যাত্রাবাড়ীতে চালকের চোখ নষ্টের মামলায় আনিসুল-পলক ফের গ্রেপ্তার

২০২৪ সালের বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সময় রাজধানীর যাত্রাবাড়ীতে গুলিতে এক চালকের বাঁ চোখ নষ্ট হওয়ার ঘটনায় দায়ের করা হত্যাচেষ্টা মামলায় সাবেক আইনমন্ত্রী আনিসুল হক ও সাবেক তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি (আইসিটি) প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহমেদ পলককে ফের গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে। রোববার (১৮ অক্টোবর) দুপুরে শুনানি শেষে ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট সারাহ ফারজানা হক এ আদেশ দেন।

রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী মুহাম্মদ শামছুদ্দোহা সুমন বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। মামলার তদন্ত কর্মকর্তা তাঁদের এ ঘটনায় জড়িত থাকার প্রাথমিক সাক্ষ্য-প্রমাণ পাওয়ার কথা উল্লেখ করে গ্রেপ্তার দেখানোর আবেদন করেছিলেন। উভয় পক্ষের আইনজীবীদের বক্তব্য শোনার পর আদালত আবেদনটি মঞ্জুর করেন।

আনিসুল হক ও জুনাইদ আহমেদ পলক বর্তমানে অন্য একটি হত্যা মামলায় গ্রেপ্তার হয়ে কারাগারে রয়েছেন। নতুন আদেশের ফলে যাত্রাবাড়ীতে চালকের চোখ হারানোর ঘটনায় করা মামলাতেও তাঁদের আনুষ্ঠানিকভাবে গ্রেপ্তার দেখানো হলো।

তদন্ত কর্মকর্তার আবেদনে যেসব তথ্য

মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ও যাত্রাবাড়ী থানার উপপরিদর্শক আওলাদ হুসাইন গত ৩০ সেপ্টেম্বর আদালতে তাঁদের গ্রেপ্তার দেখানোর আবেদন করেন। আবেদনে বলা হয়, ২০২৪ সালের বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন দমনে তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকারের পক্ষে আনিসুল হক ও জুনাইদ আহমেদ পলক সক্রিয় ভূমিকা পালন করেছিলেন।

তদন্ত কর্মকর্তার আবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়, মামলার তদন্তে তাঁদের সম্পৃক্ততার প্রাথমিক সাক্ষ্য-প্রমাণ পাওয়া গেছে। মামলার সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ তদন্তের স্বার্থে তাঁদের এ মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো প্রয়োজন বলে আবেদন করা হয়।

আদালতে আসামিপক্ষের আইনজীবী ফারজানা ইয়াসমিন রাখিসহ অন্য আইনজীবীরা গ্রেপ্তার দেখানোর আবেদনের বিরোধিতা করেন। অন্যদিকে রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী মুহাম্মদ শামছুদ্দোহা সুমন আবেদনের পক্ষে যুক্তি উপস্থাপন করেন। উভয় পক্ষের বক্তব্য শোনার পর আদালত গ্রেপ্তার দেখানোর আবেদন মঞ্জুর করেন।

তবে তদন্ত কর্মকর্তার আবেদনে উল্লিখিত অভিযোগ ও প্রাথমিক সাক্ষ্য-প্রমাণের বিষয়গুলো তদন্তের অংশ। আদালতের এ আদেশকে অভিযোগের চূড়ান্ত সত্যতা নির্ধারণ বা আসামিদের অপরাধ প্রমাণিত হওয়ার সিদ্ধান্ত হিসেবে বিবেচনা করার সুযোগ নেই। মামলার পরবর্তী তদন্ত ও বিচারিক প্রক্রিয়ায় অভিযোগের সত্যতা যাচাই করা হবে।

১৮ জুলাই যাত্রাবাড়ীতে গুলিবর্ষণের অভিযোগ

মামলার অভিযোগ অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ১৮ জুলাই সকাল ৯টা থেকে বাদীর বন্ধু হোসেন, খোকন, আরিফসহ অনেকে রাজধানীর যাত্রাবাড়ী এলাকায় বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে অংশ নেন। সেদিন বিকেল ৩টার দিকে যাত্রাবাড়ী থানার সামনে ফ্লাইওভারের ওপর অবস্থানকালে আন্দোলনকারীদের লক্ষ্য করে গুলিবর্ষণ করা হয় বলে অভিযোগে উল্লেখ রয়েছে।

