোট মৃত্যুর প্রায় ৪৬ শতাংশই ঘটেছে সেপ্টেম্বর ও অক্টোবরের প্রথম ১৩ দিনে। এই হিসাব থেকে বোঝা যায়, বছরের শেষভাগে ডেঙ্গুর প্রভাব জনস্বাস্থ্যের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে।
মাসভিত্তিক মৃত্যুর চিত্র নিচে তুলে ধরা হলো:
| মাস বা সময়কাল | মৃত্যুর সংখ্যা |
|---|---|
| জানুয়ারি | ২ |
| ফেব্রুয়ারি | ২ |
| মার্চ | তথ্য উল্লেখ নেই |
| এপ্রিল | তথ্য উল্লেখ নেই |
| মে | ১ |
| জুন | ১৩ |
| জুলাই | ৩৬ |
| আগস্ট | ৪৩ |
| সেপ্টেম্বর | ১৪৮ |
| অক্টোবরের প্রথম ১৩ দিন | ৭৬ |
| চলতি বছরে মোট | ৩২১ |
এখানে মার্চ ও এপ্রিলের মৃত্যুর সংখ্যা মূল বিজ্ঞপ্তিতে উল্লেখ করা হয়নি। তাই ওই দুই মাসের ঘরে কোনো সংখ্যা বসানো হয়নি।
আক্রান্তের চাপ সামলাতে প্রয়োজন সমন্বিত উদ্যোগ
গত ২৪ ঘণ্টায় ১ হাজার ৯২০ জনের হাসপাতালে ভর্তি হওয়া ডেঙ্গু চিকিৎসাসেবার ওপর চাপের বিষয়টিও সামনে এনেছে। আক্রান্তের সংখ্যা বাড়লে হাসপাতালের শয্যা, চিকিৎসক-নার্স, প্রয়োজনীয় পরীক্ষা এবং রোগীদের নিবিড় পর্যবেক্ষণের ব্যবস্থা পর্যাপ্ত রাখা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। বিশেষ করে যেসব রোগীর শারীরিক অবস্থার দ্রুত অবনতি ঘটে, তাঁদের ক্ষেত্রে সময়মতো চিকিৎসা জটিলতা কমাতে সহায়ক হতে পারে।
ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হলে জ্বরের পাশাপাশি শরীরব্যথা, মাথাব্যথা, বমি বমি ভাব কিংবা দুর্বলতা দেখা দিতে পারে। তবে জ্বর কমে যাওয়ার পরও কিছু রোগীর অবস্থা গুরুতর হতে পারে। তীব্র পেটব্যথা, বারবার বমি, নাক বা মাড়ি দিয়ে রক্তপাত, অস্বাভাবিক দুর্বলতা, শ্বাসকষ্ট কিংবা অস্থিরতার মতো লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের শরণাপন্ন হওয়া প্রয়োজন। চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া ওষুধ গ্রহণ, বিশেষ করে রক্তপাতের ঝুঁকি বাড়াতে পারে এমন ব্যথানাশক ব্যবহার, বিপজ্জনক হতে পারে।
মশার প্রজননস্থল ধ্বংসে গুরুত্ব
ডেঙ্গু প্রতিরোধে ব্যক্তিগত সতর্কতার পাশাপাশি স্থানীয় প্রশাসন ও সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর ধারাবাহিক কার্যক্রম প্রয়োজন। বাড়ি, ছাদ, বারান্দা, নির্মাণাধীন ভবন এবং আশপাশের স্থানে জমে থাকা পানি নিয়মিত পরিষ্কার করতে হবে। ফুলের টবের নিচের পাত্র, পরিত্যক্ত টায়ার, ডাবের খোসা, প্লাস্টিকের পাত্র ও অন্যান্য সামগ্রীতে জমে থাকা অল্প পানিতেও এডিস মশা বংশবিস্তার করতে পারে।
শুধু মশা মারার ওষুধ ছিটিয়ে দীর্ঘমেয়াদি সমাধান সম্ভব নয়। প্রজননস্থল চিহ্নিত করে ধ্বংস করা, নিয়মিত পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখা এবং নাগরিকদের সচেতনতা বাড়ানো সমান গুরুত্বপূর্ণ। একই সঙ্গে হাসপাতালগুলোতে ডেঙ্গু রোগীর চিকিৎসা ও পর্যবেক্ষণের প্রস্তুতি নিশ্চিত করতে হবে।
চলতি বছরে ডেঙ্গুতে ৩২১ জনের মৃত্যু এবং এক দিনে নতুন করে প্রায় দুই হাজার রোগীর হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার তথ্য পরিস্থিতির গুরুত্ব স্পষ্ট করছে। সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে জনসচেতনতা, মশা নিধন কার্যক্রম এবং সময়মতো চিকিৎসা—এই তিন ক্ষেত্রেই কার্যকর উদ্যোগ অব্যাহত রাখা জরুরি।


