কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআইয়ের ব্যবহার বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভুয়া পরিচয়, নকল ছবি, প্রতারণামূলক ভিডিও ও বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকিও বাড়ছে। এসবের কারণে সাধারণ ব্যবহারকারী থেকে শুরু করে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান পর্যন্ত প্রতারণার শিকার হচ্ছে। এমন পরিস্থিতিতে প্রকৃত ব্যবহারকারীদের পরিচয় শনাক্ত করার সুযোগ বাড়াতে বিনা মূল্যে ভেরিফায়েড ব্যাজ চালুর উদ্যোগ নিয়েছে ফেসবুকের মূল প্রতিষ্ঠান মেটা। তবে এই সুবিধা পেতে হলে ব্যবহারকারীদের নির্দিষ্ট কিছু শর্ত পূরণ করতে হবে এবং নিজের পরিচয় যাচাইয়ের প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে হবে।
প্রযুক্তিবিষয়ক সংবাদমাধ্যম এনগ্যাজেটের এক প্রতিবেদনে এ উদ্যোগের কথা জানানো হয়েছে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, নতুন এই ব্যবস্থায় ব্যবহারকারীর পরিচয় যাচাই করতে সেলফি ভিডিও ব্যবহার করা হবে। এর মাধ্যমে ফেসবুকের প্রোফাইলের ছবি এবং অ্যাকাউন্ট ব্যবহারকারীর মুখাবয়বের মধ্যে মিল আছে কি না, তা পরীক্ষা করা হবে। পরিচয় যাচাই সফল হলে সংশ্লিষ্ট ব্যবহারকারী ভেরিফায়েড ব্যাজ পাওয়ার যোগ্য হবেন।
কেন বিনা মূল্যে ভেরিফায়েড ব্যাজ চালুর উদ্যোগ?
বর্তমানে এআই প্রযুক্তির সাহায্যে বাস্তব মানুষের মতো দেখতে ছবি, ভিডিও এবং বিশ্বাসযোগ্য ভুয়া প্রোফাইল তৈরি করা আগের তুলনায় অনেক সহজ হয়েছে। এসব ভুয়া পরিচয় ব্যবহার করে প্রতারকেরা মানুষের আস্থা অর্জন, অর্থ আত্মসাৎ, ব্যক্তিগত তথ্য সংগ্রহ এবং মিথ্যা তথ্য ছড়ানোর চেষ্টা করছে।
বিশেষ করে পরিচিত ব্যক্তি, ব্যবসায়ী কিংবা সাধারণ ব্যবহারকারীর নামে নকল অ্যাকাউন্ট তৈরি করে প্রতারণার ঘটনা অনলাইন নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ বাড়িয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে ভুয়া অ্যাকাউন্টের আড়ালে থাকা ব্যক্তিকে শনাক্ত করাও কঠিন হয়ে পড়ে।
এই পরিস্থিতিতে ফেসবুকের নতুন পরিচয় যাচাই ব্যবস্থা ব্যবহারকারীদের সামনে একটি বাড়তি শনাক্তকরণ সংকেত তুলে ধরতে পারে। কোনো প্রোফাইলে ভেরিফায়েড ব্যাজ থাকলে ব্যবহারকারীরা বুঝতে পারবেন, সংশ্লিষ্ট অ্যাকাউন্টের পরিচয় যাচাই করা হয়েছে। তবে এই ব্যবস্থা অনলাইন প্রতারণার সব ঝুঁকি দূর করবে, এমন নিশ্চয়তা নেই।
কীভাবে পাওয়া যাবে বিনা মূল্যের ব্যাজ?
