বীর মুক্তিযোদ্ধা ও বিশিষ্ট চিত্রশিল্পী সাঈদা কামাল আর নেই। রোববার (১৮ অক্টোবর) সকাল সাড়ে সাতটার দিকে রাজধানীর একটি বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি শেষনিশ্বাস ত্যাগ করেন। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৭৪ বছর। তাঁর মৃত্যুতে দেশের শিল্পাঙ্গন ও মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট মহলে শোকের আবহ তৈরি হয়েছে।
সাঈদা কামাল ছিলেন কবি সুফিয়া কামালের মেয়ে এবং সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠান আমরাই পারি-এর চেয়ারপারসন সুলতানা কামালের ছোট বোন। শিল্পী হিসেবে তাঁর পরিচিতির পাশাপাশি ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে সক্রিয় ভূমিকার জন্যও তিনি স্মরণীয় হয়ে থাকবেন। সৃজনশীল শিল্পচর্চা ও মুক্তিযুদ্ধের সময় মানবিক দায়িত্ব পালনের মধ্য দিয়ে তিনি দেশের ইতিহাসে নিজের অবস্থান তৈরি করেছিলেন।
পরিবারের সদস্য সুলতানা কামাল জানান, নিউমোনিয়া ও কিডনিসংক্রান্ত জটিলতায় আক্রান্ত হয়ে সাঈদা কামাল চিকিৎসাধীন ছিলেন। শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে গত শনিবার তাঁকে রাজধানীর একটি হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। পরে ওই দিন রাত থেকে তাঁকে লাইফ সাপোর্টে রাখা হয়েছিল। চিকিৎসাধীন অবস্থায় রোববার সকালে তাঁর মৃত্যু হয়।
মরহুমার মরদেহ রাজধানীর বারডেম হাসপাতালের হিমঘরে রাখা হয়েছে। তাঁর একমাত্র মেয়ে যুক্তরাজ্য থেকে দেশে ফেরার পর আগামী মঙ্গলবার রাজধানীর আজিমপুর কবরস্থানে তাঁকে দাফন করার কথা রয়েছে। পারিবারিক সিদ্ধান্ত অনুযায়ী দাফনের এ সময়সূচি নির্ধারণ করা হয়েছে।
শিল্পচর্চায় স্বতন্ত্র পরিচিতি
সাঈদা কামাল দেশের চারুশিল্পের অঙ্গনে নিজের সৃজনশীল কাজের মাধ্যমে অবদান রেখেছেন। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে চারুকলায় পড়াশোনা করেন। পরে ভারতের শান্তিনিকেতনের কলাভবনে নকশা বিষয়ে প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের মধ্য দিয়ে অর্জিত দক্ষতাকে কাজে লাগিয়ে তিনি চিত্রকলা ও নকশার চর্চায় যুক্ত ছিলেন।
তাঁর শিল্পকর্মের পরিচিতি দেশের গণ্ডি ছাড়িয়ে বিদেশেও পৌঁছেছিল। দেশ-বিদেশে তাঁর একক ও যৌথ চিত্রপ্রদর্শনী অনুষ্ঠিত হয়েছে। এসব প্রদর্শনীতে অংশগ্রহণের মধ্য দিয়ে তিনি নিজের শিল্পভাবনা তুলে ধরার পাশাপাশি বাংলাদেশের চারুশিল্পের পরিসরেও অবদান রাখেন।
চিত্রশিল্পী হিসেবে তাঁর পরিচয় কেবল প্রদর্শনীতে অংশগ্রহণের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না। শিল্পকলায় শিক্ষা, নকশাবিষয়ক প্রশিক্ষণ এবং দীর্ঘদিনের সৃজনশীল কর্মকাণ্ড তাঁর জীবনকে শিল্পচর্চার সঙ্গে নিবিড়ভাবে যুক্ত করেছিল। তাঁর প্রয়াণে দেশের শিল্পাঙ্গন একজন অভিজ্ঞ শিল্পীকে হারাল।
মুক্তিযুদ্ধের রণাঙ্গনে মানবিক দায়িত্ব
১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় সাঈদা কামাল তাঁর বড় বোন সুলতানা কামালের সঙ্গে বাংলাদেশ ফিল্ড হাসপাতালে কাজ করেন। মুক্তিযুদ্ধের সেই সংকটময় সময়ে আহত ও অসুস্থ মানুষের চিকিৎসাসেবায় ফিল্ড হাসপাতালগুলো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল। যুদ্ধের ভয়াবহ পরিস্থিতিতে চিকিৎসাসেবার সঙ্গে যুক্ত থাকা ছিল সাহস, দায়িত্ববোধ ও মানবিকতার পরিচয়।
মুক্তিযুদ্ধে তাঁর এই অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ তিনি মুক্তিযুদ্ধের সর্বাধিনায়কের বিশেষ প্রশংসাপত্র—‘সিনসি’স স্পেশাল কমেন্ডেশন’ (CinC’s Special Commendation)—লাভ করেন। এই স্বীকৃতি মুক্তিযুদ্ধের সময় তাঁর দায়িত্ব পালনের গুরুত্ব তুলে ধরে।
মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে সামরিক অভিযান ও সম্মুখযুদ্ধের পাশাপাশি চিকিৎসাসেবা, আশ্রয়, সহায়তা এবং আহতদের পরিচর্যার মতো মানবিক কার্যক্রমও বিশেষ তাৎপর্য বহন করে। বাংলাদেশ ফিল্ড হাসপাতালে সাঈদা কামালের ভূমিকা সেই বৃহত্তর ইতিহাসেরই অংশ। তাঁর জীবনের এই অধ্যায় প্রমাণ করে, দেশের স্বাধীনতার সংগ্রামে বিভিন্ন পেশা ও পরিচয়ের মানুষ নিজ নিজ অবস্থান থেকে অবদান রেখেছেন।
স্মরণে থাকবে বহুমাত্রিক জীবন
সাঈদা কামালের জীবনকে দুটি গুরুত্বপূর্ণ পরিচয়ের মধ্য দিয়ে দেখা যায়—একদিকে তিনি ছিলেন চারুশিল্পী, অন্যদিকে মহান মুক্তিযুদ্ধে দায়িত্ব পালনকারী একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা। শিল্পকলার চর্চা এবং মুক্তিযুদ্ধের সময় মানবিক কাজে অংশগ্রহণ—দুই ক্ষেত্রেই তাঁর ভূমিকা তাঁকে স্বতন্ত্র পরিচিতি দিয়েছে।
কবি সুফিয়া কামালের পরিবারের সদস্য হিসেবে তিনি দেশের সাংস্কৃতিক ও সামাজিক পরিমণ্ডলের সঙ্গেও যুক্ত ছিলেন। তবে নিজের শিল্পকর্ম এবং মুক্তিযুদ্ধকালীন অবদানের মধ্য দিয়ে তিনি আলাদা পরিচয় গড়ে তোলেন।
তাঁর মৃত্যুর মধ্য দিয়ে একটি সৃজনশীল জীবনের অবসান ঘটল। রেখে গেলেন শিল্পকলায় কাজের স্মৃতি এবং স্বাধীনতার সংগ্রামে অংশগ্রহণের ইতিহাস। বাংলাদেশের চারুশিল্প ও মুক্তিযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে সাঈদা কামালের অবদান তাঁকে স্মরণীয় করে রাখবে।



