আইডিএ তহবিলে প্রথমবারের মতো দাতা হলো মঙ্গোলিয়া

বিশ্বব্যাংক গ্রুপের স্বল্প আয়ের দেশগুলোর উন্নয়ন সহায়তা তহবিল ইন্টারন্যাশনাল ডেভেলপমেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের (আইডিএ) দাতা হিসেবে যুক্ত হয়েছে মঙ্গোলিয়া। দেশটির সংসদ এই তহবিলে ৪৮০ কোটি মঙ্গোলীয় তুগরিক, যা প্রায় ১৩ লাখ মার্কিন ডলারের সমান, দেওয়ার অনুমোদন দিয়েছে। উন্নয়ন সহায়তা গ্রহণকারী দেশ থেকে আন্তর্জাতিক উন্নয়ন তহবিলের দাতা হিসেবে মঙ্গোলিয়ার এই যাত্রাকে দেশটির অর্থনৈতিক অগ্রগতি ও বৈশ্বিক অংশীদারত্বের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে দেখা হচ্ছে।

শনিবার (১৭ অক্টোবর) ব্যাংককে বিশ্বব্যাংক গ্রুপের প্রকাশিত এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে মঙ্গোলিয়ার এই অবদানের বিষয়টি জানানো হয়। আইডিএর ২১তম পুনরর্থায়ন কর্মসূচি বা আইডিএ২১-এর আওতায় অর্থ দেওয়ার সিদ্ধান্তের মধ্য দিয়ে আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সহযোগিতায় নতুন ভূমিকা নিতে যাচ্ছে দেশটি। এর মাধ্যমে মঙ্গোলিয়া শুধু নিজস্ব উন্নয়নের অভিজ্ঞতাই তুলে ধরছে না, বরং স্বল্প আয়ের দেশগুলোর উন্নয়নেও অবদান রাখার অঙ্গীকার প্রকাশ করছে।

উন্নয়ন সহায়তা গ্রহণ থেকে দাতা হওয়ার যাত্রা

১৯৯১ সালে বিশ্বব্যাংক গ্রুপের সদস্য হওয়ার পর থেকে মঙ্গোলিয়া ১ হাজার ৬২০ কোটি মার্কিন ডলারের বেশি উন্নয়ন অর্থায়ন পেয়েছে। পরিবহন অবকাঠামো, গ্রামীণ উন্নয়ন, স্বাস্থ্য ও শিক্ষাসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ খাতে এসব অর্থায়ন ব্যবহার করা হয়েছে। দীর্ঘ সময় ধরে আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সহযোগিতার সহায়তা নিয়ে দেশটি অর্থনৈতিক ও সামাজিক অগ্রগতির পথে এগিয়েছে।

মঙ্গোলিয়ার উন্নয়নযাত্রায় একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আসে ২০২০ সালের জুলাইয়ে। ওই সময় দেশটি আইডিএর সহায়তা গ্রহণকারী দেশগুলোর তালিকা থেকে উত্তরণ ঘটায়। এরপর থেকে বিশ্বব্যাংক গ্রুপের আন্তর্জাতিক পুনর্গঠন ও উন্নয়ন ব্যাংক (আইবিআরডি)-এর আওতায় অর্থায়ন গ্রহণ করছে মঙ্গোলিয়া। আইবিআরডি মূলত মধ্যম আয়ের ও ঋণ গ্রহণে সক্ষম দেশগুলোকে উন্নয়ন অর্থায়ন ও সংশ্লিষ্ট সহায়তা দিয়ে থাকে।

গত তিন দশকে দেশটি দারিদ্র্য হ্রাস এবং অর্থনৈতিক সক্ষমতা বৃদ্ধিতে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে। মাথাপিছু মোট দেশজ উৎপাদন (জিডিপি) তিন গুণে উন্নীত হয়েছে। এর ধারাবাহিকতায় ২০২৪ সালে মঙ্গোলিয়া উচ্চমধ্যম আয়ের দেশের মর্যাদা অর্জন করে।