নতুন ভেরিফায়েড ব্যাজ পাওয়ার জন্য ব্যবহারকারীকে নিজের সেলফি ভিডিও ধারণ করে পরিচয় যাচাইয়ের প্রক্রিয়ায় অংশ নিতে হবে। এই ভিডিওর সঙ্গে ফেসবুক প্রোফাইলে ব্যবহৃত ছবির মিল পরীক্ষা করা হবে। যাচাইয়ের মাধ্যমে অ্যাকাউন্টের পেছনে প্রকৃত ব্যক্তি রয়েছেন কি না, তা নিশ্চিত করার চেষ্টা করা হবে।
পরিচয় যাচাই সফল হলে সংশ্লিষ্ট প্রোফাইলে ভেরিফায়েড ব্যাজ যুক্ত হতে পারে। এর ফলে ফেসবুকের বিভিন্ন স্থানে অ্যাকাউন্টটির পরিচয় যাচাইয়ের তথ্য দেখা যেতে পারে। প্রতিবেদনে প্রোফাইল, মার্কেটপ্লেস, গ্রুপ এবং ফেসবুক ডেটিংয়ের মতো ক্ষেত্রের কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
তবে ফিচারটি এখনই সবার জন্য উন্মুক্ত—এমনটি ধরে নেওয়া ঠিক হবে না। মেটা জানিয়েছে, এটি ধাপে ধাপে চালু করার পরিকল্পনা রয়েছে। প্রথমে নির্বাচিত কয়েকটি দেশে সুবিধাটি চালুর পর অন্য দেশগুলোতে সম্প্রসারণ করা হতে পারে। কোন কোন দেশে প্রথম পর্যায়ে এটি চালু হবে, সে বিষয়ে প্রতিবেদনে সুনির্দিষ্ট তথ্য দেওয়া হয়নি।
কারা ভেরিফায়েড ব্যাজ পাওয়ার যোগ্য?
নতুন ব্যবস্থায় বিনা মূল্যে ভেরিফায়েড ব্যাজ পেতে ব্যবহারকারীদের বয়স, অ্যাকাউন্টের অবস্থা এবং পরিচয় যাচাইয়ের শর্ত পূরণ করতে হবে।
১. বয়স কমপক্ষে ১৮ বছর হতে হবে: ১৮ বছরের কম বয়সী ব্যবহারকারীরা এই সুবিধার আওতায় পড়বেন না।
২. অ্যাকাউন্টের অবস্থা ভালো থাকতে হবে: ফেসবুকের কমিউনিটি স্ট্যান্ডার্ড অনুযায়ী অ্যাকাউন্টটি গ্রহণযোগ্য অবস্থায় থাকতে হবে। গুরুতর নীতিমালা লঙ্ঘন বা সন্দেহজনক কার্যকলাপের ইতিহাস থাকলে যোগ্যতা বাধাগ্রস্ত হতে পারে।
৩. প্রকৃত পরিচয় নিশ্চিত করতে হবে: ব্যবহারকারীর সেলফি ভিডিও এবং প্রোফাইলের ছবির মধ্যে প্রয়োজনীয় মিল থাকতে হবে। পরিচয় যাচাইয়ে ব্যর্থ হলে ব্যাজ পাওয়া যাবে না।
৪. প্রতারণামূলক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতা থাকা যাবে না: ভুয়া পরিচয়, জালিয়াতি কিংবা বিভ্রান্তিকর কর্মকাণ্ডের প্রমাণ থাকলে অ্যাকাউন্টটি যাচাইয়ের জন্য অযোগ্য বিবেচিত হতে পারে।
যাঁরা এই সুবিধা পাবেন না
বিনা মূল্যে ভেরিফায়েড ব্যাজ চালুর উদ্যোগ থাকলেও সব ধরনের অ্যাকাউন্টের জন্য সুবিধাটি প্রযোজ্য নয়। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, কয়েকটি শ্রেণির ব্যবহারকারী আপাতত এই সুবিধার বাইরে থাকবেন।
১৮ বছরের কম বয়সীরা: বয়সের শর্ত পূরণ না করায় তাঁরা এই ব্যবস্থায় ভেরিফায়েড ব্যাজ পাবেন না।
ফেসবুক পেজের মালিকেরা: নতুন এই পরিচয় যাচাই সুবিধাটি আপাতত ফেসবুক পেজের জন্য চালু করা হয়নি। ফলে ব্যক্তিগত প্রোফাইলের জন্য পরিকল্পিত এই ব্যবস্থাকে পেজের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য ধরে নেওয়া যাবে না।
প্রফেশনাল মোড চালু থাকা প্রোফাইল: যেসব ব্যক্তিগত প্রোফাইলে প্রফেশনাল মোড চালু রয়েছে, সেগুলোর ক্ষেত্রে এই সুবিধা প্রযোজ্য নয় বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
নীতিমালা লঙ্ঘনকারী অ্যাকাউন্ট: প্রতারণা, জালিয়াতি কিংবা বিভ্রান্তিকর কার্যকলাপের কারণে ফেসবুকের কমিউনিটি স্ট্যান্ডার্ড লঙ্ঘনকারী অ্যাকাউন্ট এই সুবিধার জন্য যোগ্য হবে না।
ভুয়া পরিচয় ব্যবহারকারী: অ্যাকাউন্টে ভুল পরিচয় দেওয়া হয়েছে কিংবা ব্যবহারকারীর পরিচয় নিয়ে সন্দেহজনক আচরণের প্রমাণ রয়েছে—এমন ক্ষেত্রে যাচাইয়ে বাধা আসতে পারে।
পরিচয় যাচাইয়ে ব্যর্থ ব্যবহারকারী: সেলফি ভিডিওর সঙ্গে প্রোফাইলের ছবির মিল না পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির পরিচয় নিশ্চিত করা সম্ভব হবে না। ফলে তিনি ব্যাজ পাওয়ার যোগ্য হবেন না।
বিনা মূল্যের ব্যাজ কি মেটা ভেরিফায়েডের বিকল্প?