এ সময় মামলার বাদী মামুনের শরীরের বিভিন্ন অংশ, বাঁ চোখ ও মাথায় গুলি লাগে। গুরুতর আহত অবস্থায় তাঁকে প্রথমে যাত্রাবাড়ীর কাজলা ইসলামিয়া হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেখানে প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়ার পর তাঁকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।

তিন দিন ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন থাকার পর মামুনের বাঁ চোখের অবস্থার অবনতি ঘটে। পরে তাঁকে জাতীয় চক্ষু হাসপাতালে নেওয়া হয়। চিকিৎসার একপর্যায়ে তাঁর বাঁ চোখ সম্পূর্ণ নষ্ট হয়ে যায় বলে মামলার অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।

চোখ হারানোর এই ঘটনাকে কেন্দ্র করেই হত্যাচেষ্টা মামলা দায়ের করা হয়। মামলার তদন্তে গুলিবর্ষণের পরিস্থিতি, আহত হওয়ার ঘটনা এবং এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ভূমিকা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

বৈষম্যবিরোধী আন্দোলন ঘিরে মামলার প্রেক্ষাপট

২০২৪ সালের জুলাইয়ে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনকে কেন্দ্র করে রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় সংঘর্ষ, গুলিবর্ষণ ও হতাহতের ঘটনা ঘটে। যাত্রাবাড়ীও ওই সময় আন্দোলন ও সংঘাতের অন্যতম আলোচিত এলাকা হয়ে ওঠে। আন্দোলনকারীদের ওপর গুলিবর্ষণ এবং হতাহতের বিভিন্ন ঘটনায় পরে একাধিক মামলা দায়ের করা হয়।

সাবেক আইনমন্ত্রী আনিসুল হক ও সাবেক আইসিটি প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহমেদ পলকের বিরুদ্ধে বিভিন্ন মামলায় অভিযোগ তদন্ত করা হচ্ছে। তাঁরা আগে থেকেই অন্য একটি হত্যা মামলায় কারাগারে আটক থাকায় নতুন মামলায় গ্রেপ্তার দেখানোর জন্য তদন্ত কর্মকর্তাকে আদালতের শরণাপন্ন হতে হয়েছে।

কোনো আসামি একটি মামলায় কারাগারে থাকলেও তাঁর বিরুদ্ধে অন্য মামলায় অভিযোগের ভিত্তিতে আইনগত পদক্ষেপ নেওয়ার সুযোগ রয়েছে। তবে প্রতিটি মামলায় অভিযোগের ধরন, তদন্তের অগ্রগতি এবং আদালতের আদেশ আলাদাভাবে বিবেচিত হয়।

যাত্রাবাড়ীর এ মামলায় আদালতের সর্বশেষ আদেশের পর তদন্তের পরবর্তী ধাপ এবং অভিযোগের পক্ষে উপস্থাপিত সাক্ষ্য-প্রমাণ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে। মামুনের বাঁ চোখ হারানোর ঘটনায় কারা জড়িত ছিলেন, গুলিবর্ষণের নির্দেশ বা পরিকল্পনায় কারও ভূমিকা ছিল কি না এবং অভিযুক্ত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণের মতো পর্যাপ্ত তথ্য রয়েছে কি না—এসব প্রশ্নের নিষ্পত্তি হবে তদন্ত ও বিচারিক প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে।

আদালত আপাতত আনিসুল হক ও জুনাইদ আহমেদ পলককে এ মামলায় গ্রেপ্তার দেখানোর আবেদন মঞ্জুর করেছেন। তাঁদের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগের চূড়ান্ত নিষ্পত্তি এখনো হয়নি।

Tags :

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সর্বশেষ খবর

সম্পাদক ও প্রকাশক : এ বি এম জাকিরুল হক টিটন ।

খবরওয়ালা একটি বিশ্বস্ত অনলাইন নিউজ পোর্টাল, যেখানে বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও আপডেট প্রকাশ করা হয়। রাজনীতি, জাতীয় ও স্থানীয় সংবাদ, শিক্ষা, খেলাধুলা, ব্যবসা, বিনোদন ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনের গুরুত্বপূর্ণ খবর নিয়ে পাঠকদের জন্য রয়েছে নির্ভরযোগ্য ও সময়োপযোগী সংবাদ পরিবেশন।

© ২০২৬ খবরওয়ালা। সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।