নোয়াখালীতে প্রতিবন্ধী যুবককে পিটিয়ে হত্যা, গ্রেফতার ৪

নোয়াখালীর সদর উপজেলায় চোর সন্দেহে কবির হোসেন (৩৫) নামে এক প্রতিবন্ধী যুবককে পিটিয়ে হত্যার অভিযোগ উঠেছে। মঙ্গলবার দুপুরে উপজেলার নোয়ান্নই ইউনিয়নের ইসলামগঞ্জ বাজার এলাকায় একদল যুবক তাঁকে গাছের সঙ্গে বেঁধে লাঠিসোঁটা দিয়ে মারধর করেন বলে অভিযোগ রয়েছে। পরে গুরুতর আহত অবস্থায় তাঁকে অটোরিকশায় করে প্রায় পাঁচ কিলোমিটার দূরে নেয়াজপুর ইউনিয়নের দেবীপুর গ্রামে ফেলে রেখে যাওয়া হয়। পুলিশ তাঁকে উদ্ধার করে হাসপাতালে নিয়ে গেলে চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন। এ ঘটনায় করা হত্যা মামলার প্রধান আসামিসহ চারজনকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ।

বুধবার (১৪ অক্টোবর) দুপুর ১টার দিকে সুধারাম মডেল থানায় আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানান নোয়াখালীর অতিরিক্ত পুলিশ সুপার আবু তৈয়ব মোহাম্মদ আরিফ হোসেন। এ ঘটনায় জড়িত অন্যদের শনাক্ত ও গ্রেফতারের চেষ্টা চলছে বলে জানিয়েছে পুলিশ।

পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, নিহত কবির হোসেন সুধারাম থানার নোয়ান্নই ইউনিয়নের নোয়ান্নই গ্রামের গাইন বাড়িতে তাঁর মা কমলা বেগমের সঙ্গে বসবাস করতেন। তিনি শারীরিক ও মানসিক প্রতিবন্ধী ছিলেন। মঙ্গলবার দুপুরে তিনি ইসলামগঞ্জ বাজার এলাকায় গেলে চুরির অভিযোগে তাঁকে আটক করা হয়। এ সময় মামলার প্রধান আসামি আলাউদ্দিন মুন্সীর নেতৃত্বে ২৫ থেকে ৩০ জন যুবক তাঁকে ঘিরে ফেলেন বলে অভিযোগ রয়েছে।

একপর্যায়ে কবিরকে নাইলনের রশি দিয়ে একটি গাছের সঙ্গে বেঁধে রাখা হয়। এরপর সেখানে জড়ো হওয়া লোকজন তাঁকে লাঠিসোঁটা দিয়ে এলোপাতাড়ি মারধর করেন। কিল-ঘুষি ও লাথিও মারা হয়। এতে তিনি গুরুতর আহত হন। তবে তাঁর বিরুদ্ধে চুরির অভিযোগের সত্যতা সম্পর্কে সংবাদ সম্মেলনে বিস্তারিত কিছু জানানো হয়নি।

হাসপাতালে নেওয়ার পর মৃত ঘোষণা

পুলিশের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, মারধরের পর কবির হোসেনকে মৃতপ্রায় অবস্থায় একটি অটোরিকশায় তুলে ঘটনাস্থল থেকে প্রায় পাঁচ কিলোমিটার দূরে দেবীপুর গ্রামে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে তাঁকে ফেলে রেখে যাওয়া হয় বলে অভিযোগ রয়েছে।

খবর পেয়ে সুধারাম থানা পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে তাঁকে উদ্ধার করে নোয়াখালী জেনারেল হাসপাতালে নিয়ে যায়। সেখানে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাঁকে মৃত ঘোষণা করেন। পরে পুলিশ মরদেহের সুরতহাল প্রতিবেদন তৈরি করে ময়নাতদন্তের জন্য পাঠায়। ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন পাওয়া গেলে মৃত্যুর কারণ ও আঘাতের ধরন সম্পর্কে আরও বিস্তারিত তথ্য জানা যেতে পারে।

ঘটনার পর নিহতের মা কমলা বেগম বাদী হয়ে সুধারাম থানায় একটি হত্যা মামলা করেন। মামলায় আটজনের নাম উল্লেখ করা হয়েছে। এ ছাড়া অজ্ঞাতপরিচয় ২৫ থেকে ৩০ জনকে আসামি করা হয়েছে। মামলায় প্রত্যেকের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ তদন্ত করে দেখছে পুলিশ।

রাতেই যৌথ অভিযান, গ্রেফতার চার

হত্যার ঘটনার পর মঙ্গলবার রাতেই সুধারাম থানা পুলিশ ও র‍্যাব যৌথ অভিযান চালায়। অভিযানে মামলার প্রধান আসামি মো. আলাউদ্দিন মুন্সী (২৮), মো. ফারুক উদ্দিন শুভ (২৪), মো. হোসেন (৩৪) এবং মো. তারেক (২৩) গ্রেফতার হন।