তবে অর্থনৈতিক অগ্রগতি অর্জনের পরও উন্নয়ন ধরে রাখা, সামাজিক বৈষম্য মোকাবিলা এবং অর্থনীতির দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করার মতো চ্যালেঞ্জ দেশটির সামনে রয়েছে। আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সহযোগিতায় অবদান রাখার সিদ্ধান্তকে এই বৃহত্তর প্রেক্ষাপটেও দেখা হচ্ছে।

আন্তর্জাতিক সংহতির প্রতিশ্রুতি

মঙ্গোলিয়ার অর্থমন্ত্রী মেন্দসাইখান জাগদজাভ বলেছেন, আইডিএ২১-এ দেশটির অবদান বিশ্বব্যাংকের সঙ্গে দীর্ঘদিনের অংশীদারত্বের ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক। একই সঙ্গে এটি আন্তর্জাতিক সংহতির প্রতি মঙ্গোলিয়ার অঙ্গীকারের প্রতিফলন।

তিনি বলেন, আইডিএর সহায়তা থেকে সরাসরি উপকৃত হওয়ার অভিজ্ঞতা মঙ্গোলিয়াকে সহজ শর্তে উন্নয়ন অর্থায়নের গুরুত্ব উপলব্ধি করতে সাহায্য করেছে। দারিদ্র্য কমানো, অর্থনৈতিক ও সামাজিক সংকট মোকাবিলায় সক্ষমতা বাড়ানো এবং মানুষের জন্য নতুন সুযোগ তৈরিতে এ ধরনের অর্থায়ন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

অর্থমন্ত্রী আরও বলেন, নিজেদের উন্নয়ন অগ্রাধিকার বাস্তবায়নের পাশাপাশি অন্য দেশগুলোকে তাদের উন্নয়ন লক্ষ্য অর্জনে সহায়তা করতে পারা মঙ্গোলিয়ার জন্য গর্বের বিষয়।

বিশ্বব্যাংকের অংশীদারত্ব, উদ্ভাবন ও সম্পদ সংগ্রহবিষয়ক ভাইস প্রেসিডেন্ট লিসা ফিনেরানও মঙ্গোলিয়ার এই সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়েছেন। তাঁর মতে, দেশটির উন্নয়ন অগ্রগতি দেখিয়েছে, ধারাবাহিক প্রচেষ্টা ও দীর্ঘমেয়াদি অংশীদারত্বের মাধ্যমে কী অর্জন করা সম্ভব। আইডিএর দাতা গোষ্ঠীতে মঙ্গোলিয়াকে স্বাগত জানিয়ে তিনি বলেন, অন্য দেশগুলোর সমৃদ্ধ ভবিষ্যৎ গড়ে তুলতে দেশটির অঙ্গীকারের জন্য বিশ্বব্যাংক কৃতজ্ঞ।

আইডিএ তহবিল কেন গুরুত্বপূর্ণ

ইন্টারন্যাশনাল ডেভেলপমেন্ট অ্যাসোসিয়েশন বিশ্বব্যাংক গ্রুপের একটি গুরুত্বপূর্ণ সংস্থা। এটি স্বল্প আয়ের দেশগুলোকে অনুদান এবং সহজ শর্তে ঋণ দিয়ে থাকে। বর্তমানে সংস্থাটি ৭৮টি দেশের উন্নয়ন কার্যক্রমে অর্থায়ন করছে।

আইডিএর সহায়তার প্রধান লক্ষ্য হলো দারিদ্র্য হ্রাস, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবার উন্নয়ন, অবকাঠামো নির্মাণ, অর্থনৈতিক ও সামাজিক সংকট মোকাবিলার সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং মানুষের জীবনযাত্রার মান উন্নত করা। সাধারণ বাণিজ্যিক ঋণের তুলনায় আইডিএর অর্থায়নের শর্ত তুলনামূলক সহজ হওয়ায় সীমিত আর্থিক সামর্থ্যের দেশগুলো উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নের সুযোগ পায়।

