শুক্রবার (১৬ অক্টোবর) রাতে প্রকাশিত এক নির্বাহী আদেশে ট্রাম্প জানান, যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় স্বার্থ বিবেচনায় নিয়ে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, সংশ্লিষ্ট আইনে নির্ধারিত নিষেধাজ্ঞা, বিধিনিষেধ ও শুল্ক প্রয়োগ আপাতত স্থগিত রাখা হচ্ছে। এ বিষয়ে তিনি মার্কিন কংগ্রেসকে আনুষ্ঠানিকভাবে অবহিত করেছেন বলেও আদেশে উল্লেখ করেন।
তবে এই সিদ্ধান্তকে শুল্ক আরোপের পরিকল্পনা পুরোপুরি বাতিল হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। বরং এটি কার্যকর করার প্রক্রিয়া সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা হয়েছে। পরিস্থিতি পরিবর্তিত হলে ট্রাম্প ভবিষ্যতে আবারও এসব শুল্ক ও নিষেধাজ্ঞা কার্যকরের সিদ্ধান্ত নিতে পারেন।
কোন আইনের আওতায় শুল্ক আরোপের পরিকল্পনা ছিল
রাশিয়ার ওপর চাপ বাড়ানোর লক্ষ্যে প্রণীত ‘লিন্ডসে ও. গ্রাহাম স্যাংশনিং রাশিয়া অ্যান্ড ইরান অ্যাক্ট’ ঘিরেই এই শুল্ক আরোপের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। আইনটির নামকরণ করা হয়েছে মার্কিন সিনেটর লিন্ডসে গ্রাহামের নামে। তিনি রাশিয়ার বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান এবং ইউক্রেনকে সমর্থনের জন্য পরিচিত ছিলেন।
আইনটিতে ট্রাম্পকে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে রাশিয়ার অপরিশোধিত তেলের শীর্ষ পাঁচ ক্রেতা—চীন, ভারত, স্লোভাকিয়া, হাঙ্গেরি ও আজারবাইজান—থেকে যুক্তরাষ্ট্রে আসা পণ্যের ওপর ১০০ শতাংশ শুল্ক আরোপের সুযোগ দেওয়ার কথা বলা হয়েছিল। পাশাপাশি রাশিয়ার বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানকে নিষেধাজ্ঞার আওতায় আনা এবং রাশিয়া থেকে যুক্তরাষ্ট্রে আমদানি করা জ্বালানি পণ্যের ওপর সর্বোচ্চ ৫০০ শতাংশ শুল্ক আরোপের বিধানও এতে রাখা হয়েছিল।
প্রদত্ত সংবাদ অনুযায়ী, এসব পদক্ষেপ কার্যকরের জন্য নির্ধারিত ৩০ দিনের সময়সীমা ১৮ অক্টোবর শেষ হওয়ার কথা ছিল। ফলে নির্ধারিত সময়ের ঠিক আগে ট্রাম্পের স্থগিতাদেশের সিদ্ধান্ত বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে।
রাশিয়ার অর্থনৈতিক সক্ষমতা কমানোই লক্ষ্য
আইনটির মূল উদ্দেশ্য ছিল ইউক্রেনের বিরুদ্ধে রাশিয়ার যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার অর্থনৈতিক সক্ষমতা দুর্বল করা। রাশিয়ার জ্বালানি রপ্তানি দেশটির বৈদেশিক আয়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ উৎস। বিশেষ করে অপরিশোধিত তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাস বিক্রি থেকে পাওয়া অর্থ রুশ অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
এই প্রেক্ষাপটে রাশিয়ার সঙ্গে জ্বালানি বাণিজ্য চালিয়ে যাওয়া দেশগুলোর ওপর শুল্ক আরোপের পরিকল্পনা করা হয়েছিল। এর মাধ্যমে মস্কোর তেল ও গ্যাসের ওপর নির্ভরশীলতা কমাতে ক্রেতা দেশগুলোর ওপর চাপ সৃষ্টির লক্ষ্য ছিল। একই সঙ্গে রুশ সরকারি কর্মকর্তা, ব্যাংক, জ্বালানি খাতের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান এবং রাশিয়ার সামরিক অভিযানকে সহায়তাকারী বিদেশি সংস্থাগুলোর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগও রাখা হয়েছিল।
আইনটিতে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন এবং দেশটির সরকারের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধেও নিষেধাজ্ঞার বিষয় অন্তর্ভুক্ত ছিল।
ভারত ও চীনের জন্য কেন গুরুত্বপূর্ণ এই সিদ্ধান্ত
ভারত ও চীন রাশিয়ার বড় অপরিশোধিত তেল ক্রেতাদের মধ্যে রয়েছে। রাশিয়ার তেল আমদানির ওপর নির্ভরশীলতার কারণে দেশ দুটি নতুন মার্কিন শুল্কের ঝুঁকিতে পড়েছিল। প্রস্তাবিত ১০০ শতাংশ শুল্ক কার্যকর হলে যুক্তরাষ্ট্রে তাদের পণ্য রপ্তানির ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যেতে পারত। এতে সংশ্লিষ্ট পণ্যের প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা কমে যাওয়ার পাশাপাশি রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপরও চাপ তৈরি হওয়ার আশঙ্কা ছিল।
শুল্ক স্থগিত রাখার ফলে আপাতত সেই তাৎক্ষণিক ঝুঁকি কমেছে। তবে দীর্ঘমেয়াদে ভারত ও চীনের জ্বালানি আমদানি নীতি এবং যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্কের ওপর বিষয়টি প্রভাব ফেলতে পারে।
প্রস্তাবিত পদক্ষেপের আওতায় আরও কয়েকটি দেশ ঝুঁকিতে ছিল। ফলে সিদ্ধান্তটি শুধু ভারত ও চীনের জন্য নয়, রাশিয়ার জ্বালানি বাণিজ্যের সঙ্গে যুক্ত অন্যান্য দেশের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ।
ট্রাম্পের নির্বাহী আদেশে আপাতত শুল্ক কার্যকরের পথ বন্ধ রাখা হলেও ভবিষ্যৎ নীতির বিষয়ে অনিশ্চয়তা রয়ে গেছে। যুক্তরাষ্ট্র রাশিয়ার ওপর অর্থনৈতিক চাপ বাড়ানোর কৌশল আবার সক্রিয় করলে সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর বাণিজ্যিক হিসাব-নিকাশেও পরিবর্তন আসতে পারে।