মেটার নতুন এই উদ্যোগকে প্রতিষ্ঠানটির বিদ্যমান সাবস্ক্রিপশনভিত্তিক সেবা ‘মেটা ভেরিফায়েড’-এর সঙ্গে এক করে দেখার সুযোগ নেই। মেটা ভেরিফায়েড একটি অর্থের বিনিময়ে পাওয়া সাবস্ক্রিপশন সেবা। অন্যদিকে, নতুন ব্যবস্থার মূল লক্ষ্য সাধারণ ব্যবহারকারীদের পরিচয় যাচাইয়ের সুযোগ দেওয়া, যেখানে ব্যাজ পাওয়ার জন্য সাবস্ক্রিপশন ফি দিতে হবে না।
তবে দুটি ব্যবস্থার মধ্যে সুবিধা, যাচাইয়ের পদ্ধতি ও প্রাপ্যতার পার্থক্য থাকতে পারে। তাই বিনা মূল্যের ব্যাজ পেলেই মেটা ভেরিফায়েডের সব সুবিধা পাওয়া যাবে, এমন ধারণা করা ঠিক হবে না।
ভেরিফায়েড ব্যাজ থাকলেই কি নিরাপদ?
ভেরিফায়েড ব্যাজ ব্যবহারকারীর পরিচয় যাচাইয়ের একটি সংকেত হলেও এটি সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির সততা, উদ্দেশ্য কিংবা অনলাইন আচরণের নিশ্চয়তা দেয় না। পরিচয় যাচাই করা কোনো ব্যক্তি পরবর্তী সময়ে প্রতারণামূলক আচরণ করবেন না—এমন নিশ্চয়তা এই ব্যাজ দিতে পারে না।
এ কারণে ফেসবুকে কারও প্রোফাইলে ব্যাজ দেখেই তাঁকে সম্পূর্ণ বিশ্বাস করা উচিত নয়। বিশেষ করে অর্থ লেনদেন, ব্যক্তিগত তথ্য আদান-প্রদান, আর্থিক সহায়তার অনুরোধ কিংবা সন্দেহজনক লিংকে প্রবেশের ক্ষেত্রে সতর্ক থাকা জরুরি। পরিচিত কারও নামে অর্থ চাওয়া হলে অন্য কোনো নির্ভরযোগ্য মাধ্যমে তাঁর পরিচয় নিশ্চিত করাও গুরুত্বপূর্ণ।
এআই দিয়ে তৈরি ছবি ও ভিডিও শনাক্ত করা ক্রমেই কঠিন হয়ে উঠছে। একই সঙ্গে ভুয়া পরিচয়ের মাধ্যমে মানুষের বিশ্বাস অর্জনের কৌশলও আরও জটিল হচ্ছে। এমন বাস্তবতায় পরিচয় যাচাইয়ের সুযোগ বাড়ানো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের নিরাপত্তা জোরদারে সহায়ক হতে পারে।
তবে এই উদ্যোগ কতটা কার্যকর হবে, তা নির্ভর করবে যাচাইপ্রক্রিয়ার নির্ভুলতা, অপব্যবহার শনাক্ত করার সক্ষমতা এবং ব্যবহারকারীদের সচেতনতার ওপর। বাংলাদেশসহ বিশ্বের অন্যান্য দেশে ফিচারটি কবে চালু হবে, সে বিষয়ে নিশ্চিত তথ্য না পাওয়া পর্যন্ত ব্যবহারকারীদের অপেক্ষা করতে হবে। সুবিধাটি চালু হলে ফেসবুকের নিজস্ব অ্যাপের ঘোষণা ও নির্দেশনা দেখে যোগ্যতা এবং আবেদনপ্রক্রিয়া নিশ্চিত করাই হবে সবচেয়ে ভালো উপায়।