প্রতি তিন বছর পরপর আইডিএর অর্থায়ন পুনর্গঠন করা হয়। এ সময় দাতা দেশগুলোর নতুন অবদান এবং বিদ্যমান সংস্থানের ভিত্তিতে পরবর্তী পর্যায়ের উন্নয়ন কার্যক্রমের জন্য অর্থ সংগ্রহ করা হয়। আইডিএর ২১তম পুনরর্থায়ন কর্মসূচি, আইডিএ২১, ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে চূড়ান্ত হয়। এই কর্মসূচির মাধ্যমে স্বল্প আয়ের দেশগুলোতে উন্নয়ন কার্যক্রম অব্যাহত রাখার জন্য প্রয়োজনীয় অর্থের সংস্থান করা হচ্ছে।

মঙ্গোলিয়ার অবদানের আর্থিক পরিমাণ তুলনামূলকভাবে সীমিত হলেও এর তাৎপর্য কেবল অর্থের অঙ্কে সীমাবদ্ধ নয়। যে দেশ একসময় আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সহায়তার ওপর নির্ভরশীল ছিল, সেই দেশ এখন অন্য দেশের উন্নয়নে অর্থ দিচ্ছে—এটি উন্নয়ন সহযোগিতার ক্ষেত্রে একটি উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন। মঙ্গোলিয়ার এই পদক্ষেপ অন্য উদীয়মান অর্থনীতিগুলোকেও আন্তর্জাতিক উন্নয়ন তহবিলে অবদান রাখতে উৎসাহিত করতে পারে।

বিশ্বব্যাংকের জন্যও এই অংশগ্রহণ তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ, আইডিএর মতো তহবিলের কার্যক্রমে দাতা দেশের অংশগ্রহণ বাড়লে আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সহযোগিতার ভিত্তি আরও বিস্তৃত হয়। তবে আইডিএর সামগ্রিক কার্যকারিতা নির্ভর করবে পর্যাপ্ত অর্থায়ন, সঠিক অগ্রাধিকার নির্ধারণ এবং সহায়তাপ্রাপ্ত দেশগুলোতে উন্নয়ন প্রকল্পের কার্যকর বাস্তবায়নের ওপর।

মঙ্গোলিয়ার এই সিদ্ধান্ত তাই দেশটির অর্থনৈতিক অগ্রগতির স্বীকৃতির পাশাপাশি আন্তর্জাতিক দায়িত্ব ভাগ করে নেওয়ার একটি দৃষ্টান্ত। নিজস্ব উন্নয়নের অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে অন্য দেশগুলোর দারিদ্র্য হ্রাস ও অর্থনৈতিক সক্ষমতা বৃদ্ধিতে সহায়তা করার যে অঙ্গীকার দেশটি করেছে, তার বাস্তব প্রভাব নির্ভর করবে ভবিষ্যতে এই সহযোগিতা কতটা ধারাবাহিক ও কার্যকর থাকে তার ওপর।

Tags :

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সর্বশেষ খবর

সম্পাদক ও প্রকাশক : এ বি এম জাকিরুল হক টিটন ।

খবরওয়ালা একটি বিশ্বস্ত অনলাইন নিউজ পোর্টাল, যেখানে বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও আপডেট প্রকাশ করা হয়। রাজনীতি, জাতীয় ও স্থানীয় সংবাদ, শিক্ষা, খেলাধুলা, ব্যবসা, বিনোদন ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনের গুরুত্বপূর্ণ খবর নিয়ে পাঠকদের জন্য রয়েছে নির্ভরযোগ্য ও সময়োপযোগী সংবাদ পরিবেশন।

© ২০২৬ খবরওয়ালা। সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।