ডেঙ্গুতে ৩৪২ মৃত্যু, হাসপাতালে ভর্তি ১ লাখ ১০ হাজারের বেশি

দেশে ডেঙ্গুর প্রকোপ কমছে না। চলতি বছরের ১৭ অক্টোবর পর্যন্ত এ রোগে আক্রান্ত হয়ে ৩৪২ জনের মৃত্যু হয়েছে। একই সময়ে হাসপাতালে ভর্তি রোগীর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ১০ হাজার ৩১২ জনে। সর্বশেষ ২৪ ঘণ্টায় আরও সাতজনের মৃত্যু হয়েছে এবং নতুন করে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ১ হাজার ৮৭২ জন। সেপ্টেম্বর মাসে প্রাণহানি সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছানোর পর অক্টোবরেও পরিস্থিতির উল্লেখযোগ্য উন্নতি হয়নি।

শনিবার (১৭ অক্টোবর) স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের প্রকাশিত ডেঙ্গুবিষয়ক নিয়মিত প্রতিবেদনে এসব তথ্য জানানো হয়। প্রতিবেদন অনুযায়ী, শুক্রবার সকাল ৮টা থেকে পরবর্তী ২৪ ঘণ্টায় দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগীরা ভর্তি হয়েছেন। একই সময়ে সুস্থ হয়ে হাসপাতাল থেকে ছাড়পত্র পেয়েছেন ১ হাজার ৯৯১ জন।

নতুন রোগী ভর্তি হওয়ার পাশাপাশি বিপুলসংখ্যক রোগী হাসপাতাল থেকে ছাড়া পেলেও ডেঙ্গুর সামগ্রিক পরিস্থিতি এখনো উদ্বেগজনক। রোগীর সংখ্যা বাড়লে হাসপাতালের শয্যা, চিকিৎসক, নার্স এবং প্রয়োজনীয় চিকিৎসাসামগ্রীর ওপর চাপ তৈরি হতে পারে। এ কারণে আক্রান্তদের চিকিৎসার পাশাপাশি সংক্রমণ প্রতিরোধে কার্যকর পদক্ষেপ অব্যাহত রাখা জরুরি।

অক্টোবরের প্রথম ১৬ দিনেই ৯৭ জনের মৃত্যু

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, চলতি বছরের শুরু থেকে অক্টোবরের ১৭ তারিখ পর্যন্ত ডেঙ্গুতে মোট ৩৪২ জনের মৃত্যু হয়েছে। মাসভিত্তিক হিসাব পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, বছরের প্রথম দিকে প্রাণহানির সংখ্যা তুলনামূলক কম থাকলেও জুন থেকে তা বাড়তে শুরু করে। সেপ্টেম্বর মাসে পরিস্থিতি সবচেয়ে ভয়াবহ রূপ নেয়।

জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারি মাসে দুজন করে, মে মাসে একজন, জুনে ১৩ জন, জুলাইয়ে ৩৬ জন, আগস্টে ৪৩ জন এবং সেপ্টেম্বরে ১৪৮ জন ডেঙ্গু আক্রান্তের মৃত্যু হয়েছে। অক্টোবরের প্রথম ১৬ দিনেই মারা গেছেন আরও ৯৭ জন।

অর্থাৎ, চলতি বছরের মোট মৃত্যুর বড় অংশ ঘটেছে সাম্প্রতিক কয়েক মাসে। বিশেষ করে সেপ্টেম্বর ও অক্টোবরের প্রথমার্ধের হিসাব ডেঙ্গুর প্রাণঘাতী প্রভাবের বিষয়টি স্পষ্ট করে।

ডেঙ্গুর বিস্তার সাধারণত আবহাওয়া, বৃষ্টিপাত, তাপমাত্রা এবং এডিস মশার প্রজনন পরিস্থিতির সঙ্গে সম্পর্কিত। তবে সংক্রমণের প্রকৃত মাত্রা নির্ভর করে একাধিক বিষয়ের ওপর। তাই শুধু আবহাওয়ার পরিবর্তনের ওপর নির্ভর না করে নিয়মিত মশা নিয়ন্ত্রণ, রোগী শনাক্তকরণ এবং চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করা প্রয়োজন।

হাসপাতালে ভর্তি রোগী ছাড়াল ১ লাখ ১০ হাজার

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন মোট ১ লাখ ১০ হাজার ৩১২ জন। তাঁদের মধ্যে ১ লাখ ৪ হাজার ৪৯১ জন সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছেন।

সর্বশেষ ২৪ ঘণ্টায় ১ হাজার ৮৭২ জন নতুন রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। বিপরীতে ছাড়পত্র পেয়েছেন ১ হাজার ৯৯১ জন। এ সময়ে হাসপাতাল থেকে ছাড়া পাওয়া রোগীর সংখ্যা নতুন ভর্তি রোগীর তুলনায় ১১৯ জন বেশি।

তবে এক দিনের ভর্তি ও ছাড়পত্রের হিসাব দিয়ে সংক্রমণের সামগ্রিক প্রবণতা নির্ধারণ করা যায় না। নতুন আক্রান্তের সংখ্যা, গুরুতর রোগীর অনুপাত এবং মৃত্যুর হারও পরিস্থিতি মূল্যায়নের গুরুত্বপূর্ণ সূচক।