পুলিশ জানিয়েছে, নিহত যুবককে বহন করতে ব্যবহৃত অটোরিকশাটিও উদ্ধার করা হয়েছে। গ্রেফতার ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে মামলার অভিযোগের বিষয়ে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। ঘটনায় আরও কারা জড়িত ছিলেন, মারধরের সময় ঠিক কতজন উপস্থিত ছিলেন এবং আহত কবিরকে কোথায় নিয়ে যাওয়া হয়েছিল—এসব বিষয় তদন্তের আওতায় রয়েছে।

মামলায় নাম থাকা অন্য আসামিদের গ্রেফতারে পুলিশের তৎপরতা অব্যাহত রয়েছে। তবে গ্রেফতার হওয়া ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ আদালতে প্রমাণিত হওয়ার আগে তাঁদের অপরাধী হিসেবে চূড়ান্তভাবে বিবেচনা করার সুযোগ নেই।

ছেলেকে হারিয়ে বিচারের দাবি মায়ের

নিহত কবির হোসেনের মা কমলা বেগম বলেন, তাঁর ছেলে শারীরিক ও মানসিক প্রতিবন্ধী ছিলেন এবং তাঁর সঙ্গেই বাড়িতে থাকতেন। দিনের বেলায় তিনি এদিক-সেদিক ঘোরাফেরা করতেন, সন্ধ্যায় আবার বাড়িতে ফিরে আসতেন।

কমলা বেগমের ভাষ্য, মঙ্গলবার দুপুরে কবির ইসলামগঞ্জ বাজার থেকে বাড়ির দিকে আসছিলেন। এ সময় আলাউদ্দিন মুন্সীর নেতৃত্বে ফারুক, শুভ, হোসেন ও তারেকসহ কয়েকজন তাঁকে ধরে বাজারের পাশের একটি গাছের সঙ্গে নাইলনের রশি দিয়ে বেঁধে ফেলেন। পরে আরও ২০ থেকে ২৫ জন সেখানে জড়ো হয়ে তাঁকে লাঠিসোঁটা দিয়ে মারধর করেন।

তিনি বলেন, মারধরের পর তাঁর ছেলেকে আধমরা অবস্থায় অজ্ঞাত স্থানে নিয়ে যাওয়া হয়। ছেলেকে খুঁজতে তিনি বিভিন্ন জায়গায় ঘোরাঘুরি করেন। পরে সন্ধ্যায় খবর পান, তাঁর ছেলের মরদেহ নোয়াখালী জেনারেল হাসপাতালে রয়েছে। এরপর তিনি থানায় গিয়ে হত্যা মামলা করেন।

ছেলের মৃত্যুর বিচার চেয়ে কমলা বেগম বলেন, তিনি চান, যাঁরা তাঁর ছেলেকে হত্যা করেছেন, তাঁদের প্রত্যেককে আইনের আওতায় আনা হোক।

আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার অভিযোগ

চুরির অভিযোগ উঠলেও কাউকে আটক করে মারধর বা শাস্তি দেওয়ার অধিকার কোনো ব্যক্তি বা জনতার নেই। অপরাধের অভিযোগ থাকলে তা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে জানানো এবং তদন্তের মাধ্যমে সত্যতা যাচাই করাই আইনসম্মত পথ। সন্দেহের ভিত্তিতে কাউকে শারীরিকভাবে নির্যাতন করা হলে তা গুরুতর অপরাধে পরিণত হতে পারে।

বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন ব্যক্তিদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং তাঁদের প্রতি সহিংসতা প্রতিরোধে পরিবার, স্থানীয় জনগোষ্ঠী ও প্রশাসনের দায়িত্ব রয়েছে। নোয়াখালীর এ ঘটনায় চুরির অভিযোগের সত্যতা, হত্যাকাণ্ডে প্রত্যেকের ভূমিকা এবং মরদেহ অন্য এলাকায় নিয়ে ফেলে রাখার পেছনের কারণ তদন্তের মাধ্যমে স্পষ্ট হওয়া জরুরি।

কবির হোসেনের মৃত্যুর ঘটনায় দায়ীদের শনাক্ত করে নিরপেক্ষ তদন্তের ভিত্তিতে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া এখন নিহতের পরিবারের প্রধান দাবি। পুলিশের তদন্ত ও ময়নাতদন্তের ফলাফলের ওপর নির্ভর করবে মামলার পরবর্তী অগ্রগতি।

Tags :

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সর্বশেষ খবর

সম্পাদক ও প্রকাশক : এ বি এম জাকিরুল হক টিটন ।

খবরওয়ালা একটি বিশ্বস্ত অনলাইন নিউজ পোর্টাল, যেখানে বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও আপডেট প্রকাশ করা হয়। রাজনীতি, জাতীয় ও স্থানীয় সংবাদ, শিক্ষা, খেলাধুলা, ব্যবসা, বিনোদন ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনের গুরুত্বপূর্ণ খবর নিয়ে পাঠকদের জন্য রয়েছে নির্ভরযোগ্য ও সময়োপযোগী সংবাদ পরিবেশন।

© ২০২৬ খবরওয়ালা। সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।