ডেঙ্গু আক্রান্তদের অনেকের জ্বর, মাথাব্যথা, শরীরব্যথা ও দুর্বলতার মতো উপসর্গ দেখা দেয়। কিছু ক্ষেত্রে রোগীর অবস্থা দ্রুত অবনতির দিকে যেতে পারে। তীব্র পেটব্যথা, বারবার বমি, নাক বা মাড়ি দিয়ে রক্তপাত, অস্বাভাবিক দুর্বলতা কিংবা শ্বাসকষ্ট দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসা নেওয়া প্রয়োজন। বিশেষ করে জ্বর কমে যাওয়ার সময়ও বিপজ্জনক উপসর্গ দেখা দিতে পারে। তাই জ্বর সেরে গেলেই রোগী সম্পূর্ণ ঝুঁকিমুক্ত—এমন ধারণা করা ঠিক নয়।

ঢাকা বিভাগে সবচেয়ে বেশি রোগী

সর্বশেষ ২৪ ঘণ্টায় বিভাগভিত্তিক হিসাবে ঢাকা বিভাগে সবচেয়ে বেশি ডেঙ্গু রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। এ বিভাগে নতুন ভর্তি রোগীর সংখ্যা ৮৬৫। চট্টগ্রামে ২৬০, খুলনায় ২৩৩, বরিশালে ১৯০, রাজশাহীতে ১৭৩, ময়মনসিংহে ৬৭ এবং রংপুরে ৫৯ জন রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন।

ঢাকা বিভাগে রোগীর সংখ্যা অন্য বিভাগগুলোর তুলনায় বেশি হওয়ায় রাজধানীসহ এ অঞ্চলের হাসপাতালগুলোতে চিকিৎসাসেবার প্রস্তুতি ও রোগী ব্যবস্থাপনার গুরুত্ব আরও বেড়েছে। একই সঙ্গে অন্যান্য বিভাগেও রোগীর চাপ সামাল দিতে প্রয়োজনীয় চিকিৎসাসুবিধা নিশ্চিত করা জরুরি।

তবে প্রকাশিত বিভাগভিত্তিক সাতটি সংখ্যার যোগফল ১ হাজার ৮৪৭। সারাদেশে মোট নতুন ভর্তি রোগীর সংখ্যা ১ হাজার ৮৭২ বলে জানানো হয়েছে। ফলে দুই হিসাবের মধ্যে ২৫ জনের পার্থক্য রয়েছে। এই পার্থক্যের কারণ প্রতিবেদনের প্রদত্ত তথ্য থেকে নিশ্চিত হওয়া যায়নি।

মশার প্রজননস্থল ধ্বংসে গুরুত্ব

ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে এডিস মশার বংশবিস্তার বন্ধ করা অন্যতম প্রধান পদক্ষেপ। বাড়ির ছাদ, বারান্দা, ফুলের টব, পরিত্যক্ত টায়ার, প্লাস্টিকের পাত্র কিংবা নির্মাণাধীন ভবনে জমে থাকা পানি এডিস মশার প্রজননক্ষেত্র হতে পারে। এসব স্থানে নিয়মিত নজরদারি এবং জমে থাকা পানি অপসারণ করা প্রয়োজন।

শুধু ব্যক্তিগত উদ্যোগে নয়, পাড়া-মহল্লা ও স্থানীয় পর্যায়েও পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম জোরদার করা দরকার। মশার সম্ভাব্য প্রজননস্থল চিহ্নিত করা, বর্জ্য যথাযথভাবে অপসারণ এবং প্রয়োজন অনুযায়ী মশা নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রম পরিচালনা করতে হবে।

এডিস মশা সাধারণত দিনের বেলায় বেশি সক্রিয় থাকে। তাই দিনের বেলায়ও মশার কামড় থেকে সুরক্ষিত থাকা জরুরি। উপযুক্ত মশা প্রতিরোধক ব্যবহার, শরীর ঢাকা পোশাক পরা এবং প্রয়োজন অনুযায়ী মশারি ব্যবহারের মাধ্যমে ঝুঁকি কমানো যায়।

চলতি বছরে ডেঙ্গুতে ৩৪২ জনের মৃত্যু এবং হাসপাতালে ভর্তি রোগীর সংখ্যা ১ লাখ ১০ হাজার ছাড়িয়ে যাওয়ার ঘটনা জনস্বাস্থ্যের জন্য বড় উদ্বেগের বিষয়। পরিস্থিতি মোকাবিলায় রোগীদের দ্রুত চিকিৎসা নিশ্চিত করার পাশাপাশি মশার প্রজননস্থল ধ্বংস, জনসচেতনতা বৃদ্ধি এবং নিয়মিত প্রতিরোধমূলক কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়া প্রয়োজন।

Tags :

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সর্বশেষ খবর

সম্পাদক ও প্রকাশক : এ বি এম জাকিরুল হক টিটন ।

খবরওয়ালা একটি বিশ্বস্ত অনলাইন নিউজ পোর্টাল, যেখানে বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও আপডেট প্রকাশ করা হয়। রাজনীতি, জাতীয় ও স্থানীয় সংবাদ, শিক্ষা, খেলাধুলা, ব্যবসা, বিনোদন ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনের গুরুত্বপূর্ণ খবর নিয়ে পাঠকদের জন্য রয়েছে নির্ভরযোগ্য ও সময়োপযোগী সংবাদ পরিবেশন।

© ২০২৬ খবরওয়ালা। সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।